মাদকাসক্তের চিকিৎসা হবে দীর্ঘমেয়াদি
(বাঁ দিক থেকে) আহমেদ হেলাল, মোহিত কামাল, জোবায়ের মিয়া ও আবদুল্লাহ আল বাকী
১২ অক্টোবর বিকেল পাঁচটায় পাবনা মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মুক্তমঞ্চ মিলনায়তনে পরামর্শ সহায়তা ৩১-এর আসর। এ আসরে উপস্থিত ছিলেন মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল, আহমেদ হেলাল ও পাবনা মেডিকেল কলেজ ও মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসক মো. জোবায়ের মিয়া ও আবদুল্লাহ আল বাকী। অনুষ্ঠানে আলোচিত বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
অনেকে মনে করেন, চিকিৎসকের কাছে এলে রোগী ভালো হবে। মাদকের ক্ষেত্রে এ ধারণা ঠিক নয়। মাদকের চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এখানে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রোগী ভালো হওয়ার আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে লেগে থাকতে হবে। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ১০-১২ বার মাদকাসক্ত হওয়ার পরও রোগী ভালো হয়। মাদকাসক্ত রোগীকে গোপনে চিকিৎসা এবং মানুষের সঙ্গে না মিশতে দেওয়ার একধরনের প্রবণতা আছে। এটা ঠিন নয়। একে একটা স্বাভাবিক আর দশটা রোগের মতো মনে করতে হবে। অন্য রোগের ক্ষেত্রে আমরা যেমন সবার সঙ্গে পরামর্শ করি, খোলামেলা চিকিৎসা করি—মাদকাসক্ত রোগীকে সেভাবে চিকিৎসা করতে হবে।
শুধু পাবনা নয়, সারা দেশর তরুণ সমাজই মাদকে আক্রান্ত। গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য এখন পাবনায় পাওয়া যায়। আবার চামড়াশিল্পের একধরনের আঠাও মাদক হিসেবে কেউ কেউ ব্যবহার করে। এক হিসাব মতে, জিডিপির ১ শতাংশ ব্যয় হয় মাদক গ্রহণের জন্য। আরেকটি বড় রকমের দুশ্চিন্তার কারণ হলো, শুধু তরুণেরাই মাদকে আক্রান্ত না। মাদকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যেমন রয়েছে ১৩-১৪ বছরের শিশু, তেমনি রয়েছে চাল্লিশোর্ধ্ব মানুষও। আবার শুধু উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তরাই মাদকে আক্রান্ত, তা নয়। এখন ছাত্র, নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী—সবাই মাদকে আক্রান্ত।
কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালিজনিত (ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস) সমস্যা নিয়ে সাধারণ হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন সাধারণ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা আমাদের কাছে পাঠান। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি, লিভারের কাজ করার ক্ষমতা কমে গেছে। শরীর ও মনে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাবনায় সরকারি মানসিক হাসপাতালসহ কিছু নিরাময় কেন্দ্রে মাদকের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।
দর্শক-শ্রোতার বক্তব্য: আমার বয়স ৩৮ বছর। কোনো মাদক গ্রহণ করিনি। এমনকি একটা সিগারেট পর্যন্ত স্পর্শ করিনি। অনেকে মাদক গ্রহণের জন্য হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণের কথা বলেন। আমার কাছে এগুলো খুব দুর্বল ও খোঁড়া যুক্তি মনে হয়। আমার নিজের জীবনে অনেক পাওয়া না-পাওয়ার হতাশা আছে। ব্যর্থতা আছে। এসব কারণে কখনো মাদক গ্রহণের কথা মনে হয়নি, বরং এ সময়গুলোতে আরও বেশি করে শিল্পচর্চার মধ্যে থেকেছি। আমার ধারণা, যারা মাদক নেয়, তারা অধিকাংশই কৌতূহল থেকে, শখ করে ও বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডায় পড়ে নেয়।
দশক-শ্রোতার বক্তব্য: আমি একটি কলেজে অধ্যাপনা করি। মাদক বিষয়ে আমার লেখা আছে। ছাত্রছাত্রীদের এ বিষয়ে পরামর্শ দিই। সিগারেটকে নিয়ম করে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ, মাদকের মূলে রয়েছে সিগারেট। সিগারেটের হাত ধরেই মানুষ সর্বপ্রকার মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাই সাধারণভাবে না দেখে এটাকে একটা মারাত্মক মাদক হিসেবে দেখতে হবে। আমরা পাঁচ বোন, দুই ভাই। আমরা, বোনদের স্বামীরা, তাদের ছেলেমেয়েরা, ভাই, ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা কেউ ধূমপান পর্যন্ত করে না। সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। একেকটা করে বাংলাদেশের সব পরিবার তাদের সদস্যদের জীবনের শুরু থেকে এ বিষয়ে লক্ষ করলে আজকের এ দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি হতো না।
বক্তব্য: আমার পরিবারে কোনো মাদকাসক্ত নেই। ধূমপান করি। ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছি। আমার দৃষ্টিতে পাবনা হচ্ছে মাদকের স্বর্গরাজ্য। সর্বশেষ নতুন মাদকটিও সঙ্গে সঙ্গে পাবনায় পাওয়া যায়। যারা মাদকাসক্ত, তারা আজকের অনুষ্ঠানে আসেনি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা যাতে অধিক সংখ্যায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের আগে আমাদের জানালে আমরা মাদকাসক্ত রোগীদের হাজির করতে পারব। তখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাদের পরামর্শ দেবেন। তাতে প্রকৃত মাদকাসক্ত রোগীরা হয়তো নতুন জীবন পাবে। এ বিষয়টি বিবেচনার জন্য অনুরোধ করছি।
বক্তব্য: আমি একজন ছাত্র। আমাদের পরিবারের কেউ ধূমপান করে না। একজন শিক্ষিকা বললেন, পরিবার থেকে সচেতনতা বা ধূমপানসহ মাদক গ্রহণের শিক্ষাটি নিতে হবে। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমি যে ধূমপান করি না, এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার পরিবারের। আমার বাবা জীবনের শুরুতেই ধূমপান না করার কথা বলেছেন। ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলোর কথা বলেছেন। আমার চারপাশে অনেকেই ধূমপান করে। কিন্তু আমার সব সময় বাবার কথা মনে হয়।
প্রশ্ন: গাঁজা নিলে কি কোনো ক্ষতি হয়? ক্ষতি হলে তা কী ধরনের?
উত্তর: গাঁজা নিলে অবশ্যই ক্ষতি হয় এবং ক্ষতিটাও খুব মারাত্মক। গাঁজা সম্পর্কে যে ধারণার কথা শোনা যায়, সেটা মোটেই ঠিক নয়। অনেকে এটাকে স্বাভাবিক মাদক বা হালকা হিসেবে দেখে। তারা মনের আনন্দে গাঁজা টেনে যাচ্ছে। আসলে তারা জীবনের ভয়ংকর দিনগুলো ডেকে আনছে। আপনারা শুনলে আশ্চর্য হবেন, গাঁজার মধ্যে ৬০ ধরনের রাসায়নিক উপকরণ (কেমিক্যাল এজেন্ট ) আছে। ধোঁয়ার মাধ্যমে এটা প্রথমে ফুসফুসে যায়। তারপর রক্ত, রক্ত থেকে মাথা এবং মাথা থেকে কোষে যায়। ৬০ প্রকার রাসায়নিক উপকরণের মধ্যে একটা উপকরণ খুবই ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। এটাকে বলে টিএইচসি (টেট্রা হাইড্রো ক্যানাবিনল) এটা একবার স্নায়ুকোষের মধ্যে ঢুকলে এক বছর থাকে এবং শরীরকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গাঁজা অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি করে। ঘুম, আচরণ ও যৌন সমস্যাসহ নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। সন্দেহপ্রবণতা তৈরি হয়। ফলে স্ত্রীসহ বাসার মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। স্বামী-স্ত্রী ছাড়াছাড়ির একটা বড় কারণ গাঁজা। তাই এটাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ একেবারেই নেই, বরং এটা অন্য যেকোনো মাদকের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর ও ভয়ংকর।
প্রশ্ন: অনেকে বলেন, মাদক ছাড়তে পারব কিন্তু সিগারেট ছাড়তে পারব না। এ বিষয় আপনাদের অভিমত কী?
উত্তর: সিগারেট থেকে মাদকের শুরু। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মাদকের নীল ছোবলে যারা আক্রান্ত, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে ধূমপান থেকে মাদকের জগতে এসেছে। ধূমপানকে কোনোক্রমেই হালকাভাবে দেখা যাবে না। একজন মানুষ যখন মাদক ছেড়ে দেয়, তখন মাদকের ওপর তার নির্ভরশীলতা কমে যায়। কিন্তু ধূমপানের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে যায়। ফলে সে আবার মদ, গাঁজা, হেরোইনসহ সব ধরনের মাদকের দিকে ফিরে যাবে—এটি একপ্রকার নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই এই ঘাতক নেশাদ্রব্যটি থেকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
উত্তর: সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এ ধরনের অনুষ্ঠান খুবই প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে মাদক গ্রহণের মাত্রা কমে যাবে। একটি মাদকমুক্ত সমাজ আমাদের গড়তে হবে। তা না হলে তরুণেরা অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। একটি বাস্তব ঘটনা বলি, একজন প্রকৌশলী তাঁর সন্তানকে গাঁজামুক্ত রাখার জন্য খুলনা থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন। মা-বাবা তাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেন। সন্তান একদিন মা-বাবাকে বলল, আমাকে কিছু টব কিনে দাও, ফুলের চাষ করব। তাঁরা খুশি হয়ে টব কিনে দিলেন। মা-বাবা, বন্ধুবান্ধব সবাই ফুলের গাছে পানি দিচ্ছে। গাছ বড় হচ্ছে, সন্তানও বেশি মাত্রায় অসুস্থ হচ্ছে। ভয়ানক খারাপ অবস্থায় একদিন বাবা-মা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিলেন। গোপনে সে চিকিৎসককে বলল, বাজারের গাঁজায় আমার কাজ হয় না। তাই গাঁজার গাছ লাগিয়ে গাঁজা খাই। কিন্তু চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে দেখলেন, তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। এখন তাকে বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন। যারা গাঁজাকে মাদক মনে করেন না, তাঁদের জন্য এই ঘটনাটি বললাম।
প্রশ্ন: আমার গ্রামে ৪০ জন ছেলের মধ্যে আমি ছাড়া ৩৯ জনই সিগারেট খায়। তাদের সঙ্গে আমাকে চলাফেরা করতে হয়। সিগারেট খেতে নিষেধ করলে বলে, ‘কম দামি সিগারেট খেলে ক্ষতি হয় না—বেশি দামি খেলে ক্ষতি হয়।’ তাদের কথা কি ঠিক?
উত্তর: আপনার গ্রামের ছেলেদের কথা মোটেই ঠিক নয়। কম দাম, বেশি দাম কোনো বিষয় নয়। মূলকথা, ধূমপান করলেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। দাম কম-বেশির জন্য সিগারেটের স্বাদের ভিন্নতা হয়। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ উভয় সিগারেটে সমান। তাই সব ধরনের ধূমপান সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। ধূমপান হচ্ছে অন্য সব মাদকের উৎস। সিগারেটের মধ্যে নিকোটিন থাকে। এ জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধূমপানকেও মাদক বলেছে। আপনি যদি তাদের সঙ্গে চলাফেরা করেন, তাহলে আপনি পরোক্ষ ধূমপানকারী হবেন। এ ক্ষেত্রে তাদেরও যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, আপনারও সে পরিমাণ ক্ষতি হবে। কারণ, তারা যখন ধূমপানের ধোঁয়া ছাড়ছে, আপনার নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে। তাই আপনিও তাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
প্রশ্ন: স্মোক বাইট কী? আপনারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কেন ধূমপান বন্ধ করার কথা বলেন না।
উত্তর: স্মোক বাইট একধরনের নেশা। স্মোক বাইট বলতে গোখরার মতো বিষধর কোনো সাপের কামড় নয়। কেউ কেউ আছে, সাধারণ সাপের কমড় নিয়ে একপ্রকার উত্তেজনা অনুভব করে। তবে আমাদের দেশে এ রোগীর সংখ্যা খুব কম। এর চিকিৎসা অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি। রাস্তার পাশে মাদক গ্রহণ করছে, সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকছে, যারা মাদকের ব্যবসা করছে, তাদের নিয়ে আমরা কাজ কারি না। তাদের জন্য দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ আছে, তারা এসব ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। যেভাবেই হোক, যারা মাদক গ্রহণ করে সমস্যায় পড়েছে, তাদের মাদক থেকে তুলে এনে সেবা দিয়ে সুস্থ করার পথ দেখানো আমাদের কাজ।
প্রশ্ন: ইয়াবার কথা খুব শোনা যায়। ঢাকা শহরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর ব্যবহার খুব বেশি। ইয়াবা কেন মানুষ নেয়? এর ক্ষতিকর দিকগুলো কী?
উত্তর: ইয়াবা নতুন কোনো মাদক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর আবিষ্কার। অনেকে মনে করেন, এটা খেলে রাত জাগা যায়, শক্তি পাওয়া যায় ইত্যাদি। এগুলো খুবই সাময়িক। অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় একটু হয়তো আনন্দ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পরই এর ভয়াবহ ক্ষতিকর দিকগুলো বোঝা যায়। শরীর আস্তে আস্তে অসাড় হয়ে দুর্বল হয়। উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে অনেক কষ্ট হয়। যৌনশক্তি কমে যায়। বিষণ্নতা দেখা দেয়। মানসিক বৈকল্য তৈরি হয়। সমাজ ও জীবন থেকে ছিটকে পড়ে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাধারণ মাদকের চিকিৎসার চেয়ে ইয়াবা গ্রহণকারীর চিকিৎসা খুব দীর্ঘমেয়াদি। তাই অন্য যেকোনো মাদকের চেয়ে ইয়াবা অনেক বেশি ভয়ংকর ও ক্ষতিকর।
পাবনায় পরামর্শ সহায়তা আসরটি সঞ্চালন করেন প্রথম আলো ট্রাস্ট মাদকবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কারী ফেরদৌস ফয়সাল।
গ্রন্থনা: আশফাকুজ্জামান
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






