জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের অর্থ আত্মসাৎ
হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
বহুল আলোচিত হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবিরকে আসামি করে মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার ১১টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁদের মধ্যে হলমার্কের সাতজন এবং সোনালী ব্যাংকের ২০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন) শাখা থেকে ভুয়া ঋণপত্র বা এলসির মাধ্যমে হলমার্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের ছয় সদস্যের অনুসন্ধান দলের সদস্যরা বাদী হয়ে রমনা মডেল থানায় এসব মামলা করেন। তাঁরা আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, পরস্পরের যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থের সব অপব্যবহার-সংক্রান্ত মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এনেছেন। মামলাগুলো করেছেন দুদকের অনুসন্ধান দলের সদস্য জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী, উপপরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঞা, সহকারী পরিচালক মো. মশিউর রহমান, নাজমুচ্ছায়াদাত, উপসহকারী পরিচালক মো. মজিবুর রহমান ও মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন।
মোট ১১টি মামলায় হলমার্ক গ্রুপ ফান্ডেড দায় হিসেবে এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে জানান অনুসন্ধান দলের প্রধান মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী। দুদক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক মোট দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এর মধ্যে স্বীকৃত বিলের বিপরীতে পরিশোধিত (ফান্ডেড) অর্থ হচ্ছে এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওই ফান্ডেড দায় লোপাটের সঙ্গে যাঁদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁদের সবার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
হলমার্কের এই অর্থ লোপাটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে জানান শিবলী। উল্লেখ্য, দুদকের জিজ্ঞাসাবাদেই সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেছিলেন, তিনি মেহেরুন্নেসা মেরীর সঙ্গে দেখা করতে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় যাওয়া-আসা করতেন। লেখিকা মেরীর সঙ্গে উপদেষ্টার ‘ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে। তাই ধানমন্ডি শাখায় গিয়ে উপদেষ্টা মেরীকে দিয়ে তাঁর শিক্ষক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বির বিষয়ে একটি বই লেখানোর কাজ করছেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে উপদেষ্টা দুদকের তদন্ত দলকে জানান। তবে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, মেহেরুন্নেসা মেরী হলমার্কের পক্ষে বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ভুয়া ব্যক্তির নামে জাল চলতি হিসাব খোলা ও অনুমোদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আ ন ম মাশরুরুল হুদা সিরাজীকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করায় দুদকের এ মামলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারাই একে উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে করছেন। কেননা, হলমার্কের ঋণ বিষয়ে নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার অপরাধে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আ ন ম মাশরুরুল হুদা সিরাজীকে বারবার বদলি করেন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে তিনি নিরীক্ষার উদ্যোগ নিলেও তা করতে দেয়নি ব্যাংকটির এমডি ও ডিএমডি। সেই নিরীক্ষা অবশেষে করা হয় এপ্রিলে। অথচ এ মাসে হলমার্ক গ্রুপ জালিয়াতি করে নিয়েছে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। দায়দায়িত্ব নির্ধারণে বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে করা বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও এ কথা উল্লেখ আছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও মাশরুরুল হুদা সিরাজীকে দায়ী করা হয়নি। অথচ তাঁকেও মামলার আসামি করা হয়েছে।
আর দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আ ন ম মাসরুরুল হুদা সিরাজী সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি হলমার্কের ঋণের বিষয়ে একটি বিভাগীয় নিরীক্ষা শুরু করেন। তাতেই তাঁর ওপর বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসা শুরু করে। তাঁকে এ পর্যন্ত কুমিল্লা, সিলেট ও রংপুরে বদলি করা হয়। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের রংপুর শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অনুসন্ধান দলের প্রধান শিবলী বলেন, তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন বিভাগের (আইটিএফডি) দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল চলতি বছরের এপ্রিলের ২ তারিখের আগেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু সিরাজী তা না করায় তাঁকেও এ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই প্রমাণ মিলেছে।
যাঁরা আসামি: ব্যাংক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ কেলেঙ্কারির ঘটনার প্রথম পর্যায়ে যাঁদের আসামি করা হয়েছে তাঁরা হলেন: হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তানভীর মাহমুদ, তানভীরের স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (কমার্শিয়াল) তুষার আহমেদ, হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের স্বত্বাধিকারী মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. জিয়াউর রহমান ও অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলামকে।
সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন: শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও উপমহাব্যবস্থাপক (সাময়িক বরখাস্ত) এ কে এম আজিজুর রহমান, সাবেক সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসান (সাময়িক বরখাস্ত), নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন (সাময়িক বরখাস্ত), অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও সোনালী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরী। হলমার্কের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎকালে মেরী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় কাজ করতেন।
সাবেক এমডি হুমায়ুন কবিরসহ সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, জিএম অফিস ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন বিভাগের মোট ১৫ জন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তারা হলেন: ডিএমডি মাইনুল হক (বর্তমানে ওএসডি) ও আতিকুর রহমান (ওএসডি), মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আ ন ম মাশরুরুল হুদা সিরাজী, ননী গোপাল নাথ (ওএসডি) ও মীর মহিদুর রহমান (ওএসডি), সাবেক জিএম সবিতা সিরাজ, ডিজিএম ভগবতী মজুমদার (সাময়িক বরখাস্ত), শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত) মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত), কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত), আশরাফ আলী পাটোয়ারী (সাময়িক বরখাস্ত), মো. আবুল হাসান ও মো. খুরশিদ আলম।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, জিএম অফিসের মহাব্যবস্থাপক মীর মহিদুর রহমান ও ননী গোপালনাথের দায়িত্ব ছিল প্রতি মাসে শেরাটন হোটেল শাখা পরিদর্শন করা। কিন্তু তাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হলমার্কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধভাবে তৈরি করা অভ্যন্তরীণ বিল কেনাবেচাসংক্রান্ত ইনল্যান্ড বিল পারচেজের (আইবিপি) বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। তা ছাড়া শাখা থেকে নিয়মিতভাবে শাখার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্যসহ আমানত ও ঋণ প্রদানের সার্বিক বিষয় জানিয়ে বিবরণী দেওয়া হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত এজিএম আশরাফ আলী পাটোয়ারী, ডিজিএম সবিতা সিরাজ, জিএম মীর মহিদুর রহমান ও জিএম ননী গোপালনাথ বিভিন্ন শাখার অবৈধ কাজের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থ আত্মসাতে সাহায্য করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শেরাটন হোটেল শাখার ডিজিএম এ কে এম আজিজুর রহমানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা শাখার অবৈধ কাজের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত কোনো ব্যবস্থা নেননি। রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য খাতে অবৈধ উপায়ে ঋণ প্রদান ও ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি করা সত্ত্বেও প্রধান কার্যালয়ের নিরীক্ষা ও পরিদর্শন-২-এর শাখা পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন খান শেরাটন হোটেল শাখার কার্যক্রমকে খুব সন্তোষজনক বলে প্রশংসা প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই শাখাকে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ শাখা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলে পরবর্তী সময়ে নিরীক্ষা কাজেও দেরি হয়।







Kausar
২০১২.১০.০৫ ০৩:০৫
২০১২.১০.০৫ ০৬:২৬Raju(Jhalakathi,Barisal)
২০১২.১০.০৫ ০৭:১৪Uzzal Engineer
২০১২.১০.০৫ ০৯:৫৪Rabbani Chowdhury
২০১২.১০.০৫ ১০:১০
২০১২.১০.০৫ ১০:৪৩Alimul islam
২০১২.১০.০৫ ১০:৪৬zahid
২০১২.১০.০৫ ১১:১৭zahid
২০১২.১০.০৫ ১১:২০zahid
২০১২.১০.০৫ ১১:২৬ABDUL MAJID QUAZI
২০১২.১০.০৫ ১২:২৬mainul h siraji
২০১২.১০.০৫ ১২:৪২কিন্তু আজ সবকিছু ঝাপসা লাগছে। জিএম সিরাজীকে ১১টি মামলার প্রত্যেকটিতে আসামী করেছে দুদক। আজ আমাদের পরিবার আক্ষরিক অর্থেই ডুবে যেতে বসেছে। আমাদের করা গর্বগুলো উলটো ছোবল মারছে আমাদের।
এ দেশে নীতি দেখালে কী পরিণতি হয়--চোখ মেলে অসহায়ের মতো দেখছি আমরা।
না, আর নীতি-নৈতিকতাকে উৎসাহিত করব না। দুর্নীতির গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়াই নিরাপদ।
জিএম সিরাজীকে নিয়ে এতদিন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি বলে ক্ষমা চাচ্ছি। ও হ্যাঁ, এই দেশ আমার দেশ নয়। আমাকে ক্ষমা করবেন।
Forhad
২০১২.১০.০৫ ১৩:২০Russell
২০১২.১০.০৫ ১৩:৪০Shampa aich
২০১২.১০.০৫ ১৩:৪১abulkalamazad
২০১২.১০.০৫ ১৬:২৯