মূল রচনা: ধনীদরিদ্র-নির্বিশেষে গড় আয়ু বেড়েছে
এই মাটি এই মানুষ
আনিসুজ্জামান
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে যখন ভারত থেকে ফিরে এলাম স্বজন-হারানো স্বদেশে, তখন চারদিকে কেবল ধ্বংসের স্তূপ। রেললাইন, সাঁকো, পথঘাট বিধ্বস্ত; বাড়িঘর বিপর্যস্ত। বিমানবন্দর অকেজো, বন্দরে মাইন, রেলস্টেশন দুর্গম। হেঁটে হেঁটেই পথ চলছে অসংখ্য মানুষ। কেউ আমারই মতো ফিরে আসছে ওপার থেকে, কেউ দেশের কোথাও থেকে ঢাকার লক্ষ্যে চলছে। এত কষ্ট, তবু নালিশ নেই মুখে, রয়েছে বরঞ্চ পরিতৃপ্তির হাসি।
মনে পড়ছিল, বাংলাদেশের বিজয়লাভের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে বসে আমরা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রসদের হিসাব করেছিলাম। তখন তো ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশের কাছ থেকে এ-ব্যাপারে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ভারতীয় প্রতিনিধিদের কাছে আমাদের চাহিদা ব্যক্ত করা হলো। যখন বললাম, হালের বলদ চাই ২০ লাখ, তাঁরা কপালে চোখ তুলে বললেন, কী! বলা হলো, ভারতে শরণার্থী এসেছে প্রায় এক কোটি, কিছু কমও যদি হয়, দেশের মধ্যে বাস্তুত্যাগীদের দিয়ে সে-সংখ্যা পার হয়ে যাবে। চকিত জরিপে দেখা গেছে, ষাট শতাংশ শরণার্থী কৃষক পরিবারের লোক। যদি ছজনে এক পরিবার ধরি, তবে ১০ লাখ পরিবার। তাদের গরুছাগল তো আর বাড়ির গোয়ালে নেই। পরিবারপ্রতি এক জোড়া হালের বলদ দিলে ২০ লাখ বলদ লাগবে। তারপর এদের ঘর বানাতে বাঁশ লাগবে বিপুল পরিমাণে, জ্বালানির জন্যে কেরোসিন লাগবে যথেষ্ট। রাস্তাঘাট, সেতু, সাঁকো ইত্যাদির পুনর্নির্মাণে উপকরণ লাগবে অনেক। সব কথা শোনার আগেই বন্ধুরা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন।
মোহন সিরিজের লেখক শশধর দত্তের প্রিয় বাক্য ছিল, তারপর কী হইতে কী হইল...। চোখের সামনেই দেখলাম, কীভাবে যেন ঘরদোর দাঁড়িয়ে গেল, চাষবাস চলতে থাকল, পথঘাট মেরামত হলো, সেতু হলো, ফেরি চলল, রেল চলল, ব্যবহারের উপযোগী হয়ে গেল বন্দর। বঙ্গবন্ধুর সরকার নয় মাসে সংবিধান তৈরি করে ফেলল, পরিকল্পনার দলিল লেখা হলো। একটা সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল দ্রুত।
তারপর একদিন দুর্ভিক্ষ হানা দিল, রাষ্ট্রব্যবস্থা পাল্টে গেল। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যাঁরা তাঁরা খুন হলেন কারাগারের অভ্যন্তরে। মানুষ আনল হত্যা ও অভ্যুত্থানের রাজনীতি, সামরিক শাসন, দেশব্যাপী দুর্নীতি। প্রকৃতি আনল ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক উচ্ছ্বাস, বন্যা। সংবিধানের মূল চরিত্র হারিয়ে গেল, মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি বদলে গেল। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিত হলো দুর্যোগের দেশ হিসেবে।
যে-জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে, তারা কিন্তু সবকিছু নীরবে মেনে নেয়নি। গণতন্ত্রের জন্যে তারা আবার লড়াই করেছে। নূর হোসেনের মতো গণতন্ত্রের সৈনিক কটা দেশ তৈরি করেছে? নিরস্ত্র মানুষের প্রতিরোধে যেসব দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম কি বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে না?
মুক্তিযুদ্ধের কালে বাংলাদেশের যে-স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা আজও রূপায়িত হয়নি। অনেক অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে। তার পরও গ্লাসের অর্ধেকটা হলেও পূর্ণ তো!
কিছু হলো না, কিছু হবে না বলে আমরা যারা বিলাপ করি, তারা কি একবার হিসাব করে দেখেছি, বাংলাদেশ হওয়ায় কী কী সুবিধা আমরা অর্জন করেছি—স্বদেশে কিংবা বিদেশে, শিক্ষার ক্ষেত্রে কি চাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে কিংবা পেশায়? শুধু উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তের কথা নয়। খেতের চাষির গায়েও এখন জামা আছে, পায়ে স্যান্ডেল। শহরেই কেবল অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে না, মাটির ঘরের জায়গায় টিনের ঘর উঠছে গ্রামাঞ্চলে। বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা ও শতাংশ কমেছে, ধনীদরিদ্র-নির্বিশেষে গড় আয়ু বেড়েছে।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে, তবু জনসংখ্যা তো ক্রমবর্ধমান। তার পরও দেশটা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল, পুষ্টির অভাব চোখে পড়ার মতো। তার পরও তো শিশু ও প্রসূতির মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমেছে, কিছু কিছু সংক্রামক ব্যাধি দূর করা সম্ভবপর হয়েছে। শিক্ষার মান আশাব্যঞ্জক নয়, বিদ্যালয় থেকে ঝরে-পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুল। তার পরও তো প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়ের সংখ্যা ও হার ক্রমবর্ধমান। এই স্তরে আবার মেয়েদের সংখ্যা বেশি, এটাও গর্ব করে বলার মতো বিষয়।
মেয়েদের বিষয়ে আমরা সত্যিই গর্ব করতে পারি। ফতোয়ার শিকার হয় প্রধানত মেয়েরা, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতিত হয় তারা, অ্যাসিড হামলার শিকার হয়, যৌন হয়রানি থেকেও রেহাই পায় না। তার পরও। ঢাকা যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হয়েছে সদ্য, তখন বিনা পর্দায় রিকশা চড়লে টিটকিরি শুনতে হতো মেয়েদের। সেই চিত্র কীভাবে বদলে গেছে! শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে কত এগিয়েছে মেয়েরা। তৈরি পোশাকশিল্প আমাদের অর্থনীতির একটা বড় অবলম্বন। সেখানকার চাকা সচল রেখেছে মূলত মেয়েরাই।
প্রবাসে কর্মরত শ্রমজীবীরাও অসাধ্য সাধন করেছে। প্রতিকূল পরিবেশে উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তারা টাকা পাঠায় দেশে। তাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়ে, দেশের নানা ক্ষেত্র লাভবান হয়। তাদের বঞ্চনা কম নয়, তার পরও তাদের পরিবার স্বস্তিতে থাকে।
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দানও উল্লেখযোগ্য। ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তাদের ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্রঋণ-কর্মসূচির সাফল্যের জন্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক। শুধু তা-ই নয়, গ্রামীণ ব্যাংকের আদর্শ অনুকৃত হচ্ছে পুঁজিবাদী ইউরোপে ও সমাজতান্ত্রিক চীনে। অন্যদিকে, ব্র্যাকের উদ্যোগ এশিয়া ছেড়ে বিস্তৃত হয়েছে আফ্রিকায়। বাংলাদেশকেই সেসব দেশ মান্য করেছে পথ দেখানোর জন্য। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ এমনই সুনাম অর্জন করেছে যে কোনো দেশে সড়কের নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশের নামে, কোনো দেশে বাংলা ভাষা গৃহীত হয়েছে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলে।
আমাদের কৃষিব্যবস্থা মান্ধাতার আমলের বললে চলে। কিন্তু তারই মধ্যে ধানচাষের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে সাফল্যের সঙ্গে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও আমাদের বিজ্ঞানীরা দেশে-বিদেশে যে-কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল হয়েছে।
অনেক কিছুর ঘাটতি আছে আমাদের, অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে সামনে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে চারটি দশক ধরে আমরা কিছুই অর্জন করিনি। আমাদের নিত্যকার হানাহানি, রুচিহীন ঝগড়াঝাটি, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর প্রতি আঘাত বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করে। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে আমরা সফল হয়েছি, সেসব ক্ষেত্রের কথা সহজে আমরা মনে করি না। বাংলাদেশের সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলাও তার অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ বললে আমার চোখে ভেসে ওঠে ক্ষিপ্রগতি মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব, শহীদ বুদ্ধিজীবীর বিকৃত লাশ। বাংলাদেশের কথা ভাবলে আমার মনে পড়ে সেই মানুষটিকে, যিনি সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দিয়ে তৃপ্ত করেন গ্রামবাসীর পাঠস্পৃহা, সেই রিকশাওয়ালাকে যিনি তাঁর একমাত্র সম্পদ—এক টুকরো জমি—নির্দ্বিধায় দান করেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে। বাংলাদেশের কথা ভাবলে আমার চোখে ভেসে ওঠে বিত্তহীন সেই ব্যক্তির ছবি যিনি নিজের সামান্য সম্বল দিয়ে স্কুল গড়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন চারপাশে কিংবা সেই বালকটির লাজুক মুখ যে গায়ের জামা উড়িয়ে ট্রেন থামিয়ে একাই রোধ করে বড় রকমের দুর্ঘটনা।
আমার ইচ্ছে হয়, কণ্ঠের সবটুকু শক্তি দিয়ে সারা পৃথিবীকে ডেকে বলি, দেখো, বাংলাদেশ মানে ক্রমাগত দৈবদুর্বিপাক নয়, শুধু বিদ্বেষ আর সংঘাত নয়। জেনো, আমার বাংলাদেশ মানে কোটি কোটি মানুষের হূদস্পন্দন, কঠোর জীবনসংগ্রাম, স্বার্থত্যাগ ও আত্মদান, বাংলাদেশ মানে চরিতার্থতার জন্যে অপেক্ষমাণ স্বপ্ন, অশেষ সম্ভাবনা, নতুন সূর্যোদয়।
এই মাটি, এই মানুষ আমার গর্ব।
ড. আনিসুজ্জামান: ইমেরিটাস অধ্যাপক।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






