বিশ্রাম আর পরিশ্রমের দিন
ড্যারেন স্যামির আশা পূরণ হলো। তৃতীয় দিনের পুরোটা ড্রেসিংরুমে বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন। তা-ই নিলেন। শুধু স্যামি কেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রায় পুরো দলই তো!
লাঞ্চের তিন বল আগে ড্যারেন ব্রাভো আউট হলেন। বাকি দিন তাঁর আর কোনো কাজ নেই। দিনের শেষ আধঘণ্টা ব্যাটিং করলেন দিনেশ রামদিন। এর আগে তাঁরও তো বিশ্রামেই কাটল সারা দিন। খেলাটাকে যদি ‘পরিশ্রম’ বলেন, সেটি করলেন শুধু মারলন স্যামুয়েলস ও শিবনারায়ণ চন্দরপল। তবে তা নিয়ে দুজনের কেউই অভিযোগ করবেন বলে মনে হয় না!
সারা দিনে খেলা হলো ৩৬৫ মিনিটের মতো। এর ৩৩৬ মিনিটই মাঠে ছিলেন স্যামুয়েলস। চন্দরপলও খুব পিছিয়ে নেই। উইকেটে তাঁর ২৪৮ মিনিট কাটানো হয়ে গেছে। জেনে আশ্চর্য হতে পারেন, দিন শেষে স্যামুয়েলসের চেয়ে তাঁর মুখের হাসিটাই বেশি চওড়া!
টানা দ্বিতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি করে চন্দরপল এখনো অপরাজিত। তবে রান তো স্যামুয়েলসের চেয়ে ১৫১ কম। তাহলে তাঁর হাসিটা বেশি চওড়া হবে কেন? কারণ হলো, তাঁর শুধু প্রাপ্তির আনন্দই, স্যামুয়েলসের যে হারানোর বেদনাও আছে! ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি পেয়েছেন। আগের সর্বোচ্চ ১২৩ রানকে অনেক পেছনে ফেলে ১০ ঘণ্টা ১৮ মিনিটে করেছেন ২৬০। আড়াই শ পেরিয়ে না গেলে হয়তো ডাবল সেঞ্চুরিটাকেই অনেক বড় পাওয়া বলে মানতেন। কিন্তু এখন যে ৪০ রানের জন্য ট্রিপল সেঞ্চুরিটা হারিয়ে ফেলার দুঃখটাই বড় হয়ে উঠছে। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে স্যামুয়েলস তা গোপন করার চেষ্টাও করলেন না।
দুঃখটা বেশি হওয়ার একটা কারণ হয়তো এটাও যে ট্রিপল সেঞ্চুরিটা নিয়তি-নির্ধারিত বলেই মনে হচ্ছিল একসময়। সকালে প্রায় নতুন বলে রুবেল ও হাসান নেহাতই দুর্ভাগ্যের কারণে তাঁকে ফেরাতে পারলেন না। দিনের চতুর্থ ওভারেই হাসানের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচেও গেলেন নাঈমের সৌজন্যে। লাঞ্চের পর স্লিপেই ক্যাচ পড়ল আরেকটি। এবার ‘জীবনদাতা’র নাম শাহরিয়ার নাফীস। প্রথমবার স্যামুয়েলসের রান ১১৭, দ্বিতীয়বার ১৯৩।
লাঞ্চের পর রুবেলের প্রথম বলেই এলবিডব্লুর যে আবেদনটি নাকচ হলো, সেটি পুরোনো আক্ষেপটা আবারও জাগাল। টাকাপয়সা যা লাগে লাগুক, বিসিবি কেন ডিআরএসের ব্যবস্থা করছে না! ভাগ্যদেবী যে এদিন স্যামুয়েলসের কণ্ঠলগ্নাই হয়ে আছেন, সেটির সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলল, যখন সাকিবের বল গড়িয়ে গড়িয়ে স্টাম্পে লাগার পরও বেল পড়ল না!
স্যামুয়েলস খেলছিলেনও যেন ট্রিপল সেঞ্চুরি পাওয়ার জন্যই। প্রথম সেশনে ৮১ বলে ৮২ রান। লাঞ্চের পর পরই ডাবল সেঞ্চুরি পেয়ে যাওয়ার পর কোথায় আরও হাত খুলবেন, দ্বিতীয় সেশনে হয়ে গেলেন ‘জিওফ বয়কট’! যাঁর সম্পর্কে একবার কিথ ফ্লেচার মজা করে বলেছিলেন, ‘দ্য বেস্ট স্লো ব্যাটসম্যান আই হ্যাভ এভার সিন।’
দ্বিতীয় সেশনে ৮৬ বলে মাত্র ২৯ রান। ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য খেলাটা এমনিতে টিম গেমে খুব ঘৃণার চোখে দেখা হয়। ব্রায়ান লারার ৪০০ রানের রেকর্ডের পরও যেটি নিয়ে খোঁচা দিতে ছাড়েননি স্টিভ ওয়াহ। লারার রেকর্ডস্পৃহা ম্যাচ জয়ের ইচ্ছার চেয়েও বড় হয়ে গিয়েছিল ইঙ্গিত করে ওয়াহ বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার কেউ কোনো দিন এমন রেকর্ড করার সুযোগ পেত না। কথাটা যে বাগাড়ম্বর নয়, গত কিছুদিনে দু-দুবার তা প্রমাণ করেছেন মাইকেল ক্লার্ক। একবার অপরাজিত ৩২৯ রানে ইনিংস ঘোষণা করে আর এই কদিন আগে অপরাজিত ২৫৯ রানে।
কাল অবশ্য স্যামুয়েলসের চাওয়া আর দলের চাওয়া একরকম মিলেই গিয়েছিল। রানের গতিটা আরও বেশি হলে নিশ্চয়ই স্যামি আপত্তি করতেন না। তবে সারা দিন ব্যাটিং করাটাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। আজ হয়তো তাঁর চাওয়ার তালিকায় দ্রুত রান করাটা অগ্রাধিকার পাবে। এখনই ১৭৭ রানে এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইনিংস ঘোষণাটা লাঞ্চের পর না যাওয়ারই কথা।
বিশ্রাম আর পরিশ্রমের কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল লেখাটা। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা বিশ্রাম করল আর পরিশ্রমের কাজটা পুরোই বাংলাদেশ। প্রায় দুই দিন মাঠে রোদে পুড়তে হলো। গত পরশু সকালে ২ উইকেটের পর কাল সারা দিনে আর ২ উইকেট। দ্বিতীয় ও তৃতীয় উইকেটের মধ্যে ব্যবধান ৯৮ ওভার!
পেসারদের দুঃস্বপ্নের নামান্তর ধীরগতির উইকেটেও রুবেল দুর্দান্ত বল করেও ভাগ্যের সৎছেলেই হয়ে থাকলেন। স্যামুয়েলসের উইকেটটি তা-ও কিছুটা সান্ত্বনা হয়ে এসেছে। ব্রাভোর উইকেটটি সোহাগ গাজীর। টেস্টে নেমেই যাঁকে অবিশ্রাম বল করে যেতে হচ্ছে। দু-একটা বল একটু টার্ন করেছে। তবে তা খেলতে এত সময় পাওয়া গেছে যে ব্যাটসম্যানরা চাইলে ওর মধ্যে কমলালেবু ছিলে একটা কোয়া মুখে দিয়ে ফেলতে পারতেন! এটা এমন এক উইকেট, যাতে ভালো ব্যাটসম্যানরা ১০ রানে আউট হয়েও বলবেন, ‘সেঞ্চুরি মিস হয়ে গেল!’
সেঞ্চুরির কথা যদি বলেন, অভিষেক টেস্টেই খুলনা তা বেশ কটিই দেখে ফেলল। স্যামুয়েলস-চন্দরপলের কথা তো বলাই হলো। সেঞ্চুরি করেছেন ড্যারেন ব্রাভোও। কাকতালীয়ভাবে, বাংলাদেশ দলেও কাল তিন ‘সেঞ্চুরিয়ান’! সমস্যা হলো, সেই সেঞ্চুরিতে গর্বের কিছু নেই। এটি যে বোলিংয়ে রান দেওয়ায় সেঞ্চুরি!
তরুণ আবুল হাসান অভিষেক টেস্টেই মুদ্রার দুই পিঠই দেখে ফেলেছেন। ‘১১৩’ সংখ্যাটাও তাঁর মনে এখন আর শুধুই আনন্দের অনুভূতি নয়। সেটি উপহার দিচ্ছে মিশ্র অনুভূতি। ব্যাট হাতে করেছিলেন ১১৩ রান, এখন পর্যন্ত বোলিংয়েও রান দিয়েছেন ঠিক ১১৩-ই!
কাকতালীয় আর কাকে বলে!
তৃতীয় দিনের শেষে
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩৮৭
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ৫৬৪/৪







Jobothi kaka bola
২০১২.১১.২৫ ০৩:২৮