বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: সহযোগিতা আর উন্নয়নের নতুন একটা যুগের সূচনা হতে পারে

উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

গওহর রিজভী | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
গওহর রিজভী

গওহর রিজভী

বাংলাদেশ ও ভারত শুধু প্রতিবেশী নয়, সহজাত বন্ধুও। আমাদের সম্পর্ক শুধু যৌথ সীমানাতেই আবদ্ধ নয়: ইতিহাস, ভাষা আর সংস্কৃতির মিল থাকায় আমাদের নৈকট্য আরও গভীর। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে আমরা পাশাপাশি বাস করছি আর আমাদের দর্শন, সংগীত, স্থাপত্য বিকশিত হয়েছে ইন্দো-পারসিয়ান সভ্যতার মিশেলে। আমাদের রান্নাবান্না, পোশাক-পরিচ্ছদ, লোককথা ও পরম্পরা একই রকম। আর আমাদের নায়ক এবং খলনায়কেরাও অভিন্ন। দুই দেশের সমাজেই নানা ধরনের মানুষ, নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি ও নানা ধর্ম। যেখানে প্রতিটি সমপ্রদায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করে, কিন্তু উৎসব উদ্যাপন হয় সর্বজনীন।
আমাদের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের পর, যখন এক কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় পেয়েছিল। শহীদের রক্ত এই বাঁধনকে আরও সুসংহত করেছে; আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি লড়ে জীবন দিয়েছিল ভারতীয় সেনারা। স্বাধীনতার পর এই সংযোগ পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল আমাদের ঐতিহ্য আর মূল্যবোধের মিলনে। আমরা গণতান্ত্রিক, বহুমাত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ। আমাদের ক্রমবর্ধমান আশা-আকাঙ্ক্ষা একই রকম। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একটা শান্তিপূর্ণ অঞ্চল গড়ে তোলার প্রত্যাশী।
স্বাধীনতার পরপরই ভারতের সঙ্গে অংশীদারির প্রতিশ্রুতি ফলদায়ী হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারত দ্রুত তার সেনা প্রত্যাহার করে। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা দেয়। এমনও ভাবা হয়েছিল, পাকিস্তান আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু অনিষ্পন্ন বিষয়ের (ফারাক্কা ও সীমানাসংক্রান্ত বিরোধসহ) মীমাংসাও দ্রুত হয়ে যাবে। ১৯৬৫ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সড়ক, রেল ও নৌপথের যাতায়াতব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করা হবে। বঙ্গবন্ধু ও শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্ক এমনই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল যে মনে হয়েছিল সব সমস্যারই দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কই প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুই দেশের সম্পর্ক অবনমনের পেছনে ছিল যতটা না বাস্তব সমস্যা, তার চেয়ে বেশি ঘরোয়া রাজনীতির অনিশ্চয়তা।
সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনকে শক্তিশালী করার জন্য আওয়ামী লীগের বিরোধী দলগুলোর একটা জোট গড়ে তোলেন। এই জোটে ছিলেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত দল ও নেতারা এবং যাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে নানা কারণে অস্বস্তিতে ভুগতেন তাঁরা। যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁরাও এই জোটে ছিলেন। বহু বর্ণের এই জোটকে একত্র করেছিল ভারতের প্রতি তাঁদের সন্দেহ, ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে একত্র হওয়ার এক গূঢ় আকাঙ্ক্ষা। জাতীয় স্বার্থের সমস্যা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনমন ঘটেছিল। ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ আমল ছাড়া ১৯৭৫ থেকে ২০০৬ সালের সবগুলো সরকারের মধ্যেই ভারতের প্রতি অপ্রসন্ন মনোভাব ও সন্দেহ কাজ করেছে।
শাসকগোষ্ঠীর ভারতবিরোধী এই রাজনীতির সুবিধা গ্রহণের ফলে জনমনে ভারতের প্রতি সন্দেহ তৈরি হয়নি। বরং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ভারতের গঙ্গার পানিপ্রবাহ পরিবর্তন করে দেওয়ার ভুল সিদ্ধান্ত থেকে এমন হয়েছিল। ভারতবিরোধী মনোভাব একটা ভিত পেয়ে গেল যখন সেচের পানির অভাবে গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের জীবিকা সংকটে পড়ল। পরের সরকারগুলোও ভারতবিরোধী মনোভাবে উসকানি দেওয়ার জন্য ফারাক্কাকে ব্যবহার করল আর ভোট পাওয়ার জন্য ভারতকে বড় ইস্যু বানিয়ে ফেলল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গঙ্গার পানি চুক্তির মাধ্যমে পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে সমর্থ হলেন আর ভারতের সঙ্গে বিরোধের একটা যথার্থ উৎসকে দূর করলেন। বিদ্যমান অন্য সমস্যাগুলো সমাধানে তিনি উদ্যোগী হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে চলে গেল। এরপর ২০০৯ সালের আগে আর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্থিতাবস্থায় ফেরেনি।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর কিছু বিষয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের পূর্বাভাস দিচ্ছিল। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ক্ষমতায় এল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। এর কিছুদিন পরই কংগ্রেস ও মিত্ররা ফিরে এল বর্ধিত ম্যান্ডেট নিয়ে। হাসিনা-মনমোহন নেতৃত্ব অনেককেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল মুজিব-ইন্দিরা যুগের (১৯৭২-৭৫) কথা। ২০১০ সালের শীর্ষ সম্মেলন রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক ঘটনায়। দুই প্রধানমন্ত্রীই শুরুতে আস্থা অর্জনের প্রচলিত ধারণাকে বর্জন করেন। গাছের তলার ফলটা আগে কুড়িয়ে পরে জটিল সব সমস্যায় আসার প্রথায় চলেননি তাঁরা। খোলা বাজারে দর-কষাকষির মতো প্রচলিত কূটনৈতিক পন্থাকেও তাঁরা পরিহার করেন। বরং দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করছিল এমন সব ধরনের সমস্যার বিষয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটা ছিল খুব সাহসী সিদ্ধান্ত। তাঁরা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার সবগুলোর হয়তো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান ফল ছিল না। শক্ত জমিনে দাঁড়িয়ে তাঁরা আকাশের তারায় নজর রেখেছিলেন। দেশের মানুষের স্বার্থকেই তাঁরা সর্বাগ্রে বিবেচনা করেছেন। নিজ নিজ পক্ষকে তাঁরা বাজারি দর-কষাকষি আর লেনদেন থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। দরাদরিতে সময় নষ্ট না করে বরং একত্রে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। অতীতের উপদ্রবগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখতেই হতো, যাতে সহযোগিতা আর উন্নয়নের নতুন একটা যুগের সূচনা হতে পারে। এই দূরদর্শিতা ছিল যথার্থ এবং পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি মাত্রায়ই এখন নতুন এই দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ আর ভারত দুটো দেশই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারের হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের দুর্ভোগ শুরু, এরপর জেলখানায় চার নেতার হত্যা, আওয়ামী নেতৃত্বের ওপর গ্রেনেড হামলা, জেলা সদর দপ্তরগুলোতে আল-কায়েদার আদলে সাজানো বোমা হামলা, অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের কর্মীদের হত্যা। নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতির স্ত্রী আইভী রহমান, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ্ এ এম এস কিবরিয়া, সাংসদ আহসানউল্লাহ্ মাস্টার প্রমুখ। বাংলাদেশ যেন পরিণত হলো দেশি আর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের অভয়ারণ্যে, যারা বাংলাদেশ- ভারত দুই দেশেই অসংখ্য হামলা চালায়। উভয় দেশই এর শিকার হলেও আমাদের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ আর বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে পড়ে। দুই নেতার মনেই জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি আসা তাই স্বাভাবিক। শেখ হাসিনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেই ছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা, অসম্ভব সাহসের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাদের প্রস্তুতির আর আশ্রয়ের জায়গাগুলো নির্মূল করা হলো, দেশ থেকেও বের করে দেওয়া হলো। একইভাবে ভারতও নানা পদক্ষেপ নিল, ভারতে বসে বাংলাদেশে সন্ত্রাস চালাচ্ছিল যারা, তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করল। আজ বাংলাদেশ শুধু অনেক বেশি নিরাপদই নয়, দুই দেশের মধ্যে আস্থা আর বিশ্বাসের জায়গাটিও পুনরুদ্ধার করা গেছে। নিরাপত্তার বিষয়ে এসব পদক্ষেপের ফলেই অন্যান্য বিষয়ে সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোর একটি ছিল সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক: প্রায় ছয় কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিত ছিল না, তিন বিঘা করিডর দিয়ে নির্বিঘ্ন প্রবেশ সমস্যা, এক দেশের ভেতর আরেক দেশের ভূখণ্ড ও অধিকৃত জমি (এপিএল)। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি, এর ফলে তৈরি হয়েছে নানা দ্বন্দ্ব, প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। আপাতদৃষ্টিতে সমাধানের অযোগ্য এই সমস্যাগুলোর শুধু সমাধান হয়েছে তা নয়, এত জটিলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশি বা ভারতীয় একজন মানুষকেও বাড়িঘর, জমি বা জীবিকা হারাতে হয়নি। এই ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে কাউকেই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে থাকতে বা চলে যেতে বাধ্য করা হয়নি। যেকোনো বিচারেই এটি এক অসাধারণ অর্জন, দুই নেতার বিচক্ষণতার নিদর্শন। চুক্তি অনুমোদনে ভারতের দেরি করাতে একটা উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের আন্তরিক বিশ্বাস যে এই কাজটিও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট আরেকটি গভীর সমস্যা হলো, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা। কয়েক বছরেই নিহতের সংখ্যা শতাধিক বেড়েছে। অনুপ্রবেশ, অবৈধ ব্যবসা এবং মাদক পাচার নিয়মিতই হচ্ছে; আর এর ফলেই হত্যার ঘটনা ঘটছে। ‘একটি হত্যার ঘটনাও অগ্রহণযোগ্য’ শেখ হাসিনা ঠিকই বলেছেন এবং দাবি করেছেন ‘জিরো কিলিং’। আর তাঁর মতে, সীমান্তের ধারণাটাই পুনর্গঠন করতে হবে এভাবে—‘যেখানে দুটো দেশ ভাগ হয় এমন নয়, যেখানে দুটো দেশ মিলিত হয় সেটাই সীমান্ত।’ দুটো দেশই সীমান্তে বাণিজ্যের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ করেছে। বিজিবি-বিএসএফ কমান্ডাররা নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করে নানা সমস্যা মেটাচ্ছেন, তথ্যের আদান-প্রদান করছেন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনতে একমত হয়েছেন। সীমান্তসংলগ্ন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ সুপাররাও একইভাবে আলোচনায় বসবেন। ২০১১ সালে সীমান্তে হত্যার সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৯-এ। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ বছরে যা ছিল ৩৫০। জিরো কিলিংয়ের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি এবং এসব প্রাণহানি আমাদের সবাইকে ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। যাই হোক, প্রাণহানির সংখ্যা কমে আসাটা একটা বড় অর্জন এবং সেদিন খুব দূরে নয়, যখন আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে এবং সীমান্তে আর একজন মানুষও মারা যাবে না।
তিস্তার পানি বিতর্ক সমাধানে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছিলেন। বহু বছরের অবহেলা আর অগ্রগতির অভাবের পর জয়েন্ট রিভারস কমিশনস এবং মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা আবার শুরু হয়েছে। এখন পানি বণ্টনের ন্যায়সংগত এবং টেকসই একটা পর্যায়ে আমরা পৌঁছেছি, যাতে দুই দেশই আইনসম্মতভাবে তার প্রয়োজন মেটাতে পারে। চুক্তি স্বাক্ষরে খসড়া প্রস্তুত থাকলেও মনমোহন সিংয়ের সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরে ব্যর্থতা দুই পক্ষকেই হতাশ করেছিল। যদিও মনমোহন সিং এ জন্য পুরো দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবু বাংলাদেশের হতাশা তীব্র হচ্ছিল এবং অন্যান্য অনেক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছিল। আমরা আত্মবিশ্বাসী থাকলেও কবে চুক্তি স্বাক্ষর হবে এটা বলাটা হঠকারিতা হয়ে যেত। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, দিল্লি চুক্তির এই খসড়ায় আপত্তি করেনি এবং চুক্তি স্বাক্ষরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছে।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যের প্রতিকূলতা অনেক দিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। যদিও বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ যুক্তি দেখাবেন যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি জটিল এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য সামগ্রিকভাবেই দেখা উচিত। তবু আমরা চেষ্টা করেছি বাণিজ্যের বিষয়টি দুভাবে সামলাতে। বাণিজ্যনীতির এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন করে ভারত আমাদের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের দাবিতে রাজি হয়েছে। প্রথম মাসেই আমাদের রপ্তানি শতভাগ বৃদ্ধি হয়েছে এবং আরও বাড়ছে। আরও ভারসাম্য অর্জনের জন্য আমরা ভারতীয়দের উৎসাহ দিচ্ছি এ দেশে বিনিয়োগের জন্য। ভারতের সঙ্গে একতরফাভাবে মুক্ত বাণিজ্য পাওয়াটা আমাদের জন্য একটা মাইলফলক। আমাদের রপ্তানিতে কোনো কোটা বা শুল্ক নেই এবং আমরা ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষের একটা মুক্তবাজার পেয়েছি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুবিধা পাচ্ছি আমরা নানাভাবে। দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ এত দিন পৌঁছাতে পারছিল না বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে। দুই দেশের মধ্যে যে আস্থা ও প্রীতির সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তার সুবিধা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রয়ে সম্মত করিয়েছেন। যদিও এখন ভারত নিজেই বিদ্যুৎ-সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে অগ্রগতি হচ্ছে এবং আগামী বছর মে থেকেই তাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে যেসব জলবিদ্যুৎ শক্তি প্রকল্প স্থাপিত হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ন্যায়সংগত অংশগ্রহণ এবং বিদ্যুতের ভাগ চেয়েছে। ভারত তাতে ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছে। আর বাংলাদেশ-ভারত পাওয়ার গ্রিডে সংযোগ স্থাপনের ফলে বাংলাদেশ এখন ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতেও সক্ষম। চার বছর আগে যা শুধু কল্পনা করা যেত, তা এখন অর্জিত হয়েছে। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্কে এক বিপ্লব দেখছি আমরা, আর এটা অন্য অনেক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের উপ-আঞ্চলিক প্রত্যাশাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে এর অবস্থান। এই অঞ্চলের সংযোগের কেন্দ্রে অবস্থান আমাদের। দক্ষিণ আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আর উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। কলকাতার বন্দর আর উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের মধ্যের দূরত্বকে দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। স্থলবেষ্টিত ভুটান আর নেপালকে সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ দিতে পারে বাংলাদেশ। ট্রান্স-এশিয়ান রেলপথ এবং এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হলো বাংলাদেশ। নেপাল ও মিয়ানমারসংলগ্ন চীনা প্রদেশগুলোর সবচেয়ে কাছে আছে চট্টগ্রাম বন্দর। সড়ক, রেল ও পানিপথের যোগাযোগই শুধু নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বের বিদ্যুৎ শক্তিশালী রাজ্যগুলোর পাওয়ার গ্রিড সংযোগ, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমার থেকে ভারতে গ্যাস পাইপলাইনের কেন্দ্রে আছে বাংলাদেশ। একইভাবে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ শক্তির সুবিধা পাওয়ার জন্য ভারতে প্রবেশের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। সংযোগের এই আন্তনির্ভরতা সবার জন্যই লাভজনক।
ঐতিহাসিকভাবেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসংহত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আছে। ভারত ভাগের পর অবহেলায় এর কিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিছু আবার ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭২ সালে অন্তর্দেশীয় পানি পরিবহন এবং বাণিজ্য চুক্তির ফলে দুই দেশের যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃসংযোগের উদ্যাগ নেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এর সামান্যই অগ্রগতি হয়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নে এই যোগাযোগের গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ২০১১ সালে সাহসিকতার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতার কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পারস্পরিক স্বার্থের সব কটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্যই এই চুক্তি ব্যাপক দূরদর্শিতা ও কার্যকারিতা দেয়। তবে আমাদের সামগ্রিক যোগাযোগ পরিকাঠামোর অবস্থা বিবেচনায় সীমিত কিছু পথই এখন খুলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের চিন্তা ও তার বাস্তবায়নের জন্য কিছু সময়ের ব্যবধান তো থাকবেই। আমাদের যোগাযোগ পরিকাঠামো দুর্বল এবং বাড়তি যানবাহনের সামান্যই ধারণ করতে পারে। তবে এর উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন—এক হিসাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার।
এই বিনিয়োগ পেতে আমাদের সুবিধাগুলো যাতে ভারত ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ বেশি বেশি ব্যবহার করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সৃজনশীল সমাধান। আর এখন যখন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তাঁর অতীতের ভুল স্বীকার করেছেন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েছেন, আমরা আরও সহজে এগোতে পারব।
সরকারের সমালোচকেরা যোগাযোগের এসব সুবিধার বিষয়ে চোখ বন্ধ করে ছিলেন এবং আমাদের উদ্যোগকে আক্রমণ করেছেন ‘ভারতের কাছে সবকিছু বিক্রি করে দেওয়ার’ নীতি বলে। সংযোগ মানেই কোনো সুবিধা দেওয়া নয়, অথবা একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহারের কোনো উপায় নয়। আন্তনির্ভরতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই তা বাস্তবায়িত হয়। এ থেকে বাংলাদেশের লাভ অভূতপূর্ব। সহজভাবে বলা যায়, মিসরের জন্য যেমন সুয়েজ, পানামার জন্য যেমন পানামা খাল—এই যোগাযোগ বাংলাদেশের জন্যও তেমনি এক সম্পদ। আর এটা আমাদের পরিকাঠামো তৈরির জন্য বিনিয়োগও নিয়ে আসবে। ’ট্রানজিট থেকে ভারত বিনা মূল্যে সুবিধা নেবে’ বা ’বাংলাদেশ এ জন্য কোনো মূল্য নেবে না’, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসত্য তথ্য, যার কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশ তার বিবেচনায় ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করবে। এটা সম্পূর্ণ বাংলাদেশের আইনগত অধিকার এবং এ জন্য অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনাও করতে হবে না। বাস্তবতা হলো, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ যেকোনো মূল্য নির্ধারণ করবে। এখন বাজারের চাহিদা কী এটাই বিবেচনার বিষয়।
মনমোহন সিংয়ের সফরে ঘোষিত ভারতীয় নীতির আমূল পরিবর্তনের দুটো বিষয়, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসতে পারে, তা কিন্তু দৃষ্টির অগোচরে রয়ে গেছে। এই প্রথম বাংলাদেশ ও ভারত একমত হয়েছে নদীগুলোর অববাহিকাজুড়ে ব্যবস্থাপনার জন্য। এটা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি। এর ফলে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার বৃদ্ধি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। আরেকটি পরিবর্তন হলো, ভারত প্রথমবারের মতো ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা যেমন বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান ও বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের জন্য সম্মত হয়েছে। এর মধ্যেই সংযুক্ত বিদ্যুৎ প্রকল্প, পানিসম্পদ ভাগাভাগি, স্থল পরিবহন এবং পাওয়ার গ্রিডে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। একই রকম একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে মিয়ানমারের সঙ্গেও। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের অর্জনে সবই আছে, কিন্তু তা বিশ্লেষকেরা এড়িয়ে গেছেন।
আমাদের পাওয়ার এই তালিকায় সবশেষে আরেকটি সংযোগ হবে—ভারতের কাছ থেকে পাওয়া এক বিলিয়ন ডলারের সুদহীন ঋণ। ভারত এই পরিমাণ ঋণ আর কোনো দেশকেই দেয়নি। কোনো প্রকল্প ছাড়া বাংলাদেশ এই পরিমাণ ঋণ আর কখনো পায়নি। বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজনে এই ঋণ ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর ৭০ শতাংশ ভারত থেকে সংগ্রহ করতে হবে। এই ঋণ দেওয়া হয়েছে আইডিএর মতো শর্তে এবং এর ২০০ মিলিয়ন এর মধ্যেই অনুদানে পরিণত করা হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ অর্জনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা যেকোনো বিচারেই এক অসাধারণ কৃতিত্ব। স্বৈরাচারের ইতিহাস, সমাধানের অযোগ্য মনে হওয়া—সব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা অতীতের সমস্যাগুলো মুছে ফেলে সহযোগিতা আর উন্নয়নের নতুন পথ দেখাতে পেরেছেন, চার বছর আগে যা ছিল কল্পনারও বাইরে। শুরুতে তাঁর নীতি আক্রমণের মুখে পড়লেও পরে তিনি দ্বিদলীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছেন। অতীতের ভুল স্বীকার করে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া সাহস দেখিয়েছেন এবং শেখ হাসিনার ভারতনীতি এবং উপ-আঞ্চলিক সংযোগকে সমর্থন দিয়েছেন। আরও অনেক কিছুই করার বাকি। কিন্তু শেখ হাসিনা অমীমাংসিত এবং অস্বস্তিকর বিষয়গুলো পরিষ্কার করেছেন, অতীতের ভুলগুলোকে মুছে ফেলেছেন, যাতে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারি এবং একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য প্রতিচিত্র স্থাপন করতে পারি। যাতে বাংলাদেশ তার সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে থাকতে পারে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
গওহর রিজভী: প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন