শ নি বা রে র বিশেষ প্রতিবেদন
পাখির ডানায় জীবিকা
কোয়েল পাখির খামারে মেহেদী হাসান
ছবি: প্রথম আলো
‘পাখি ভুনা। পাখির ভুনা মাংসের সঙ্গে চালের আটার রুটি। দাম ২০ টাকা।’
অল্প দামে মজার এ খাবার খেতে শীতের দিনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় থাকে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের ছোট ছোট হোটেলে।
তবে বিষ দিয়ে শিকারিদের ধরা এ পাখির মাংস শরীরের জন্য বেজায় ক্ষতিকর। আর এভাবে পাখি ধরা পরিবেশ আইনে গুরুতর অপরাধও বটে।
কিন্তু পাখির মাংস মজা। সেই মাংসও খাওয়া যাবে, আবার পরিবেশেরও ক্ষতি হবে না—সেটাও কি সম্ভব?
অসম্ভব মনে হলেও সে চেষ্টা করে যাচ্ছেন পীরগঞ্জের যুবক মেহেদী হাসান। মেহেদীর দেখানো পথে পীরগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার অনেকেই আজ কোয়েল পাখি পালন করছেন। পাখি ও ডিম বেচে দুটো বাড়তি পয়সা রোজগার হচ্ছে।
মেহেদী মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে তিনি পরিবেশের সেবাও করছেন। কেননা, বাণিজ্যিকভাবে পাখি পালন বাড়ানো গেলে কমবে বিল-হাওরে পাখি শিকার। এতে বজায় থাকবে পরিবেশের ভারসাম্য।
জানতে চাইলে পাখি ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক সৌরভ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, পীরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে কোয়েল পাখি বাণিজ্যিকভাবে পালন করা হচ্ছে, সেগুলো বিদেশি প্রজাতির। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে এগুলো পালনে কোনো বাধা নেই। তবে দেশীয় বন্য প্রজাতির কোয়েল পালন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি, কোয়েল ও কবুতর পালন ও চিকিৎসা বইতে লিখেছেন, কোয়েল পাখির আদি জন্মস্থান জাপানে। তিনি কোয়েল পাখিকে লেয়ার ও ব্রয়লার—দুই ভাগে চিহ্নিত করেছেন।
শুরু: পীরগঞ্জ উপজেলার আগ্রা গড়িনাবাড়ি গ্রামে ১৯৮৮ সালে মেহেদী হাসানের জন্ম। সেখানকার বন্দিয়ারা উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে মেহেদীর বাবা এনামুল হক যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে ৩০০ হাঁসের একটি খামার করেন। পরে ২০০০ সালে পীরগঞ্জের সেনগাঁও আমতলী বাজারে দুটি ঘরে বাবা ও ছেলে মিলে গড়ে তোলেন হাঁসের হ্যাচারি। ‘তুষ পদ্ধতি’তে মাসে দু-তিন হাজার বাচ্চা ফুটত আর খামারি-পাইকারেরা বাচ্চা কিনে নিতেন। ডিম আর হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করে মাসে ছয়-সাত হাজার টাকা আয় হতো। ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোটামুটি চলতে থাকে তাঁদের সংসার।
একসময় হ্যাচারি থেকে তাঁদের বেশ রোজগার হয়। আরও বেশি রোজগারের আশায় সিঙ্গাপুরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন মেহেদী। বিদেশে যাওয়ার জন্য ঢাকায় প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ায় ২০০৬ সালে তাঁদের খামার বন্ধ হয়ে যায়। দালালকে দেন তিন লাখ টাকা। দিনক্ষণ ঠিকঠাক হলেও জটিলতার কারণে বাতিল হয়ে যায় বিদেশ যাত্রা। দালালকে দেওয়া টাকাও আর ফেরত পাননি।
ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে কী করবেন এবং কীভাবে ক্ষতি কাটিয়ে উঠবেন, সে চিন্তায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েন মেহেদী। কেটে যায় আরও দু-তিন বছর।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বন্ধুর সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার একটি কোয়েল পাখির খামার পরিদর্শন করেন তিনি। এরপর তাঁর চিন্তা পাল্টে যায়। বাড়িতে ফিরে কোয়েল পাখির খামার ও হ্যাচারি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। দেশে বসেই বেশি টাকা উপার্জনের সম্ভাবনা উঁকি দেয় তাঁর মনে। ফিরে এসে পীরগঞ্জ পৌর শহরে ভাড়া বাসার একটি কক্ষে গড়ে তোলেন কোয়েল পাখির হ্যাচারি। আর খামারটি থাকে তাঁর গ্রামের বাড়িতেই।
বাজিমাত: ২০১১ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার কাপ্তানবাজার থেকে ২০ দিন বয়সী ৯৬টি কোয়েল পাখি কিনে এনে খামারে রেখে বড় করতে থাকেন। খামারে রাখার ২৯ দিনের মাথায় পাখিগুলো ডিম দেওয়া শুরু করে। প্রথম দিনই ৫৮টি ডিম পাওয়া যায়। চার দিনের জমানো ২৫০টি ডিম এনে তিনি তাঁর হ্যাচারিতে ঢুকিয়ে দেন। ১৮ দিনের মাথায় ২৫০টি ডিম থেকে ২৩১টি বাচ্চা ফোটে। মেহেদীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। শুরু হয় নতুন স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম।
হ্যাচারিতে একদিন: সম্প্রতি একদিন মেহেদীর হ্যাচারিতে গিয়ে দেখা যায়, ট্রেতে করে কোয়েলের ডিম নাড়াচাড়া করছেন তিনি। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ডিম ফোটানো হয় সাধারণত ‘ইনকিউবেটর’ বা ‘তুষ পদ্ধতি’তে। কিন্তু মেহেদী ডিম ফোটান নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে। একটি কক্ষে মাচা করে আলাদা প্লাস্টিকের ট্রেতে ডিম রাখেন। এরপর ওই কক্ষের তাপমাত্রা তিনি প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করেন। এ জন্য ‘রুম হিটার’ বা বৈদ্যুতিক বাল্ব ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ডিম থেকে বাচ্চা পাওয়া যায়।
পরে মেহেদীর গ্রামের বাড়ির কোয়েলের খামারে গিয়ে দেখা যায়, ১৬টি খাঁচায় পুরুষ পাখিসহ ৬০০ কোয়েল পাখি আছে। এ খামার থেকে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৪৭০টি ডিম পাওয়া যায়। প্রতি চার দিন অন্তর প্রায় এক হাজার ৮০০ ডিম জমা হয়। এসব ডিম হ্যাচারিতে রাখার ১৮ দিনের মাথায় বাচ্চা ফোটে। এক হাজার ৮০০ ডিম থেকে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৫৫০টি বাচ্চা ফোটে। এভাবে প্রতি চার দিন অন্তর অর্থাৎ মাসে প্রায় সাতবার ১৩ থেকে ১৪ হাজার ডিম হ্যাচারিতে রাখা হয়। সেখান থেকে পাওয়া যায় ১০ থেকে ১১ হাজার বাচ্চা।
মেহেদী জানান, কোয়েল পাখি মুরগির মতো ডিম দেয়। প্রতিটি স্ত্রী পাখি মাসে প্রায় ২৫টি ডিম দেয়। ডিম আকারে ছোট মার্বেলের মতো। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে কোয়েলের ডিমের ভালো চাহিদা আছে।
মেহেদী জানান, এক থেকে সাত দিন বয়সী বাচ্চা ১০ টাকা এবং ১৮ থেকে ২০ দিন বয়সী বাচ্চা ২০ টাকা দরে বিক্রি করেন তিনি।
ব্যবসাপাতি: বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা পীরগঞ্জে এসে কোয়েলের ডিম ও পাখি কিনে নিয়ে যান। পাইকারিতে ডিম বিক্রি হয় আট টাকা হালি দরে।
একটি প্রাপ্তবয়স্ক কোয়েল পাখির ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম মাংস হয়। বাচ্চা ফোটার পর বড় হতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই মাস। স্ত্রী পাখি আকারে সামান্য বড় হয়। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি পাখি ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
দিনবদল: মেহেদীর কাছ থেকে পরামর্শ ও সহায়তা নিয়ে পীরগঞ্জ এবং এর আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় গড়ে উঠেছে কোয়েল পাখির অনেক খামার। এর মধ্যে পীরগঞ্জের উত্তর নওপাড়ার মানিক রায় ও ধনঞ্জয় রায়, মল্লিকপুর গ্রামের সাহাবুল আলম, বৃদ্ধিগাঁওয়ের জবাইদুর রহমান, আগ্রা গ্রামের কৈলাশ চন্দ, আমতলীর নজেন্দ্রনাথ রায়, দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের বকুলতলার সোহাগ ও কাহারোল উপজেলার জয়নন্দের পলাশচন্দ্র রায় কোয়েল পাখির খামার গড়ে তুলেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের খামারে ১০০ থেকে এক হাজার পর্যন্ত পাখি আছে। তাঁরা সবাই মেহেদীকে তাঁদের ওস্তাদ মানেন। প্রতিদিন পরামর্শ নিতে আসেন।
উপলব্ধি: মেহেদী মনে করেন, বাণিজ্যিকভাবে পাখি পালন বাড়াতে হবে। তাতে পাখি নিধন অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। মানুষ যাতে হাতের কাছেই কম দামে পাখির মাংস ও ডিম পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এটা করা সম্ভব হলে পাখির সঙ্গে রক্ষা পাবে পরিবেশ; সঙ্গে আমিষের চাহিদাও মিটবে।







Md. Julfiqar Ali
২০১২.১১.২৪ ০৪:০০Syful Islam Tonmoy Wvc
২০১২.১১.২৪ ০৪:১৮মাহতাব হোসেন # বাউফল # পটুয়াখালী #
২০১২.১১.২৪ ০৮:০৪Eng. S.R Minar
২০১২.১১.২৪ ০৯:৪০Bashir Uzzaman
২০১২.১১.২৪ ০৯:৫২Mohammad Morshed
২০১২.১১.২৪ ১০:০৩
২০১২.১১.২৪ ১০:০৮NIBRITTA KUMAR DHALI
২০১২.১১.২৪ ১২:১৫আবু সাকী মাহবুব
২০১২.১১.২৪ ১২:২৬Babul Nokrek
২০১২.১১.২৪ ১৪:৩৭সোনার ছেলে মেহেদী হাসান, অভিনন্দন তোমায়...
ARUP
২০১২.১১.২৪ ১৬:৪৩আমার নামবার --০১৭৭০৭৪৯৪২৫ এবং মেইল --ARUP996@GMAIL.COM
Bappy
২০১২.১১.২৪ ১৯:১১