গণমাধ্যম: আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেকটাই লক্ষণীয়
পাড়ি দিতে হবে আরও পথ
সাখাওয়াত আলী খান
যদি বলা হয় যে স্বাধীন গণমাধ্যম বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন, কথাটি কি সঠিক বলে মনে হয়? বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বিচার করলে, গত চার দশকে এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন অবশ্যই আছে এবং দৃশ্যত তার মাত্রাও একেবারে কম নয়। কিন্তু কোন মাপকাঠিতে আমরা এই মাত্রা নির্ধারণ করব?
পৃথিবীতে গণমাধ্যমের আবির্ভাবের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এর স্বাধীনতার প্রশ্নটিও আলোচিত হয়ে আসছে। আজকের দিনের গণমাধ্যম গণযোগাযোগেরই মাধ্যম। এদিক দিয়ে বিচার করলে গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে যে মাধ্যম সবচেয়ে সফল, তার অর্জনই সর্বাধিক। কিন্তু সত্যিই কি তাই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরও অনেক প্রশ্নই এসে পড়ে। পাঠক-শ্রোতা-দর্শকদের সংখ্যা বিচারে গত দুই দশকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অর্জন অনেক, চোখে পড়ার মতো। গণমাধ্যমের সংখ্যা বিচারেও বাংলাদেশের ইতিহাসে তা অভূতপূর্ব। অনেকে নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এ ক্ষেত্রে ‘বিস্ফোরণ’ হয়েছে বলেও মত প্রকাশ করে থাকেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে মাধ্যমগুলোর উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বৃদ্ধির ধাপটি একটা প্রাথমিক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। জনসংখ্যার অনুপাতে যদিও এই বৃদ্ধিকে মোটেও যথেষ্ট বলা যায় না, তবুও স্বীকার করতেই হবে যে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের পরিবেশনায়ও চোখে পড়ার মতো কারিগরি উন্নতি হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা কারিগরি উন্নতি সত্ত্বেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নসাধন এবং গণমাধ্যমসহ নানা ক্ষেত্রে যথাযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টির স্লোগান দিয়ে এ দেশের সরকারগুলো ক্ষমতায় আসে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে দেশ পরিচালনায় মুক্তবাজার অর্থনীতি নামক প্রচলিত ব্যবস্থাকেই অনুসরণীয় বলে প্রায় সব কর্তৃপক্ষই মেনে নেয়। এই অর্থনীতিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি একটি জটিল সমীকরণ। এ ক্ষেত্রে পুরোনো প্রশ্নগুলো এই যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জনে গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও সাংবাদিকদের মধ্যে স্বাধীনতার অধিকার কীভাবে বণ্টিত হবে? নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা কি এ ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত? কোন পক্ষের কোন মাত্রায় স্বাধীনতা থাকলে তাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলা যাবে?
সমীকরণের এসব জটিলতা এড়িয়ে যদি সাদা চোখেও দেখা যায়, তবে বলতেই হবে যে এ ক্ষেত্রে আমাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে যেসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজতে চাচ্ছি, সেগুলো সবই আপেক্ষিক। যদি আমরা বলি, একজন উদারমনা প্রগতিশীল মালিকের পুঁজি, দক্ষ সম্পাদক বা পরিচালক, একদল পেশাদার সংবাদকর্মী, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নত কারিগরি সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে একটি সফল গণমাধ্যম গড়ে তোলার পরিবেশ এখন সমাজে লভ্য হয়েছে; তা হলে বোধ করি সত্যের অপলাপ হবে না। আগের তুলনায় এ ক্ষেত্রে সরকারি খবরদারি এখন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। এই পরিবেশ কাজে লাগিয়ে, উল্লিখিত শর্তাবলি পূরণ করে দেশে মোটামুটি স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের অগ্রগতি সে কারণেই দৃষ্টিগ্রাহ্য। একই কারণে আমাদের সঙ্গে তুলনীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি বিরাজমান, এমন বেশ কিছু দেশের তুলনায় আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেকটাই লক্ষণীয়। সাধারণভাবে বলা যায়, আগে গণমাধ্যমে যা একেবারেই পরিবেশন করা যেত না, এখন সেসব বিষয়ে অনেক কিছুই পরিবেশন করা যাচ্ছে। তবে তার অর্থ এই নয় যে আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জনের সব ধাপ পেরিয়ে এসেছি।
এ ক্ষেত্রে অনেক পথ এখনো আমাদের পাড়ি দিতে হবে। যেমন পাড়ি দিতে হবে প্রকৃত গণতন্ত্র অর্জনের পথ। ব্রিটিশের ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের অনুসরণে একধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা পথ আমরা অতিক্রম করেছি সত্য, কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ায় আমাদের ব্যর্থতাও সুস্পষ্ট এবং খুবই আলোচিত। আমাদের গণমাধ্যমকেও সেই ধাপটি অতিক্রমণের চেষ্টায় থাকতে হচ্ছে।
সেনাপতিরা যদি আবার হঠাৎ দেশের ‘রাজা’ হয়ে না বসেন; ভোটের রাজনীতিতে যদি অন্তত পরাজয় মেনে নেওয়ার মতো মনোবৃত্তি জাগ্রত হয়; সমাজের ভেতরের কুসংস্কারের অন্ধকার যদি কিছুটা কাটে; ধর্মকে ব্যবহার করে ইহজাগতিক লাভের অপচেষ্টা যদি বন্ধ করা যায়; প্রগতিশীলেরা যদি অন্তত কিছু মৌলিক বিষয়ে একযোগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন; খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ন্যূনতম ব্যবস্থা যদি আমরা দেশের মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে পারি; সমাজে ভিন্নমত সহনশীলতার সঙ্গে শুনতে পারার অভ্যাস যদি গড়ে ওঠে এবং সর্বোপরি এ দেশের সাংবাদিকেরা ব্যক্তিগত মতামত-নির্বিশেষে যদি অন্তত পেশার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন; তবে বর্তমানে মোটামুটি স্বাধীন গণমাধ্যমও এখানে আরও অনেক স্বাধীনতা ভোগ করার আশা করতে পারে। এসব ‘যদি’-এর শর্ত পূরণ না করে স্বাধীন গণমাধ্যমের আরও স্বাধীনতা অর্জন আশা করা বোধ হয় দুরাশাই হবে।
এসব ‘যদি’ যে কঠিন শর্ত, সে কথা মানতেই হবে। তবে আশার কথা, আমরা এগোচ্ছি, পিছিয়ে যাচ্ছি না। অবশ্য মাঝেমধ্যে কিছু কিছু ঘটনায় মনে হয় যেন আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। (যেমন: সম্প্রতি বৌদ্ধদের বাড়ি-মন্দির পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা।) এতৎসত্ত্বেও আমার এক শিক্ষকের কথা এ প্রসঙ্গে প্রায়ই মনে পড়ে। প্রয়াত সেই শিক্ষক বলেছিলেন, ‘মনে রাখবে, সমাজ কখনো পিছিয়ে যায় না, মাঝেমধ্যে অগ্রগতিতে কিছু বিঘ্ন ঘটে মাত্র।’
আমি আমার শিক্ষকের কথা মান্য করতে চাই। যারা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে। এ দেশের একজন বামপন্থী রাজনীতিকের লেখায় পড়েছিলাম, কেউ কেউ নাকি তাঁকে বলেছেন, ‘আমরা আপনাদের রেসপেক্ট করি, কিন্তু আপনাদের কাছে কিছু এক্সপেক্ট করি না।’ আমাদের প্রগতির পথের নেতাদের এই কথা যেন আর শুনতে না হয়; একই কথা যেন শুনতে না হয় এ দেশের প্রতিভাবান সাংবাদিকদেরও; সত্তরোর্ধ্ব জীবনে এই আমার একান্ত আশা।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক। বলা হয়ে থাকে, গণতন্ত্রের মাত্রার সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মাত্রা সরাসরি আনুপাতিক। সহজ কথায়, যে দেশে যত বেশি গণতন্ত্রচর্চা হয়, সেই দেশে গণমাধ্যম তত বেশি স্বাধীন। তবে বাহ্যিকভাবে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহাল থাকলেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাবে সেই দেশগুলোতে গণমাধ্যম অপ্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। অনেক নির্বাচিত নেতাও গণমাধ্যমের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করেন। কাজেই আমাদের মানতেই হবে যে একটি দেশের বাহ্যিক গণতান্ত্রিক চেহারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না।
এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়। গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর, বিশেষ করে শাসকদের সাফল্য-ব্যর্থতার চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা। যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির বা সরকারের কিছু ইতিবাচক ও কিছু নেতিবাচক দিক থাকতে পারে—উভয় দিকই তুলে ধরা গণমাধ্যমের কর্তব্য। কিন্তু অনেক নির্বাচিত সরকারই, এমনকি বিরোধী দলগুলোও এ বিষয়টি মনে রাখে না। ফলে গণমাধ্যমে কোনো নেতিবাচক দিক উঠে এলে তারা ক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের সঙ্গে গণমাধ্যমের একপ্রকার সংঘাত কিংবা টানাপোড়েনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একটি দেশের পরিস্থিতিতে নেতিবাচকতার মাত্রা বেড়ে গেলে তা তুলে ধরা ছাড়া গণমাধ্যমের গত্যন্তর থাকে না। অন্যদিকে, কিছু কিছু গণমাধ্যম হয়তো ইতিবাচক দিকগুলো অগ্রাহ্য করে প্রধানত নেতিবাচক দিকই তুলে ধরতে চায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকার-নির্বিশেষে পৃথিবীর যেকোনো দেশেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। যেসব দেশের সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি তাদের দেশে সৃষ্ট কোনো নেতিবাচক দিকই (বিশেষত যেগুলো হয়তো তাদের জন্য অস্বস্তিকর) গণমাধ্যমে দেখতে চান না, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গণমাধ্যমের উল্লিখিত সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। গণমাধ্যম যদি ইতিবাচক দিককে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়ার পর নেতিবাচক দিকও তুলে ধরে, তবে কেউ অস্বস্তি বোধ করলেও তাদের ক্ষিপ্ত হওয়া অনুচিত। বরং তাদের উচিত নিজেদের দোষ-ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা। বিশেষ করে নির্বাচিত সরকারগুলোর এ কথা মনে রাখা একান্ত দরকার। অন্যথায় দীর্ঘ মেয়াদে তাদের তথা দেশেরই ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়।
সরকার কিংবা বিরোধী দল কারও সঙ্গেই অত্যধিক মাখামাখি গণমাধ্যমের কাম্য হওয়া উচিত নয়। অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষতা বজায় রেখে গণমাধ্যমের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কিংবা চিহ্নিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও তথাকথিত নিরপেক্ষতা দেখানোর সুযোগ নেই। যেকোনো কিছুরই দোহাই দিয়ে সমাজে ক্ষতিকর কুসংস্কার চালু থাকুক না কেন, গণমাধ্যমকে অবশ্যই তার বিরোধিতা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার প্রশ্নই অবান্তর। বরং গণমাধ্যমের নিরন্তর চেষ্টা থাকতে হবে এগুলো যথাসম্ভব দূর করার। অন্যথায় অনেক মতলববাজ মানুষই এসব কুসংস্কারের আড়ালে স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা চালাতে থাকবে। যদি গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রেও তা বড় বাধা হয়েই থাকবে। এই অর্থে স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণমাধ্যম খুব একটা অগ্রসর হতে পারেনি।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের একটি অত্যন্ত ঘন ঘন উচ্চারিত কথা এই যে গণমাধ্যমের তিনটি প্রধান কাজ হচ্ছে, দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের তথ্য প্রদান, শিক্ষা প্রদান বা উদ্বুদ্ধকরণ এবং বিনোদন দেওয়া। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এই তিনটি কর্তব্য পালনে কতখানি সফল হতে পেরেছে, সেটাও তাদের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি প্রধান গণ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এখানে উল্লেখ্য, গণমাধ্যমে দেওয়া শিক্ষা কোনোভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই শিক্ষা মূলত দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের আরও সচেতন করার শিক্ষা। প্রয়োজনীয় তথ্য যথাসময়ে দেওয়া হলে তা-ও একধরনের শিক্ষা। তবে আধুনিক গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এই তথ্য যতটা সম্ভব বিনোদনের মাধ্যমে দেওয়ার কথা বলছেন। ইংরেজিতে একটি শব্দ ব্যবহূত হচ্ছে, ‘ইনফোটেইনমেন্ট’—অর্থাৎ বিনোদনের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া। এখন দেখা যাক, আমাদের গণমাধ্যম এই তিনটি কাজ কতটা স্বাধীনভাবে করতে পারছে বা করছে। তাতে এ ক্ষেত্রে তাদের অর্জনের পরিমাপ করা হয়তো সহজ হতে পারে।
প্রথমেই দেখা যাক, তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাহ্যত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জনগণকে তাদের সংগৃহীত তথ্য বিতরণে আমাদের সরকারসহ অন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গণমাধ্যমগুলো খুব একটা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। তবে অদৃশ্য বাধা যে আছে, সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। গণমাধ্যমগুলো এখনো তথ্য প্রাপ্তির অধিকার-সংক্রান্ত আইনটির খুব একটা কার্যকর ব্যবহার করতে পারেনি। হঠাৎ হঠাৎ বড় বড় কেলেঙ্কারি কিংবা চাঞ্চল্যকর কিছু কিছু বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে, যেগুলো আরও আগেই গণমাধ্যমের গোচরে আসা উচিত ছিল। এতে মনে হয়, তথ্য প্রদানে তেমন কোনো বাধা না থাকলেও তথ্য সংগ্রহে গণমাধ্যমগুলোর যথেষ্ট স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। তবুও সার্বিক বিচারে নব্বইয়ের দশকের আগের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশে জনগণকে তথ্য প্রদানে গণমাধ্যম মোটামুটি স্বাধীনভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছে।
গণমাধ্যমের মারফত শিক্ষা প্রদান নানাভাবে হতে পারে। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করে; সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, কলাম, ফিচার ইত্যাদি লিখে; ব্যাখ্যামূলক বা অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন করে; ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিভিন্নভাবে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে; রেডিও-টিভিতে আলোচনা অনুষ্ঠান করে; মোবাইল ফোন, ব্লগ, ইন্টারনেট ইত্যাদিতে তথ্য দিয়ে—এককথায়, গণমাধ্যমে যেকোনো উপায়ে জনগণের সচেতনতার মাত্রা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে এই সচেতনতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া যে খুব বেশি দূর এগিয়েছে তা বলা যাবে না। বিশেষ করে অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় যে চাপা পড়ে যাচ্ছে, সেটা এখন জনগণও বেশ বুঝতে পারছে। এখানে বলা দরকার যে জনগণ যা জানতে আগ্রহী, তা যেমন জানানো গণমাধ্যমের কর্তব্য, তেমনি জনগণের যা জানা উচিত, তা-ও তাদের জানাতে হবে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।
গণমাধ্যমের প্রতি দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের আস্থা থাকলেই কেবল গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে তারা দৃঢ় অবস্থান নেবে। কাজেই সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে অহেতুক দলাদলি কিংবা তাঁদের পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কাজে জড়িত হয়ে পড়া, ভুল তথ্য প্রদান কিংবা নিজেদের ত্রুটি হলে তার সংশোধনী না দেওয়া, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাকে অগ্রাহ্য করা ইত্যাদি কারণে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হতে পারে। আর আস্থা দুর্বল থাকলে তা প্রকারান্তরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যও হুমকি হবে। আরও একটি কথা গণমাধ্যমের কর্তাদের মনে রাখতে হবে। সেটি এই যে গণমাধ্যমগুলো অযৌক্তিক এবং কখনো কখনো প্রায় হাস্যকর কারণে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলে জনগণ বিরক্ত বোধ করে। এতে গণমাধ্যমের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয় না।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে মালিকানার স্বার্থান্বেষী ক্ষতিকর ধরন, সাংবাদিক নির্যাতন বা হত্যা, সাংবাদিকতায় মতলববাজ শক্তির এজেন্টদের অনুপ্রবেশ, সাংবাদিকদের মধ্যে মালিকের প্রতি মাত্রাহীন আনুগত্য, সমাজে অশিক্ষা বা কুশিক্ষার প্রসার, ক্ষতিকর ও অযৌক্তিক সামাজিক সংস্কার, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার তথ্য প্রদানে অনীহা এবং সর্বোপরি সাংবাদিকদের জনস্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকারে ঘাটতি। সেলফ-সেনসরশিপ ও দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সাহসের অভাবেও ক্ষুণ্ন হতে পারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের অতৃপ্ত বা অসন্তুষ্ট রেখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। এ ছাড়া মুক্তবাজার অর্থনীতিতে লাভজনক না হয়ে একটি গণমাধ্যমের টিকে থাকা যেহেতু প্রায় অসম্ভব, কাজেই গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় বড় বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতি নমনীয় হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা একটি বড় বাধা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোকেও এই বাস্তবতার মধ্যেই টিকে থাকতে হচ্ছে।
সাংবাদিকতার কর্মী ও ছাত্র হিসেবে আমি বেশ বুঝতে পারছি, একটি দৈনিক পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রের জন্য লেখাটি এমনিতেই আকারের দিক থেকে সীমা অতিক্রম করেছে। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের অনেক দিকেই তাই আলোকপাত করা গেল না। এই সীমাবদ্ধকে পাঠকেরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলে আশা করি। সবশেষে বলব, আমাদের দেশে সাংবাদিকতায় আরও স্বাধীনতা অর্জন খুব সহজ হবে না। অনেক দুর্লঙ্ঘ্য বাধা আসতে পারে। নজরুলের ভাষায়, ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার,/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার’।
সাখাওয়াত আলী খান: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






