‘এতবার কাছে গিয়েও ফিরে এসেছি যে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল, সত্যিই আমি পেরেছি!’

মারের হাতে স্বপ্নের ট্রফি

| তারিখ: ১২-০৯-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • স্বপ্নের গ্র্যান্ড স্লাম ট্রফি হাতে মারে। পরে দীর্ঘদিনের বান্ধবী কিম সিয়ার্সের সঙ্গে ভাগ করে ন

    স্বপ্নের গ্র্যান্ড স্লাম ট্রফি হাতে মারে। পরে দীর্ঘদিনের বান্ধবী কিম সিয়ার্সের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন ট্রফি জয়ের আনন্দ

    এএফপি

সাল ১৯৩৬। ভার্সাই চুক্তি ভঙ্গ করে রাইনল্যান্ড পুনর্দখল করল নাৎসি বাহিনী। ইতালি দখল করে নিল ইথিওপিয়া, স্পেনে শুরু হলো গৃহযুদ্ধ, ভূমিধস বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত হলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, অ্যাডলফ হিটলার ও নাৎসিদের মনে জ্বালা ধরিয়ে বার্লিন অলিম্পিক মাতালেন জেসি ওয়েন্স। আর উইম্বলডনের পর বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্লাম ইউএস ওপেনও (তখন নাম ছিল ইউএস ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ) জিতে নিলেন ফ্রেড পেরি।
সেই ছিল শেষ। পেরির অবসরের সঙ্গে বিদায় নিয়েছিল যেন ব্রিটিশদের গ্র্যান্ড স্লাম ভাগ্যও। পেরির পর ৭৬ বছর গ্র্যান্ড স্লাম ট্রফিতে হাত ছোঁয়াতে পারেননি আর কোনো ব্রিটিশ। অবশেষে দীর্ঘ সেই প্রতীক্ষার অবসান। আধুনিক টেনিসের জনকেরা অবশেষে পেয়েছে এক আধুনিক চ্যাম্পিয়ন। নোভাক জোকোভিচকে হারিয়ে ইউএস ওপেন জিতেছেন অ্যান্ডি মারে। গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন একজন ব্রিটিশ!
শুধু ব্রিটিশদেরই বা কেন, যন্ত্রণাময় প্রতীক্ষার অবসান হলো মারের নিজেরও। ব্রিটিশদের প্রতীক্ষার আগুন কয়েক বছর থেকে সবচেয়ে বেশি পুড়িয়েছে তো মারেকেই! লাজুক, অন্তর্মুখী চরিত্রের এই স্কটিশই যে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন গোটা জাতির প্রত্যাশার চাপ! চার-চারটি গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে হারায় লেগে গিয়েছিল ‘চোকার’ ছাপও। কোর্টের প্রবল প্রতিপক্ষ তো ছিলই, প্রতিপক্ষ ছিল ওই অনন্ত চাপ আর তীরে এসে তরী ডুবানোর ইতিহাসও। কিন্তু গত পরশু গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের প্রবল আকাঙ্ক্ষার তোড়ে ভেসে গেল সব চাপ। ২০১০ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে হারের পর কেঁদেছিলেন মারে, গত উইম্বলডনের ফাইনালে হারের পর আবেগ বাধনহারা হয়েছিল আবার। কোর্টে মারে আর গ্যালারিতে তাঁর মা জুডি ও বান্ধবী কিম সিয়ার্সের কান্না কাঁদিয়েছিল অনেককেই। পরশুও কাঁদলেন মারে, তবে এবার অশ্রু আনন্দের, বিজয়ের।
আনন্দের চেয়েও বেশি ছিল আসলে স্বস্তি। উদ্যাপনটাও তাই যেন বাধনহারা হলো না। প্রত্যাশা পূরণ আর ‘চোকার’ ছাপ মুছতে পারার স্বস্তি উঠে এল তাঁর কণ্ঠেও, ‘এই মুহূর্তের অনুভূতিটা বোঝাতে সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ হচ্ছে ‘‘স্বস্তি।’’ আজ ম্যাচ পয়েন্টের জন্য সার্ভ করার সময় মনে হচ্ছিল, ব্রিটিশ টেনিসের জন্য মুহূর্তটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটা কিছু হতে যাচ্ছে, যা অনেক অনেক দিন হয়নি। অবশ্য এই অর্জনে আমি গর্বিত। আর হ্যাঁ, ওই ফালতু প্রশ্নটাও আর শুনতে হবে না।’
পরশু যেভাবে জিতলেন, ‘চোকার’ ছাপ মুছে দেবে সেটাও। প্রথম দুই সেটে লড়াই হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি। প্রথম সেট গড়ায় টাইব্রেকারে, টুর্নামেন্ট রেকর্ড ২৪ মিনিটের টাইব্রেকার একপর্যায়ে দেখেছে ৩০ শটের র‌্যালি! ৮৭ মিনিটের সেট শেষ পর্যন্ত জিতে নেন মারে। পরের সেটে মারে ৪-০ তে এগিয়ে গেলেও ৫-৫ করে ফেলেন জোকোভিচ। জেতেন অবশ্য মারেই। পরের দুই সেট আবার সহজে জিতে নেন জোকোভিচ। আরেকবার ‘এত কাছে তবু কত দূরের’ গল্প লিখতে তখন প্রস্তুত হচ্ছিলেন অনেকেই। কিন্তু শেষ সেটে জ্বলে উঠেন মারে। ইউএস ওপেন দেখল দ্বিতীয় দীর্ঘতম ফাইনাল (চার ঘণ্টা ৫৪ মিনিট), ধ্রুপদি এক লড়াই জিতে (৭-৬ (১২/১০), ৭-৫, ২-৬, ৩-৬, ৬-২) স্বপ্ন পূরণ হলো মারের।
অলিম্পিক জয় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল, অতীত অভিজ্ঞতা তবু সংশয় জাগিয়েছিল মারের মনে, ‘অলিম্পিক সোনাটা অবশ্যই ছিল বড় এক অর্জন। আজ তবু লকার রুমে বসে সংশয় জাগছিল নিজেকে নিয়ে। মনে হচ্ছিল, এবারও হারলে পাঁচটি ফাইনালে হার হবে। আমি চাইনি ওই অভিজ্ঞতার স্বাদ পাওয়া প্রথম ব্যক্তি হতে। জয়ের পর তাই আবেগ ছুঁয়ে গিয়েছিল আমাকে। কোর্টে খানিকটা চোখের পানিও ফেলেছি। হতাশায় নয়, অবিশ্বাস্য আনন্দে। এতবার কাছে গিয়েও ফিরে এসেছি যে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল, সত্যিই আমি পেরেছি!’
ফেদেরার-নাদাল-জোকোভিচের সঙ্গে মারেকে যোগ করে কিছু দিন ধরে বলা হচ্ছে ‘বিগ ফোর।’ তবে ওই ত্রয়ী মিলে জিতেছেন গত ৩০ গ্র্যান্ড স্লামের ২৯টিই, মারের ভাঁড়ার সেখানে ছিল শূন্য। এখন হয়তো সত্যিকার অর্থেই বলা যায় ‘বিগ ফোর’। জোকোভিচও দিয়েছেন সেই স্বীকৃতি। হারের হতাশা ভুলতে চাইছেন মারের হাতে ট্রফির অন্য তাৎপর্য দেখে, ‘যেকোনো হারই বাজে, বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আর যে কারও চেয়ে একটা গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য ওর। এতবার এত কাছে এসেছে, আমি খুশি যে ও শেষ পর্যন্ত জিতেছে।’ এএফপি, রয়টার্স।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন