তরুণ প্রজন্ম: আমাদের ভবিষ্যৎ বাঁচাবে এই শিক্ষার্থীরাই
আলোকিত বাংলাদেশের কারিগর
-
গণিত অলিম্পিয়াডের উদ্বোধনী পর্ব
-
মাহবুব মজুমদার
তৃতীয় বিশ্বের অপার সম্ভাবনাময় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। সম্ভাবনা অনেক হলেও জনসংখ্যা সমস্যা, সরকারি ব্যবস্থাপনা, ঢাকাকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক অবয়বের কারণে আমরা যতটা সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাই, তার থেকেও পিছিয়ে পড়ি বেশি। কিন্তু আশার কথা যে শত দুর্ভোগের পরও আমাদের শিক্ষার্থীদের মেধার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। তবে, দুঃখ এই, এসব উদ্যমী ও উদ্যোগী শিক্ষার্থীর সবাইকে আমরা খুঁজে বের করতে পারি না।
গণিত অলিম্পিয়াডের মতো দেশব্যাপী আয়োজিত আন্দোলন দিয়ে আমরা কিছু ছেলেমেয়েকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হই। তার পরও আমরা হতাশ না হয়ে পারি না, কারণ আমাদের দেশে হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী থাকলেও আমরা খুবই কমসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর কাছে যেতে পারি, সেখান থেকে খুব কম শিক্ষার্থী খুঁজে পাই আমরা। গণিত উৎসবের মাধ্যমে আমরা যাদের খুঁজে বের করি তারা আমাদের সঙ্গে কিছুদিন থেকেই সফলতা লাভ করে না। আমাদের গণিত অলিম্পিয়াডের নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এসব শিক্ষার্থীর পরিশ্রমকে একটি আকার বা নির্দেশনা দেয়। গণিত অলিম্পিয়াড, গণিত ক্যাম্প, সংখ্যাভ্রমণ, প্রাইমারি ক্যাম্পের মতো নানা উদ্যোগে অংশগ্রহণের কারণেই তারা উৎসাহ পায় এবং প্রতিবছরই নিজেদের ঝালিয়ে দেখার সুযোগ পায়। প্রচলিত জিপিএ-নির্ভর পরীক্ষায় তারা এই সুযোগ পায় না।
আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো এক দশক হয়নি, তার পরও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বেশ সাফল্য লাভ করেছে। ২০০৫ সালে আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রথমবার মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। ২০০৬ সাল থেকে সম্মানসূচক স্বীকৃতি পেয়ে আসছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে ব্রোঞ্জপদকপ্রাপ্তি। এ বছর আর্জেন্টিনার মার ডেল প্লাটা শহরে ১০০টি দেশের ৫৪৮ জন প্রতিযোগী নিয়ে অনুষ্ঠিত ৫৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে আমাদের ধনঞ্জয় বিশ্বাস রৌপ্যপদক, সৌরভ দাশ ও নূর মুহম্মদ সফিউল্লাহ ব্রোঞ্জপদক এবং আবিদ হাসান ও মীর্জা মো. তানজীম শরীফ মুগ্ধ সম্মানসূচক স্বীকৃতি পেয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫৪তম। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশের জন্য এ পর্যন্ত একটি রৌপ্য ও ছয়টি ব্রোঞ্জপদক অর্জন করে এনেছে।
গণিত অলিম্পিয়াডের পথ ধরে আমাদের দেশে এখন বিভিন্ন বিষয়ে অলিম্পিয়াড বা মেধার লড়াই হচ্ছে, যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাত্রা আমাদের আশা জাগায়। মানুষ বাঁচে তার আশায়। আমাদের ভবিষ্যৎ বাঁচাবে এই শিক্ষার্থীরাই। ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অলিম্পিয়াড, দাবা অলিম্পিয়াড ইত্যাদিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা আজ আনন্দের সঙ্গে অংশ নিচ্ছে। এ বছরই আমাদের শিক্ষার্থীরা এস্তোনিয়ায় অনুষ্ঠিত ৪৩তম আন্তর্জাতিক পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জপদক লাভ করে। শিঞ্জিনি সাহার ব্রোঞ্জপদকসহ বাংলাদেশ অর্জন করেছে দুটি সম্মানসূচক স্বীকৃতি। ইতালিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ২৪তম ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক ইন ইনফরমেটিকসে (আইওআই) সাফল্য লাভ করেছে। এ বছরের আসরে দুটি ব্রোঞ্জপদক জিতেছে বাংলাদেশ। ধনঞ্জয় বিশ্বাস ও বৃষ্টি শিকদার এ দুটি পদক অর্জন করে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের দেশের সম্ভাবনা আমেরিকার মতোই! আমাদের শিক্ষার্থীরাই এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এসব শিক্ষার্থী প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় আহামরি টাইপের ছাত্রছাত্রী নয়। কিংবা ঢাকার কোনো বিখ্যাত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীও নয়। কুষ্টিয়া থেকে আসা তারিক আদনান এখন পড়াশোনা করছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, ময়মনসিংহ থেকে আসা হক মুহাম্মদ ইশফাক এখন স্টানফোর্ডে পড়ছে। আজকে গুগল, সান মাইক্রোসিস্টেমস, ইয়াহু, ইন্টেলের মতো প্রতিষ্ঠানের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটিতে পড়ছে আমাদের পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা।
এই শিক্ষার্থীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কারিগর হবে। কিন্তু আমাদের দরকার আরও মেধাবী শিক্ষার্থীদের তৈরি একটা প্রজন্ম। যারা তৈরি করবে আগামীর নতুন বাংলাদেশ। আগামীর বাংলাদেশে বিপ্লব আনবে এই তরুণেরাই।
নানা সমস্যা থাকলেও আমাদের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সফলতা বলে দেয় তাদের মেধা ও পরিশ্রমের ধার কতখানি। আমাদের শিক্ষার্থীরা খুবই সাধারণ মানের বই পড়ে। এসব বইপত্রে চোখে পড়ার মতো আগ্রহ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তুর অনেক অভাব। শিক্ষকদের স্কুল-কলেজের পড়াশোনার প্রকৃতিও অনেক জটিল এবং কোচিং-নির্ভর। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা স্কুল, কোচিং করতে করতে দিন পার করে দেয়। পরিবার, স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ‘ভালো জিপিএ’ অর্জনের চাহিদা মেটাতে একপ্রকার দিন-রাত যুদ্ধ করছে শিক্ষার্থীরা। আমরা গণিত অলিম্পিয়াডের মাধ্যমে নগণ্য সংখ্যায় কিছু শিক্ষার্থী খুঁজে পাই। এই শিক্ষার্থীরা এসএসসি, এইচএসসির পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে অংশ নেয়। লক্ষ্য একটাই, ভালো জিপিএ। দু বছরের মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, গণিতের বিশাল সিলেবাসের কারণে অনেক চাপের মধ্যে থাকতে হয় এই শিক্ষার্থীদের। এদেরই মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষকদের ভয় না পেয়েই অংশ নিতে চলে আসে গণিত অলিম্পিয়াডে। কোচিং-স্কুল ছক থেকে বের হয়ে বিপ্লবী হয়ে ওঠে।
ভর্তিযুদ্ধে যারা ভালো জিপিএধারী শিক্ষার্থী, তারাই বাংলাদেশের ভালো ভালো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, গুণগত দুর্বলতার কারণে বুয়েট, মেডিকেল ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ধ্যান-ধারণা ‘ভালো জিপিএ’-নির্ভর হয়ে ওঠে। প্রকৌশল বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কয়েক শ উচ্চ জিপিএধারী মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পায়। প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে এক হাজারের কম শিক্ষার্থী। যেখানে আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি, সেখানে এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের এই নগণ্য সংখ্যার শিক্ষার্থীরা প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনার সুযোগ পেলেও খুব কম শিক্ষার্থী গবেষণা জগতে প্রবেশ করে। সবার লক্ষ্য থাকে ভালো চাকরির কিন্তু সৃজনশীল গবেষণায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনেক কম।
আমাদের দেশে গবেষণা করার সুযোগ অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ অনেক কম। ভবিষ্যতের মেধাবী বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমাদের সহস্র গবেষক দরকার। আমাদের শিক্ষার্থীরাই আমেরিকাসহ ইউরোপের নানা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখছে। আমরা তাদের কাজে লাগাতে পারছি না। এই ধারা যদি চলতে থাকে তাহলে আগামী বাংলাদেশের আকাশে অন্ধকার মেঘ আরও ঘনীভূত হবে। সৃজনশীল গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কাজ একমাত্র শিক্ষকেরাই করতে পারেন। শিক্ষকেরাই শিক্ষার্থীদের রেললাইনের মতো একটা পথ দেখিয়ে দিতে পারেন। আমাদের দেশের কাঠামোগত দুর্বলতার জন্য শিক্ষকদের গুণগত মান নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এমআইটির মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন শিক্ষক আছেন, যাঁদের পড়াশোনার ধরন-প্রকৃতি নিয়েও অনেকের প্রশ্ন-সংশয় থাকে। কিন্তু তার পরও তাঁরা শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয়। কারণ এই শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা, উৎসাহ দিতে পারেন। বারুদে আগুন দেওয়ার কাজটা করেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয় এই শিক্ষকদের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা ভয় পায়। হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক ছাড়া বাকিদের সবাইকে শিক্ষার্থীরা ভয় পায়, তাঁদের কাছ থেকে দূরে থাকে। আমাদের শিক্ষকেরা যদি শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতেন তাহলে হয়তো আমরা আরও মেধাবী শিক্ষার্থী খুঁজে পেতাম। শিক্ষার্থীদের আমাদের শিক্ষকেরাই পারেন দক্ষ করে তুলে ধরতে।
আমাদের মেধাভিত্তিক তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক উদ্যোগ। গণিত উৎসবের মতো আয়োজনের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি তার মধ্যে অন্যতম হতে পারে। বিশেষভাবে এর ব্যাপ্তি ঘটা দরকার গ্রামে-গঞ্জে, সমাজের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্যে, যারা বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশটা আয়তনে অনেক ছোট। আমাদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা আমাদের কাছে সমস্যা মনে হয়, কিন্তু এই বিশাল জনসংখ্যাই যে আমাদের আশীর্বাদ। প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাই পারে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে এবং উন্নয়নে কাজে লাগাতে।
ড. মাহবুব মজুমদার: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের কোচ।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






