সাহিত্য-সংস্কৃতি: বাংলাদেশের চারুশিল্পের অর্জন আরও বেশি গৌরবজনক

শক্তি ও সমৃদ্ধির আখ্যান

সৈয়দ আজিজুল হক | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • বৈশাখী উত্সব

    বৈশাখী উত্সব

  • সৈয়দ আজিজুল হক

    সৈয়দ আজিজুল হক

বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস মূল্যায়নের প্রয়োজনে এর সূচনালগ্নটির দিকে একবার তাকানো দরকার। স্বাভাবিকভাবে আমাদের দৃষ্টি গিয়ে ঠেকবে ১৯৪৭-এর বাংলা ভাগের ওপর। কিন্তু বাংলা ভাষার জ্ঞানকাণ্ডকে যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত বিশ্লেষণকৌশলের সুবাদে এই ক্ষেত্রটিতে জমে আছে এমন সব বিপজ্জনক নেতিবাচকতার ধুলো, যা সরিয়ে সত্যে পৌঁছানো কঠিন। আমরা ভুলে যাই, ১৯৪৭-এর ভারতভাগ ও বাংলাভাগ একই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। ভারতভাগ যারা চেয়েছে, তাদেরই কি প্রত্যাশা ছিল বাংলাভাগের? আর একসময় বঙ্গভঙ্গের তুমুল বিরোধিতা যারা করেছে, তারাই ১৯৪৭-এ বাংলা ভাগে কেন দিল সানন্দ সম্মতি—এসব প্রশ্নের সম্পূর্ণ সদুত্তর কি আমরা পেয়েছি? আমাদের দৃষ্টিকে অবশ্য ১৯৪৭-এ ঠেকিয়ে রাখলে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভিত্তিমূল সম্পর্কে যথার্থ ধারণা লাভ অসম্ভব। এ জন্য দৃষ্টির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন পরবর্তী পাঁচটি বছরের দিকে, যা জন্ম দিয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের। এই পাঁচ বছরে পরিবর্তন যে কত ব্যাপক ও গভীর হয়েছে তার প্রমাণ মিলবে ১৯৫৪-এর নির্বাচনে।

সাংস্কৃতিক নবজাগরণ
১৯৪৭-উত্তর পরিবেশে রাজনীতির উচ্চবিত্ত অভিজাতমুখিতা ও রক্ষণশীলতাকে দ্রুত পেছনে ফেলে জনমুখিতা ও প্রগতিমুখিতা যে জয়ী হয়, তার মূলে রয়েছে এ দেশের মানুষের সংগ্রামশীল সংস্কারমুক্ত জীবনস্বভাব। ফলে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই উচ্চকিত হয় বৈষম্যবিরোধী নতুন চেতনা, মুক্তবুদ্ধির বলিষ্ঠ প্রকাশসহ গণজাগরণ, জাতীয়তা ও সংস্কৃতিবিষয়ক নতুন ধর্মনিরপেক্ষবোধ। এসবেরই সম্মিলিত ফল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, যার তাৎপর্য অশেষ। যা শুধু নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্য অংশ থেকেই এ দেশকে চিন্তাভাবনার দিক থেকে পৃথক করেনি, বাংলার অন্য অংশ থেকেও তাকে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকে করে তুলেছে স্বতন্ত্র। তৈরি করেছে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন ভিত্তি। এটাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নবজাগরণ । একে একপ্রকার রেনেসাঁ বলে অভিহিত করলেও ভুল হয় না। এর মধ্য দিয়ে নতুন চেতনায় স্নাত হয়েছে বাংলাদেশ, যা ১৯৪৭-এর নতুন যাত্রা থেকে মূলেস্থূলে পৃথক। ১৯৪৭-এর যাত্রার মধ্যে যে তত্ত্বগত ভুল ছিল তা সংশোধন করে ১৯৫২-পরবর্তী যাত্রাকে যথার্থ পথ অবলম্বনের সুযোগও করে দিয়েছে এ আন্দোলন। এটা এক ধরনের সিনথেসিস। ১৯৪৭-পূর্ব থিসিস এবং ১৯৪৭-পরবর্তী অ্যান্টিথিসিস এই দুই থেকেই তা আলাদা, সম্পূর্ণভাবে নতুন এক চেতনা বা নতুন বোধ। ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় দেশব্যাপী, প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত, গড়ে-ওঠা শহীদ মিনার এবং সেখানে পুষ্পাঞ্জলি প্রদানের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার ভেতরকার ধর্মনিরপেক্ষ উদারমনস্ক মুক্তবুদ্ধির চেতনাকে অনুধাবন করতে পারলে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির শক্তিকে উপলব্ধি করা সম্ভব। কেননা এই সংস্কৃতির মধ্যে নেই যেমন পূজা-মানসিকতা, তেমনি নেই হারাম-চেতনা।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির এই নবতর যাত্রার ভিত্তিমূলেই রয়েছে সদর্থক চেতনার সুর, প্রকৃত সেক্যুলার ভাবনার স্ফুরণ। এরই প্রভাবে পরবর্তী ৬০ বছরের যাত্রা ক্রমাগতভাবেই হয়েছে সমৃদ্ধ। কেননা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই সংঘটিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, সৃষ্টি হয়েছে নতুন দেশ, নতুন স্বপ্ন, নতুন আকাঙ্ক্ষা ও আবেগ। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে এসবের ভূমিকা অতুলনীয় ও অপরিহার্য। এখানেই শেষ নয়। এরপর সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের মহাসংগ্রাম আরেকভাবে উজ্জীবিত করেছে যেমন জনমানুষকে, তেমনি সৃষ্টিশীল সত্তাসমূহকেও। শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীসহ সব চিন্তাশীল মানুষ দেশশাসনে গণতন্ত্র অনুশীলনের পক্ষে এমন সমষ্টিবদ্ধ হয়েছে যে ফৌজিতন্ত্রের বিনাশ হয়েছে সুনিশ্চিত। এসব রাজনৈতিক ক্ষোভ-বিক্ষোভ-লড়াই-সংগ্রাম বৃদ্ধি করেছে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিষয়গত বৈভব। আর এসবের পেছনে রয়েছে ওই একুশের চেতনা। যে-চেতনার সূত্র ধরেই ধর্মনিরপেক্ষ বোধের আশ্রয়ে সঞ্জীবিত ও পরিপুষ্ট হয়েছে আমাদের বাংলা বর্ষবরণ উৎসব। ঢাকার রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান এখন সারা দেশে পরিব্যাপ্ত। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। একই অনুপ্রেরণায় পালিত হচ্ছে বসন্ত উৎসব, শরৎ উৎসব, নবান্ন উৎসব, পৌষ উৎসব। এসবই আমাদের সংস্কৃতিকে প্রথাগত ধর্মকেন্দ্রিকতা থেকে অনেকটা মুক্তি দিয়েছে।

নাট্যে, সাহিত্যে বিধৃত জীবনধারা
স্মরণীয় যে নদীভাঙন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, দারিদ্র্য প্রভৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার নিয়ত সংগ্রামমুখরতা, আলস্যের প্রশ্রয়মুক্ত কর্মপরায়ণতা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জীবনবৈশিষ্ট্য। প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগবিরোধী মানুষের এই নিয়ত প্রতিরোধমুখী মনোভাবের চিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়েই সর্বদা বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐশ্বর্য।
অন্যদিকে, গত ৬৫ বছরে বাংলাদেশের নগরজীবন ক্রমস্ফীতির মধ্য দিয়ে হয়েছে বিপুলায়তনিক। ক্রমবর্ধিষ্ণু এই নগরায়ণের পরিণামে সৃষ্ট নাগরিক সংকট সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও তার জায়গা করে নিয়েছে। নাগরিকতার নানা আতান্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাশ্চাত্য জীবনধারার বিচিত্র জটিলতা, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার উৎকট বিড়ম্বনা। এসব বিপাক-বিপত্তির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত হয়েছে অস্তিত্বসংকট, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নৈঃসঙ্গ্যচেতনা, মনোবিকার আর অস্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব। জীবনসম্পৃক্তির সমান্তরালেই এসব সংকট যেমন সমাজকে আচ্ছন্ন করেছে, তেমনি তা শিল্প-সাহিত্যেও হয়েছে প্রতিবিম্বিত।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে মঞ্চনাটক তার অভিনয়নৈপুণ্য, জীবনসম্পৃক্ততা ও জাতীয় দায়িত্ববোধ নিয়ে যেভাবে বিকশিত হয়েছে, তাতে সংস্কৃতির এই ক্ষেত্র সম্পর্কে সমগ্র জাতিই গর্বিত। এর অনিবার্য প্রভাব পড়েছে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনে এবং সাম্প্রতিক কালের টেলিনাটকে, যা এই উভয় ক্ষেত্রকেই করেছে বৈভবপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে প্রাপ্ত কিছু পুরস্কার ও স্বীকৃতিও এর প্রমাণ।

গৌরবের চারুশিল্প ও গতিময় সংগীতচর্চা
বাংলাদেশের চারুশিল্পের অর্জন আরও বেশি গৌরবজনক। চারুশিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতাকে সব সময় আন্তর্জাতিক চিন্তা-চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে উপস্থাপনে আগ্রহী। তাঁরা নিয়মিতভাবে আমেরিকা, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ গমনসূত্রে চারুশিল্পের ক্রম-রূপান্তরশীল বৈশ্বিক ধারাগুলো সম্পর্কে যেমন অবহিত, তেমনি সেসবকে আত্মস্থ করে আমাদের জাতীয় জীবন ও লোকায়ত চেতনার সঙ্গে সংলগ্ন করে নিজ নিজ সৃষ্টিজগৎকে আলোকিত করতেও তৎপর। ফলে নিয়মিতভাবেই তাঁরা অর্জন করছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বাংলাদেশে সংগীতচর্চার ক্ষেত্রেও আমরা দেখি সদা প্রাণবন্ত, গতিশীল ও উদ্দীপনাময় এক পরম্পরাস্নাত প্রয়াস। রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীতের শুদ্ধ চর্চার সমান্তরালেই বহমান আধুনিক সংগীতের এক ঐশ্বর্যময় ধারা। তবে স্বীকার্য যে অধিকতর সমৃদ্ধ আমাদের লোকসংগীতের বিপুল-বিস্তৃত ক্ষেত্র থেকে নানা ভাব, ভাষা ও সুর নিয়ে সর্বদাই পরিপুষ্ট হচ্ছে আধুনিক সংগীতের নিয়ত স্পন্দনশীল এই ভুবনটি। আর সেই সঙ্গে তা ব্যাপৃত নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও।

প্রগতি ও নারীমুক্তির দিশা
বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির একটা বড় শক্তির দিক হলো, তা জাতীয় জীবনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-যন্ত্রণার সঙ্গে যেমন নিবিড়ভাবে যুক্ত, তেমনি গভীরভাবে জনজীবনের মর্মমূললগ্ন। এই শক্তির আরেকটি প্রান্ত হলো, সূচনাকাল থেকে এ দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ধর্মান্ধতা ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর। প্রগতিবিরোধী ওই অপশিক্ষিত কূপমণ্ডূক বলয়টির মুখোশ উন্মোচনেও বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নিরবচ্ছিন্নভাবে ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ। মোল্লাতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্র এখানে সর্বদা অশুভ, অকল্যাণ ও প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে একাত্ম বা এদেরই অপর নাম বলে বিবেচিত। অতএব ক্ষমা ও সহানুভূতিহীন সমালোচনায় স্বাভাবিকভাবে বিদ্ধ। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায় ধর্মতন্ত্রের মুখোশ এত সুস্পষ্টভাবে উন্মোচিত যে এ নিয়ে জাতিকে কোনো দ্বিধায় পড়তে হয়নি।
আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে উপস্থাপিত নারীচিত্রের মধ্যেও রয়েছে শক্তির দিক। কেননা এর মাধ্যমে সুদৃঢ় হয়েছে তার মর্যাদার আসন। প্রচলিত সমাজানুশাসন ও ধর্মীয় কুসংস্কারের ফলে নারীর স্বাধীন বিকাশের ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার বিপরীতেই সাহিত্যে নারীর আকাঙ্ক্ষিত সার্থক জীবনরূপ চিত্রণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এক বিকল্প নন্দন। এই বিকল্প নন্দনে নিশ্চিত হয়েছে নারীর অধিকারচেতনা, তার শৃঙ্খলমুক্তি, তার অবরোধমুক্তি এবং চির অবহেলা ও বঞ্চনাকাতর জীবন থেকে মুক্তির এক গৌরবময় প্রেরণা। এই সূত্রেই নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রটিও হয়েছে প্রগতির ধ্যান-ধারণায় আলোকিত। প্রথাগত জীবনব্যবস্থাকে অতিক্রম করে নর-নারীর সম্পর্কের বিন্যাসে তা নিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ আধুনিক এবং সব প্রকার অনুশাসন ও সংস্কারমুক্ত জীবনভাবনা। সর্বসাম্প্রতিক নারীবাদী দৃষ্টিকোণ প্রয়োগেও আমাদের সাহিত্য গভীরভাবে সমৃদ্ধ। নতুন প্রজন্মের নারী লেখকদের রচনায় রয়েছে এর সুতীক্ষ, অনিবার্য ও সাহসী প্রকাশ।

জনপ্রিয় ধারা ও লোকজ ঐতিহ্য
বাংলাদেশের সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যে রক্ষণশীল মনোভাব বিদ্যমান, সে-সম্পর্কে নতুনতর ভাবনার সময় এসেছে বলে মনে হয়। কেননা জনপ্রিয় ধারার কোনো কোনো লেখকের মধ্যে যে শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়, তার যথাযথ মূল্যায়নে এই মনোভাবের মধ্যে একপ্রকার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত স্পষ্ট। পাঠকের মনোগ্রাহী করে গল্প বলার ক্ষমতা, সমাজ ও ব্যক্তি মনস্তত্ত্বের নানা অস্বাভাবিক প্রবণতা ও অসংগতিকে কৌতুককর করে উপস্থাপনের দক্ষতা এবং ভাষার অসামান্য সাবলীলতার বিস্ময়কর প্রকাশে এই ধারা বিশিষ্ট ও তাৎপর্যময়। একটি আধুনিক সংস্কারমুক্ত সমাজমন গঠনেও এই ধারার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকের পরিসর বৃদ্ধিতে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাসের উদ্যম সৃষ্টিতে, এই ধারার অবদান অতুলনীয়। অতএব এটি যে বাংলাদেশের সাহিত্যের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রান্ত তা অনস্বীকার্য। কল্পবিজ্ঞানও একটি ধারা হিসেবে আমাদের সাহিত্যকে আলোকিত করছে।
বাংলাদেশের সাহিত্যের একটি শক্তির দিক হলো, তা সূচনাকাল থেকে যেমন এ দেশের লোকজ উপাদানকে ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে, তেমনি পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক বিশ শতকীয় আধুনিকতার সব নতুনতর অনুভবকে আয়ত্ত করে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হয়েছে। লোকজ উপাদানের তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হিসেবেই অঙ্গীকৃত হয়েছে লোকমিথ বা লোকপুরাণ। যার মধ্যে যুগ যুগ ধরে প্রবহমান থেকেছে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের ঘটনাধারার নির্যাস। বাস্তব ও কল্পনার যৌথ রসায়নে সৃষ্টি হয়েছে এসব লোকমিথ, যা আর্কিটাইপ হিসেবে জনসমাজের মনোজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক শক্তি। এই শক্তিকে আমাদের সাহিত্যিকেরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তাঁদের সৃষ্টিকে ঐশ্বর্যবান করার কাজে ব্যবহার করেছেন। এই সূত্রেই সাহিত্যে আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করি আমাদের সংগ্রামদীপ্ত বীরত্বব্যঞ্জক ইতিহাসের বিনির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ।

প্রসঙ্গ আধুনিক তত্ত্ব
এরই পাশাপাশি আধুনিক তত্ত্ব হিসেবে আমাদের সাহিত্যে অঙ্গীকৃত হতে দেখি মার্ক্সীয় সমাজাদর্শ, ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক জীবন-অভীপ্সা, অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শন, পরাবাস্তববাদ, জাদুবাস্তবতা, উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বজিজ্ঞাসা, নারীবাদ, উত্তরাধুনিকতা প্রভৃতি। উত্তরাধুনিকতার সংস্পর্শে আপাতদৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে সবকিছু মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে পড়লেও খণ্ড বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জীবনের বৈচিত্র্য গুরুত্ব পাচ্ছে। নিম্নবর্গ, প্রান্তজন অর্থাৎ পতিত, দলিত মানুষের জীবন অনুধ্যানের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে ক্রমাগতভাবে। বহির্বাস্তবতার পরিবর্তে অন্তর্লোকের স্বরূপ অনুধাবনে প্রয়াসী লেখকেরা মনোজগতের ব্যাকরণ আবিষ্কারে তৎপর হয়ে চৈতন্যপ্রবাহরীতি প্রয়োগে সক্রিয়। অ্যান্টিরোমান্টিকতা, অ্যান্টিহিরো, অ্যান্টিনভেলের এই যুগে সাহিত্যের চিরাচরিত সংজ্ঞার্থই যখন পাল্টে যেতে বসেছে, তখন বাংলাদেশের নবীন সাহিত্যিকেরাও নতুন যুগের মর্ম অনুধাবনে তৎপর। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন দৃষ্টি নিয়ে জীবনের স্বরূপ বিশ্লেষণের প্রয়াস সর্বদাই অভিনন্দনযোগ্য। বাংলাদেশে প্রতি দশকেই একেকটি সাহিত্যিক প্রজন্ম সৃষ্টি হচ্ছে, যারা একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলো উপহার দিতে তৎপর। তাতে সাহিত্য নতুন মাত্রা লাভ করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন উদ্যম ও প্রেরণা। এটি বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম শক্তির দিক নিঃসন্দেহে।
সৈয়দ আজিজুল হক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন