মনের আনন্দে বই পড়ার আন্দোলন
হাতে বই। গ্রামের রাস্তায় চলেছেন। যাবেন বাড়ি বাড়ি
ছবি: শহীদুল ইসলাম
আমার চালকলে হালখাতার সময় যাঁরা সব বকেয়া পরিশোধ করতেন, তাঁদের একটি করে বই উপহার দিতাম। কোথাও দাওয়াত খেতে গেলে বই ছাড়া কোনো উপহার দিইনি। গ্রামের স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় যেসব শিক্ষার্থী এক থেকে দশের মধ্যে থাকত, তাদেরও একটি করে বই দিতাম। আর যারা দশের পরে থাকত, তাদেরও বই দিতাম, তবে পড়ে ফেরত দেওয়ার শর্তে। এই কাজ শুরু করেছিলাম শুধুই মনের টানে। আর টান তৈরি হয়েছিল আমার যৌবনে, যখন যাত্রায় অভিনয় করতাম, অন্যান্য অভিনেতার বই পড়ে শোনাতাম, পান্ডুলিপি লিখে দিতাম, প্রম্পট করতাম। সেই থেকে বই পড়ার নেশা পেয়ে বসে।
এরই মধ্যে গ্রামাঞ্চলে যাত্রাপালা অনেকটাই উঠে যায়। যাত্রা নাটকের বইও তেমন পাওয়া যায় না। কিন্তু বইয়ের আসন আরও পাকাপোক্ত হয় মনে। এ দিকে আমারও বয়স হয়। ছেলেমেয়েরা বড় হয়। সংসারের দায়িত্বও নেই। শুধুই অবসর। দীর্ঘ অবসরে বই কিনতাম আর পড়তাম। সেই বই পড়তে দিতাম অন্যদেরও।
এরই মধ্যে আমার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। চিকিৎসক প্রতিদিন তিন কিলোমিটার করে হাঁটতে বললেন। তাই প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হতাম। একেক দিন একেক গ্রামে যেতাম। কিন্তু তিন কিলোমিটার পথ আর ফুরোত না। হাঁটতে হাঁটতেই ভাবতাম, কী করলে হাঁটার খাটনিটা ভোলা যাবে।
মনে পড়ে বইয়ের কথা। যারা বাড়ি থেকে বই নেয়, তাদের বাড়িতেই যদি বই নিয়ে যাই তাহলে তারা আরও বেশি উৎসাহিত হবে। এ ছাড়া যারা আমার বাড়িতে বই নিতে আসতে পারে না, তারাও বই পড়ার সুযোগ পাবে। যেমন: গৃহবধূরা কেউই বাড়িতে বই নিতে আসতে পারেন না। অনেক লোকও কাজে ব্যস্ত থাকায় বই নিতে পারেন না। তাঁরা যদি ঘরে বসেই বই পান, তাহলে পাঠকসংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যাবে।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সত্যি হু-হু করে পাঠক বাড়তে থাকল। আড়ানী বাজারের (রাজশাহীর বাঘা উপজেলায়) লাইব্রেরিতে আমার নামে বকেয়া বাড়তে লাগল। কিছুদিনের মধ্যেই ভুলে গেলাম আমি ডায়াবেটিসের কারণে হাঁটি। সকালে উঠলেই একধরনের নেশা রাস্তায় টেনে বের করে। ইচ্ছে করলেও ঘরে থাকতে পারি না। হাঁটার ক্লান্তি কোথায় হারিয়ে যায়। দিনে দিনে আমি মানুষটাই বদলে যাই। পাঠকেরা নতুন কী বই চায় অথবা নিজেই নতুন কী বই তাদের হাতে তুলে দেব—এসব ভাবনাই আমাকে রাত-দিন তাড়া করে ফেরে।
আমার দায়িত্ব ছিল বাউসা ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদারি কর আদায়ের। এতে কিছু কমিশন পেতাম। ওই টাকা দিয়ে বই কিনতাম।
আমি ঠিক বুঝতে পারিনি যে দিনে দিনে কীভাবে এটা একটা সামাজিক আন্দোলনের দিকে এগিয়ে গেছে। সে আন্দোলন গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের ১৫-২০ গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই আমার প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। লোকজনের বাড়িতে জামাই আদর পাই। এ জন্য বাড়ির ছেলেমেয়েরা আমাকে দুলাভাই ডাকতে শুরু করে। এতে আমি খুব আনন্দ পাই।
২০০৭ সালে কী করে প্রথম আলো আমার কাজের খবর পেয়ে যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদক আমার বাড়িতে এসে আমাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করতে চান। শুরুতে আমি জোর আপত্তি করি। আমি প্রচারের জন্য এ কাজ করি না। তখন প্রতিবেদক আমাকে বোঝালেন প্রচারের জন্য নয়, অন্যদের উৎসাহিত করতে এটি ছাপা দরকার। ২০০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আমাকে নিয়ে প্রথম আলোর সাপ্তাহিক আয়োজন ‘ছুটির দিনে’ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হলো ‘বিনি পয়সায় বই বিলাই’। প্রথম আলোর কাছ থেকে সেই ছবিটি নিয়ে গ্রামীণফোন ২৬ মার্চ বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এরপর তারা টেলিভিশনে আমার কাজের ধরন নিয়ে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করতে থাকে। এরপর থেকে কী যেন ঘটে গেল। মিডিয়ায় ঝড় উঠল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলের লোকেরা বাড়িতে আসতে লাগলেন। চ্যানেল আইয়ে ‘আলোয় ভুবন ভরা’ অনুষ্ঠানে নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। সেই বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আমাকে ১৮টিরও বেশি সংবর্ধনা দেওয়া হলো। আমাকে প্রধান চরিত্র বানিয়ে শিমুল সরকারের রচনা ও পরিচালিত নাটক সায়াহ্নে সূর্যোদয় প্রচার করে চ্যানেল আই।
একদিন ঢাকা থেকে লেখক আরিফ মইনুদ্দীন তাঁর লেখা বইয়ের প্রায় ৮০০ কপি নিয়ে আমার বাড়িতে হাজির। তিনি আমার সেরা মেহমান।
ওই বছর (২০০৭ সালে) ১৯ মে রাজশাহীর বাঘায় এক সংবর্ধনায় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, ‘প্রকৃত মানুষ গড়তে আমাদের ঘরে ঘরে পলান সরকারের মতো বইয়ের আলো জ্বালতে হবে।’ এখন আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি, হাসান আজিজুল হকের সেই আহ্বানে অনেক মানুষ সাড়া দিয়েছেন। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বনকিশোর গ্রামের ‘ওরা ১১ জন’ নামের একটি সংগঠনের যুবকেরা ঠিক আমার মতো করেই বাড়ি বাড়ি বই বিতরণের কাজ করছে। পত্রিকায় দেখেছি, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার সবুজ কুমার সরকার নামের এক যুবক ব্যক্তিগত উদ্যোগে একই কাজ শুরু করেছেন। নাটোরের লালপুরে এক যুবক এই কাজ শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের কাজ হচ্ছে বলে খবর পাচ্ছি। ভাবতে ভালো লাগে, আমি আগে এক হাতে মানুষের হাতে বই তুলে দিয়েছি, এখন আমার হাতের সংখ্যা অনেক বেশি।
আমি শুরু করেছিলাম শুধু মনের আনন্দের জন্য; সমাজ, দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে। তখন প্রতিদানের বিন্দুমাত্র আশা ছিল না মনে। ২০১১ সালে একুশে পদক পাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, প্রতিদানের আশায় নয়, কাজ করতে হবে ভালোবাসা থেকে, প্রাণের টানে। তাহলে প্রতিদান নয়, পুরস্কার এসে পায়ে পড়বে।
ইতিমধ্যেই জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে আমার বাড়ির পাশে ‘পলান সরকার ফাউন্ডেশন’ নামে একটি পাঠাগার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা পাঠাগারে আসেন, তাঁরা ইচ্ছেমতো বই পড়েন। এখন আমার বয়স হয়েছে ৯২ বছর। জানি না আর কত দিন হাঁটতে পারব। যত দিন হাঁটতে পারি, তত দিন আমার আন্দোলন চলবেই। আমি হাঁটতে হাঁটতে মানুষের বাড়িতে বই পৌঁছে দেবই। যেদিন আমার পথচলা থামবে, সেদিন এই পাঠাগার আমার পক্ষে আন্দোলন করে যাবে।
অনুলিখিত







আবু নোমান মু. আতাহার আলী
২০১২.১১.২৪ ০৫:৩৯Roushon ara
২০১২.১১.২৪ ০৬:৪১ইকবাল পারভেজ
২০১২.১১.২৪ ০৬:৪২ISLAM
২০১২.১১.২৪ ১০:১০