১৪৪ ধারা প্রত্যাহার আজ শান্তি শোভাযাত্রা
রাঙামাটি অশান্ত কার ইন্ধনে?
গত শনিবারের সংঘর্ষের পর থেকে রাঙামাটিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে গতকালও শহরে ছিল সেনাবাহিনীর সতর্ক প্রহরা। ছবিটি কলেজ গেট এলাকা থেকে তোলা
রাশেদ মাহমুদ
রাঙামাটি সরকারি কলেজে দুই ছাত্রের মধ্যে সামান্য হাতাহাতির পর মুহূর্তেই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রশাসনও হতভম্ব হয়ে পড়ে। তবে এটা যে পরিকল্পিত এবং এর পেছনে যে কোনো শক্তিশালী মহলের ইন্ধন আছে, সেটা সবাই বলছে।
রাঙামাটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ-উল-হাসান বললেন, একটি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতে পারে, তা তাঁরা আন্দাজ করতে পারেননি। শনিবারের ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দুই ছাত্রের মারামারি দেখতে না দেখতেই চোখের নিমেষে ছড়িয়ে পড়ল শহরে। শুরু হলো ভয়াবহ দাঙ্গা। যেদিকে যাই, হাজার হাজার লোক। একদিকে পাহাড়ি, আরেক দিকে বাঙালি। আমরা চেষ্টা করছিলাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।’
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি ঘটনা। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ঘণ্টার মধ্যে পুরো শহরে দাঙ্গা বাধানো হয়েছে। আগে থেকে পরিকল্পনা না করলে এত বড় ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়।
যেন কারফিউ: গতকাল শহরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বন্ধ দোকানপাট। অস্ত্র হাতে পাহারা বসিয়েছে সেনাবাহিনী। দু-একজন মানুষ চলছে হেঁটে। বোঝা যাচ্ছে, খুব দরকারে তাঁরা বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। শহরের রাস্তায় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান একটু পরপর ছুটে যাচ্ছে। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি, যেন কারফিউ চলছে। গতকাল সোমবার দুপুরের দৃশ্য এটি।
গত শনিবার পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষের পর একেবারেই পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে এই পর্যটন শহর। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। শহরের মানুষ, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা—সবাই বলছেন, বাঙালি-পাহাড়ি সবাই আছেন আস্থাহীনতায়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
রাঙামাটি শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা বনরূপা। কাল বেলা আড়াইটার দিকে দেখা গেল, সেখানকার একটি-দুটি ছাড়া সব দোকানই বন্ধ। বনরূপা বাজারে প্রতিদিনই দূর পাহাড়ের মানুষ তরিতরকারি নিয়ে আসেন। তিন দিন ধরে বাজার একেবারেই ফাঁকা। মানুষের কোনো কোলাহল সেখানে নেই। ওই বাজারের একটু আগে শেভরন অ্যান্ড ডক্টরস ল্যাব নামের একটি ক্লিনিক। শনিবারের তাণ্ডবের চিহ্ন রয়েছে সেখানে। সামনের সব কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ। আরেকটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে ওয়ান ব্যাংকের একটি শাখা। ভাঙচুর হয় সেটিও। বিজন সরণি এলাকায় ভাঙচুর করা হয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কার্যালয়। শহরের প্রবেশমুখ থেকে বনরূপা বাজার পর্যন্ত সর্বত্র তাণ্ডবের দৃশ্য। সড়কের এখানে-সেখানে রয়েছে টায়ার পোড়ানোর চিহ্ন।
১৪৪ ধারা প্রত্যাহার: তবে পরিস্থিতি শান্ত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গতকালও দফায় দফায় সভা হয়েছে। শহরের অবস্থা স্বাভাবিক করতে আজ সকালে শান্তি মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। দুই দিন ধরে শহরে ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকার পর গত রাতে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ১৪৪ ধারা তুলে নেওয়া হলেও শহরের পরিস্থিতি থমথমে।
কী ঘটেছিল সেদিন: রাঙামাটি সরকারি কলেজে গত শনিবার সকাল ১০টায় দুই পাহাড়ি ও বাঙালি ছাত্রের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উভয় পক্ষের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় কিছু বহিরাগতও কলেজে ঢুকে সংঘর্ষে অংশ নেয়। পরবর্তী এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে পুরো শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় উভয় পক্ষ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বেলা দুইটা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলতে থাকে। এ সময় ব্যাংক, বেসরকারি হাসপাতাল, দোকান ও গাড়িতে হামলা এবং ভাঙচুর চালানো হয়। রোববার রাতে পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
কলেজের মারামারিতে কী করে দাঙ্গার সৃষ্টি হয়? প্রশ্ন করতেই পুলিশ সুপার বললেন, মসে প্রশ্ন আমাদেরও। আমরা কিছু লোককে শনাক্ত করেছি, যারা এ ঘটনায় ইন্ধন দিয়েছিল। হয়তো ঘটনা পরিকল্পিত ছিল না। কিন্তু ইন্ধনদাতারা সুযোগ খুঁজছিল। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। কয়েকজনকে চিহ্নিতও করা হয়েছে।’ এসব লোকের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না, এরা পাহাড়ি না বাঙালি—প্রশ্ন করলে এসপি বলেন, তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সেটা বলা যাবে না।
অসন্তোষের বিস্ফোরণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর কামাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল। শনিবার তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে। তিনি বলেন, জনসংহতি সমিতির দুই অংশ এবং ইউপিডিএফের কিছু সদস্য মাছ ধরার জেলেসহ বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করে আসছিল। এতে বাঙালিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি দুই পক্ষেই কিছু দুষ্ট লোক আছে। এরাই এ ঘটনার সুযোগ নিয়েছে।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, একটা গুজবকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও এ রকম গুজব অশান্তির কারণ হয়েছে। তবে ঘটনা যা-ই হোক, পাহাড়ি-বাঙালি সবাই শান্তিতে বসবাস করুক—সেটাই সবার প্রত্যাশা।
চিকিৎসকদের কর্মবিরতি: গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দেখা গেল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নেতাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করছিলেন। জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতেই জেলা বিএমএর সভাপতি উদয় শংকর দেওয়ান জানালেন, শনিবারের ঘটনার সময় রাঙামাটি সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুশোভন দেওয়ান আহত হয়েছেন। এর প্রতিবাদে তাঁরা দুই দিন কর্মবিরতি পালন করেছেন। আজ মঙ্গলবার থেকে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি চালাবেন। সভার ভেতরেই একজন চিকিৎসক জেলা প্রশাসককে বলেন, ‘আমরা চাকরি করতে পারছি না, আস্থাহীনতায় ভুগছি। আমাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’ জেলা প্রশাসক তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘আপনারা চাইলে হাসপাতালের সামনে একটি স্থায়ী পুলিশ চৌকি বসানো হবে।’
শনিবারের ঘটনায় কোনো মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বলেন, এ ঘটনায় যিনি আহত হয়েছেন, সেই চিকিৎসকের পরিবার এখনো মামলা করতে এগিয়ে আসেনি। ঘটনার পর যে কয়জন পাহাড়ি ও বাঙালি যুবককে আটক করা হয়েছিল, দুই পক্ষের নেতারা এসে তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জিডি করা হয়েছে।
পর্যটক নেই, হোটেল ফাঁকা: শনিবারের দাঙ্গার পর রাঙামাটি সরকারি কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে সেখানে পুলিশ পাহারা দেখা গেছে। শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে। পর্যটনের শহরে এখন আর কোনো পর্যটক নেই। শহরের সব হোটেল ফাঁকা। রেস্তোরাঁগুলো খাঁ খাঁ করছে।
রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের অভ্যর্থনাকারী মো. মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, মাত্র একটি পরিবার তিন দিন ধরে আটকে আছে। এ ছাড়া আর কোনো অতিথি নেই। রাঙামাটির অন্যতম বড় আবাসিক হোটেল সুফিয়া ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক জানালেন, তাঁর হোটেলের ৬২টি কক্ষের মধ্যে পাঁচটি ছাড়া সবই খালি। গতকালও সরকারি অফিস-আদালতে কাজ হয়নি। তবে পুলিশ পাহারায় দু-একটি প্রতিষ্ঠান খোলা দেখা গেছে।
আজ শান্তি শোভাযাত্রা: জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, আজ সকাল নয়টায় রাঙামাটি পৌরসভা চত্বর থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। শোভাযাত্রায় পাহাড়ি নেতা, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজনকে জড়ো করার আয়োজন চলছে। জেলা প্রশাসকসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা শোভাযাত্রা সফল করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নেতাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এ শোভাযাত্রার মাধ্যমে সংহিত দেখানোর চেষ্টা করা হবে। এতে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে।







Md. Farid
২০১২.০৯.২৫ ১০:০৫২। রহিঙ্গা ইসু তে ফিল্ড গরম করার চেষ্টা করা হয়েছে
৩। হরতাল এর চেষ্টা করা হল
৩। এখন পাহাডি বাঙ্গালী দাঙ্গা লাগান হচ্ছে
দেশ অস্থিতিশিল থাকলে একটি মহল লাভবান হয়।এই মহল কারা সবাই জানে
ZAHIDUL AMIN
২০১২.০৯.২৫ ১২:৩২kap
২০১২.০৯.২৫ ১৯:০৪Md.Sulauman
২০১২.০৯.২৫ ২০:১১