ঝুলে আছে জাল টাকার পাঁচ হাজার মামলা
ঢাকাসহ সারা দেশে জাল টাকা-সংক্রান্ত পাঁচ হাজার ২১৯টি মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। সাক্ষীর অভাবে এসব মামলার বিচার শেষ করা যাচ্ছে না। এই সুযোগে আইনের ফাঁক গলে আসামিরা জামিনে ছাড়া পাচ্ছে। ফিরে যাচ্ছে পুরোনো পেশায়।
সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি, এ-সংক্রান্ত বেশির ভাগ মামলায় সাক্ষীর অভাবে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। অনেক মামলায় আসামিদের স্থায়ী ঠিকানা থাকে না। মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে এটাও একটা বড় সমস্যা।
পুলিশ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মুদ্রা জাল করার ঘটনায় ৯৫টি মামলা হয়েছে। বিভিন্ন সময় করা মামলার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫৩টি ও ২০১১ সালে ৭৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সারা দেশে এখনো পাঁচ হাজার ১২৯টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোতে মোট কতজনের সাজা হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা পুলিশের কাছে নেই।
রাজধানীতে জাল টাকা উদ্ধারের বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত-তদারক কর্মকর্তা হলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার মশিউর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জাল টাকা মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সময়ক্ষেপণ ও নানাভাবে অসহযোগিতা করায় সাক্ষীরা পরে আর সাক্ষ্য দিতে রাজি হন না। এতে মামলার বিচারকাজ দীর্ঘায়িত হয়। অনেক আসামি খালাস পেয়ে আবার জাল টাকা তৈরি বা বাজারজাতে জড়িয়ে পড়ে।
ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মুদ্রা জালিয়াতকারী সাতটি চক্রের প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনটি চক্রের প্রধান আলাউদ্দিন, ছগির মাস্টার ও হুমায়ুন কবির সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁরা আবার পুরোনো পেশায় ফিরে গেছেন বলে ডিবির কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁদের ধরার চেষ্টা চলছে।
আদালত সূত্র জানায়, পুলিশ গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকায় ৪০ হাজার টাকা মূল্যের জাল টাকাসহ ইকবাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। এর তিন সপ্তাহের মাথায় (১৯ ডিসেম্বর) তিনি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পেয়ে মুক্তি পান। পরে পুলিশ তদন্ত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(ক) ধারায় ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। কিন্তু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো সাক্ষী হাজির করতে না পারায় মামলাটি ঝুলে আছে।
২০০৬ সালের জাল মুদ্রা তৈরি করার সরঞ্জামসহ মোহাম্মদপুরে র্যাবের হাতে ধরা পড়েন হুমায়ুন কবির। র্যাব জানায়, হুমায়ুন একটি মুদ্রা জালিয়াত চক্রের প্রধান। তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়ার পর তিনি আর বিচারিক আদালতে হাজির হননি। এরপর গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর পল্লবী থেকে জাল মুদ্রা ও মুদ্রা তৈরির সরঞ্জামসহ এই ব্যক্তি আবার ধরা পড়েন। এবং এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হুমায়ুন কবিরসহ চারজনের বিরুদ্ধে গত ৭ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। কিন্তু এই মামলায়ও হুমায়ুন কবির জামিনে মুক্তি পেয়ে আর আদালতে হাজির হননি। সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি। মামলা দুটির বিচারও ঝুলে আছে।
গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর পল্লবী থেকে জাল টাকাসহ সুরমা ও আরিফা নামের দুই নারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মহানগর হাকিম আদালতে বিচারাধীন এ মামলায়ও রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগরের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, জাল টাকা-সংক্রান্ত মামলায় সাধারণত যাঁদের সাক্ষী করা হয়, তাঁদের বেশির ভাগই ভাসমান। অভিযোগপত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাক্ষীদের স্থায়ী ঠিকানা থাকে না। ফলে তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েও সাক্ষীরা আদালতে আসেন না। তিনি বলেন, এসব কারণে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিরা খালাসও পেয়ে যায়।
এদিকে জাল টাকা তৈরি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু প্রস্তাব সুপারিশ আকারে পাঠানো হয়। তাতে জাল টাকা তৈরির সরঞ্জাম বা বড় চালানসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলাকে ‘জামিন অযোগ্য’ হিসেবে বিবেচনা করার ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার বিচার এবং জাল টাকা তৈরি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মজিবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রচলিত আইনে এসব অপরাধীকে চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা বেশ কঠিন। বিষয়টি মাথায় রেখে জাল টাকার কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে গত বছরের নভেম্বরে আইন মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য এর আগে দুই দফায় তাগাদাও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই।







Russell
২০১২.০৯.১২ ০৮:০৫kishore
২০১২.০৯.১২ ১০:৫৪monir
২০১২.০৯.১২ ১১:১১ABDUL MAJID QUAZI
২০১২.০৯.১২ ১২:৩৪