উত্তরাঞ্চল

তিস্তা সড়কসেতু ঘিরে স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন

শান্ত নূরুননবী | তারিখ: ১২-০৯-২০১২

  • ১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
চালু হওয়ার অপেক্ষায় তিস্তা সড়কসেতু

চালু হওয়ার অপেক্ষায় তিস্তা সড়কসেতু

গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিস্তা সড়ক সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করতে এসে যোগাযোগ ও রেলপথমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সেতুটি এ বছরের জুলাইয়ের মধ্যে খুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবেই স্থানীয় জনগণ সংশয় প্রকাশ করেছিল। কারণ, ইতিপূর্বে তাঁর আগের যোগাযোগমন্ত্রীও একই রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবু লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় ৫০ লাখ মানুষসহ রংপুর অঞ্চলের সর্বস্তরের জনগণ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞ যে, অবশেষে ২০ সেপ্টেম্বর সেতুটি জনগণের জন্য খুলে দেওয়ার দিন চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সেতুটির দ্বার উন্মোচন করবেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে একবারের জন্য হলেও যিনি শতবর্ষী তিস্তা রেলসেতুর ওপর দিয়ে কোনো না কোনো যানবাহনে পার হয়েছেন, তিনিই মর্মে মর্মে জানেন যে কত বড় একটা ইতিবাচক পরিবর্তনের শুভ সূচনা হতে যাচ্ছে; বিশেষ করে রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের জীবনযাত্রায়। তিস্তা রেলসেতু পারাপারের অপেক্ষায় অপব্যয় হওয়া মূল্যবান কর্মঘণ্টা আর ভয়াবহ জীবনবিনাশী দুর্ঘটনাগুলো আর কয়েক দিন বাদে কেবলই স্মৃতি হয়ে যাবে। বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত-নেপাল-ভুটানে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে যে নতুন গতির সঞ্চার হতে যাচ্ছে, তা কেবল সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নকেই ত্বরান্বিত করবে না, গোটা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চাঙা করতেও ভূমিকা পালন করবে। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় যে দ্রুত পরিবর্তন দৃশ্যমান, তা থেকে এই অনুমান খুব সহজেই করা যায়। তদুপরি কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট স্থলবন্দর চালু করা এখন কেবল সিদ্ধান্তের ব্যাপার মাত্র। দুই দশক ধরেই ভূরুঙ্গামারী-নাগেশ্বরী তথা গোটা কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়নকামী মানুষ ঐতিহাসিক বঙ্গসোনাহাট স্থলবন্দর সচল করার ব্যাপারে আন্দোলন করে যাচ্ছে। কেননা, সোনাহাট স্থলবন্দর হতে পারে আসাম ও পূর্ব-ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও অন্যান্য যোগাযোগের স্বর্ণদুয়ার। এমনকি, চীন পর্যন্ত সংযোগ বিস্তৃত করার সুযোগ দিতে পারে এই বন্দর। তিস্তা সড়কসেতু উন্মুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে সেই দাবি পূরণের আশ্বাস অনুভব করা যাচ্ছে।
তিস্তা সড়কসেতু ঘিরে মঙ্গাপ্রবণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মনে যখন এত রঙিন স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছে, তখন এই আলোচিত সেতুর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের পাঞ্জরভাঙ্গা, নিজপাড়া, তালুক সাহাবাজসহ ১৫টি গ্রামের পাঁচ লক্ষাধিক অধিবাসী আতঙ্কবোধ করছে। তিস্তা সড়কসেতুর দক্ষিণ প্রান্তে যে গার্ডার নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতেই ভাঙন শুরু হয়ে গিয়েছিল মাস দেড়েক আগের প্রবল বর্ষণের সময়। বর্ষা-শরতে প্রমত্ত হয়ে ওঠা তিস্তায় যে খরস্রোত দেখা দেয়, তার পুরো আঘাতটাই এসে লাগে দক্ষিণ পাড়ে। ফলে ভাঙতে থাকে পাড়ের নরম মাটি। প্লাবিত হয় নদী-তীরবর্তী গ্রামের পর গ্রাম আর কৃষিজমি। অথচ তিস্তা সড়কসেতুর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের গার্ডার সেতু থেকে পূর্ব দিকে মাত্র ২০০ মিটার টানা হয়েছে। তার থেকেও প্রশ্নবোধক চিত্র হলো গার্ডারের পূর্ব প্রান্ত দক্ষিণ দিকে নদীর স্রোতের গতির অনুকূলে বাঁকা করে দেওয়া হয়েছে।
কাউনিয়া উপজেলার মানুষ জানালেন, সেতু নির্মাণ-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় থেকেই স্থানীয় মানুষ সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সাংসদ, রংপুর জেলা প্রশাসক—সবার কাছে অনুরোধ করেছেন, যেন তিস্তা সড়কসেতুর দক্ষিণ প্রান্তের গার্ডার সেতু থেকে পূর্ব দিকে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়। রংপুর বিভাগ হওয়ার পর বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও এ বিষয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর যখন একটি সরকারি প্রতিনিধিদল সেতু পরিদর্শনে আসে, তাদের কাছে শত শত নারী-পুরুষ আবেদন জানিয়েছেন, সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের গার্ডারের দৈর্ঘ্য যেন পূর্ব-দক্ষিণ দিকে বাড়ানো হয়। তাঁরা বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধির কাছে একটি লিখিত আবেদনপত্র আবারও পেশ করেছেন। পরে এ বিষয়ে ১৫টি গ্রামের প্রতিনিধিরা কাউনিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সেতু নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত একজন প্রকৌশলী বলেছিলেন, সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই তিনি তিস্তা নদীর গতিপথ দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করেছেন। এতে বোঝা যায়, গার্ডারের সীমা না বাড়ালে কেবল লাখ লাখ মানুষ-অধ্যুষিত গ্রামগুলোই নয়, সেতুরও হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের উত্তর প্রান্তে একটি শ্মশানঘাট নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও শ্মশানটি তৈরি করা যায়নি এই আশঙ্কায় যে তা এক বছরও টিকবে না। গত দুই বছরে তিস্তা সড়ক সেতুর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নদী সরে এসেছে ১০০ মিটারেরও বেশি। উল্লিখিত গ্রামগুলোর অনেক বাড়ির কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে বর্তমানের তিস্তা।
দৃশ্যমান ভাঙন ছাড়াই তিস্তা নদীর গতিপথ দক্ষিণে সরে আসার প্রবণতা সম্পন্ন। সম্প্রতি গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকন্দ ইউনিয়নে তিস্তা নদীর গতি পরিবর্তনের স্বরূপ চিহ্নিত করার জন্য রংপুরের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নর্থ বেঙ্গল ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষায় অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন নিরীক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিগত ৮০ বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিস্তা নদী প্রতিবছর গড়ে ২৭ মিটার দক্ষিণ দিকে সরে আসে। এই সমীক্ষার ফলাফল নদী-তীরবর্তী মানুষেরা না জানলেও তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, তিস্তা সড়কসেতুর দক্ষিণ প্রান্তের গার্ডার তিন কিলোমিটার পর্যন্ত পূর্ব দিকে বিস্তৃত করলেই কেবল ১৫টি গ্রাম রক্ষা পেতে পারে। নইলে তাদের সর্বস্ব হারাতে হবে তিস্তার গর্ভে। তা ছাড়া, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তিন কিলোমিটার গার্ডার বরাবর গড়ে উঠতে পারবে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র, যা হয়ে উঠতে পারে রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ২০ সেপ্টেম্বর তিস্তা সড়কসেতু উদ্বোধনের আগে বা পরে অন্তত পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের দিকে এক পলক কি তাকাবেন? তা হলেই হয়তো আপনি জনগণের আকুতির যৌক্তিকতা উপলব্ধি করবেন। নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশে বসতভিটা ও আবাদি জমি কমে যাওয়াসহ যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার তুলনায় তিন কিলোমিটার গার্ডার নির্মাণের খরচ খুব কি বেশি!
শান্ত নূরুননবী: উন্নয়নকর্মী।
shantonabi@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Jamil Ahmed

Jamil Ahmed

২০১২.০৯.১২ ১০:০৮
শান্ত আপনাকে অনেক ধননবাদ।