পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
আলোর প্রান্তরে আলোহীন শিক্ষক-শিক্ষার্থী
প্রতিটি মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা বিরাজিত। একটি বুদ্ধিবৃত্তি, অপরটি পশুবৃত্তি। মানুষের মধ্যে যাতে পৈশাচিক, বন্য এবং হিংস্র রূপটি সক্রিয় না হয়ে মানবিক গুণাবলি জাগরিত হয়, সে জন্য আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরটিকে ধারণ করা হয়, মাধ্যমিক স্তরে জ্ঞানেরও মাধ্যমিক স্তর, এভাবেই উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তর। আমাদের শিক্ষার সবচেয়ে বড় স্তরটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানবতাকে ধারণ করবেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি হয় মাটির প্রদীপ, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে নক্ষত্র। কিন্তু সম্প্রতি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ঘটনা জাতিকে ভীষণভাবে আহত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ঘটনা মানে আমাদের নক্ষত্র রূপ আলোকিত হয়ে ওঠার পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর শিক্ষার্থীকে আঘাত করেছেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষক প্রহূত হয়েছেন। এ তিনটি ঘটনায় একটিই ঐক্য—আক্রমণকারী ছাত্রদের গায়ে ছাত্রলীগের লেবেল আঁটা আছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতি আন্দোলন করছিল উপাচার্য, সহ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষের দুর্নীতির অভিযোগে তাঁদের পদত্যাগ চেয়ে। সেখানে ছাত্রলীগের আক্রমণ করা এবং উপাচার্য এই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না দেখে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি উপাচার্য নিজেই ছাত্রদের পাঠিয়েছিলেন আন্দোলন প্রতিহত করতে? অন্যদিকে ঘটনার সময়ে পুলিশ সেখানে দাঁড়িয়ে, নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও পীড়াদায়ক। আন্তবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষককে প্রহার করেছেন। লাঠি নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁকে দ্বিতীয়বার মারার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন। কয়েকজন শিক্ষক তাঁদের সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। পরদিন বিষয়টি নিয়ে যখন শিক্ষকেরা মিটিংয়ে বসেছিলেন, তখন সেই শিক্ষার্থীরা জুতা হাতে নিয়ে শিক্ষকের উদ্দেশে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে মিছিল করেছেন। একদিকে শিক্ষকেরা লজ্জায়, অপমানে, ক্ষোভে, দুঃখে চোখের পানি মুছতে মুছতে মিটিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ করতে ব্যস্ত। ঘটনাটি ঘটে গত ৯ অক্টোবর বিকেলে। মিটিং যখন হচ্ছিল, তখন ১০ অক্টোবর বেলা একটা। যেদিন এ ঘটনা ঘটে, সেদিনই যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে পরদিন জুতা হাতে নিয়ে মিছিল করতে পারত না। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে নয়, রাষ্ট্রীয় আইনও তো ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি কোনো দাবি না দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হতো কি না, তা অনুমান করে বলাও কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে শিক্ষক সমিতি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের স্থায়ী বহিষ্কার দাবি করে মৌন মিছিল করেছিল, ক্লাস বর্জনের কর্মসূচি দিয়েছিল। অথচ প্রশাসন শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শিক্ষকদের এই আন্দোলন করতে হতো না। শিক্ষক সমিতি যখন তাদের দাবি জানায়, সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। শিক্ষক সমিতি একটি সংগঠন। এখানেও যে ছাত্র শিক্ষককে মেরেছেন, তিনি ছাত্রলীগ নামধারী। (নামধারী বলছি এ কারণে যে এখানে ছাত্রলীগের কোনো শাখা নেই, কিন্তু ছাত্রলীগের নামে অনেক কর্মকাণ্ড তাঁরা করে থাকেন)।
ছাত্রদের এ রকম আচরণের দায় শিক্ষকেরাও এড়াতে পারেন না। এক দিনে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস পান না। তার জন্যও দীর্ঘ পটভূমির প্রয়োজন হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি উপাচার্য কর্তৃক ছাত্ররা ব্যবহূত হন, তাহলেও তো বলতে হয় সেই উপাচার্যরাও কি শিক্ষক পরিচয়ের বাইরে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অশুভ কাজের দায় অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন, তাঁরা ভাবেন না তাঁদের সন্তানকে তাঁর শিক্ষকেরা অনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করবেন। আমরা যখন তাঁদের অনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করি, তখনই তাঁরা সাহস পান। যাঁরা শিক্ষার্থীদের এভাবে ব্যবহার করেন তাঁরা নিজেদের সন্তানকে দিয়ে ওইসব কাজ করাতে পারতেন না।
বর্তমানে যাঁরা ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা হয়তো প্রতিদিন খবর পড়ে জানতে পারছেন যে ছাত্রসংগঠন করা মানে ঔদ্ধত্য দেখানো। ফলে তাঁরা ঔদ্ধত্য প্রদর্শনে পিছিয়ে নেই। ছাত্রদের কাছে পরামর্শ, তাঁরা যেন নিজ নিজ গঠনতন্ত্র দেখে রাজনীতির চর্চা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় মুখগুলো দেখতেই তো অনেক ভালো লাগে। তাঁদের হাতে আমাদের ভবিষ্যৎ। খুব ইচ্ছা করে এ রকম দেখতে যে সহিংস ছাত্রসংগঠনগুলো অহিংস হয়ে দেশ গঠনের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটি কতক দলবাজি করা শিক্ষক আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ছাত্রদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহৎ অংশের সম্মান ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া উচিত নয়। শিক্ষকেরা যেমন চান তাঁদের সম্মান অটুট থাকুক, তেমনি শিক্ষার্থীরাও চান তাঁদের ভাবমূর্তিতে কোনোরূপ আঘাত না আসুক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের জন্য কেন ছাত্রদের ব্যবহার করা প্রয়োজন হবে, কেন পুলিশ প্রয়োজন হবে। তাঁরা তো হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বলতর মধ্যমণি। তাঁরা কেন ব্যক্তিস্বার্থের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মান বিকিয়ে দেবেন? দেশের অনেক উপাচার্য সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তাঁরাও হয়তো মনে করছেন, দুর্নীতি নিয়ে যে যা-ই বলুক না কেন, বহাল তবিয়তেই থাকতে পারবেন। এ রকম তো একটি ঘটনাও বর্তমান সরকারের সময়ে ঘটেনি যে স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্যায় কাজ করার কারণে কোনো উপাচার্যকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। সরকার নিশ্চয়ই জানে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন উপাচার্য কোন দুর্নীতি বা অনিয়ম করছেন। সেই খবর জানার জন্য গণমাধ্যম কিংবা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। সরকারি সংস্থার প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে পারে। যদি সেটাও করা হতো তাতে করেও অনেক উপাচার্য তাঁদের চাকরিচ্যুতির ভয়ে হলেও অন্যায় করা থেকে দূরে থাকতেন। তখন হয়তো আর তাঁদের ব্যক্তিস্বার্থে দলবাজি করা মানবতা এবং শিক্ষার আলোবিবর্জিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রয়োজন হতো না।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






