বরাদ্দ জমিতে গড়ে উঠেছে অবৈধ বস্তি, চলছে মাদকের ব্যবসা
আটকে আছে ফিজিওথেরাপি কলেজ নির্মাণ
মহাখালীতে ফিজিওথেরাপি কলেজের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তি
ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীর মহাখালীতে ফিজিওথেরাপি কলেজের জন্য বরাদ্দ জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ না হওয়ায় সাড়ে চার বছরেও কলেজ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এ সুযোগে সোয়া পাঁচ একর জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তিতে চলছে রমরমা মাদকের ব্যবসা। সরেজমিন ঘুরে ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই দিন ধরে ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করেছেন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মহাখালীতে ফিজিওথেরাপি কলেজের জন্য সোয়া পাঁচ একর জমি বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু কলেজ না হওয়ায় ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কার্যক্রমের বিঘ্ন ঘটছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ফিজিওথেরাপি শিক্ষার জন্য এখন পর্যন্ত দেশে সরকারি স্বতন্ত্র কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষার্থীদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ক্লাস করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয়। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) একটি শ্রেণীকক্ষে স্নাতক কোর্সের দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর কার্যক্রম চলছে।
জানতে চাওয়া হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ফিজিওথেরাপি কলেজের জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তিবাসীদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়। এ কারণে কলেজ ভবন নির্মাণকাজে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ভবন নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ আছে। এক সপ্তাহের মধ্যে জটিলতা দূর করে কলেজ ভবন নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে বলে তিনি জানান।
ফিজিওথেরাপির একাধিক শিক্ষানবিশ জানান, কলেজ ভবন নির্মাণের দাবিতে তাঁরা কয়েক বছরে রাজধানীতে চার দফায় ২৪ দিন আমরণ অনশন, ৪২ দিন অবস্থান ধর্মঘট, ৪০ দিন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল, অন্তত ২১ বার মানববন্ধন এবং আটবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাজা রক্ত বিসর্জনের পাশাপাশি আত্মাহুতির কর্মসূচিও দিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচলকসহ ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা বারবার সময় বেঁধে দিয়ে ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
শিক্ষানবিশ ফিজিওথেরাপিস্ট মনিরুজ্জামান খান ওরফে শাহেদ জানান, অনেক আন্দোলন কর্মসূচির পর তাঁরা কলেজ ভবনের জন্য ওই জমি বরাদ্দ পান। জমিতে তখন সীমানাপ্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু কলেজ আর গড়ে ওঠেনি।
গত শুক্রবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) স্কুলের পেছনের ফিজিওথেরাপি কলেজের জমিতে শত শত আধাপাকা টিনের ছাপরাঘর ও দোকান গড়ে তুলেছে অবৈধ দখলদারেরা। নিজেরা থাকার পাশাপাশি তারা এসব ঘর ও দোকানপাট ভাড়া দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও গোয়েন্দারা জানান, দিনের পর দিন এখানে বস্তির সংখ্যা বাড়ছে। সন্ধ্যার পর শুরু হয় মাদক বেচাকেনা। বস্তির আশপাশে বেশ কিছু ফেনসিডিলের বোতলের কর্ক পড়ে থাকতেও দেখা যায় সেখানে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান দাবি করেন, সন্ধ্যার পর বস্তি ও এর আশপাশে ফেরি করে গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিল বেচাকেনা হয়। এলাকা দিয়ে চলতে গেলে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে হয় পথচারীদের। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মাদকের টাকার জন্য স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল কিশোর তরুণেরা ছিনতাইয়ে যুক্ত হয়েছে।
মাদক ব্যবসার কথা স্বীকার করে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার খন্দকার লুৎফুর কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ওই বস্তিতে অভিযান চালানোর জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হারুন অর রশীদ জানান, শিক্ষকসংকটে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে আটকা পড়ে আছেন। এডহক ভিত্তিতে ফিজিওথেরাপি শিক্ষক নিয়োগের সরকারি ঘোষণা থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। একটিমাত্র শ্রেণীকক্ষে ক্লাস চলাকালে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষের বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোনো টয়লেটের ব্যবস্থা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শিক্ষকসংকটের কথা স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের কলেজ ভবন নির্মাণের দাবি ন্যায়সংগত। এ নিয়ে একাধিকবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।
বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি সোসাইটির সাবেক সভাপতি দলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অসংক্রামক ব্যাধি, বাতব্যথা, পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইসিস), ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) ও ক্যানসারে ভুগছেন। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা দুর্ঘটনাজনিত সমস্যায় অনেকেই পঙ্গু, বিকলাঙ্গ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীর শিকার। এদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেওয়া ছাড়া আরোগ্য হওয়ার অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। তিনি বলেন, স্নাতকধারী ফিজিওথেরাপিস্টদের নিয়োগের কথা উল্লেখ করে ১৯৮৫ সালে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল, সরকারের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রীধারীরাই কেবল ফিজিওথেরাপিস্ট পদ ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু সে অনুযায়ী স্নাতকধারী ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
দলিলুর রহমান জানান, ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ফিজিওথেরাপি ও অর্থোপেডিক স্নাতক কোর্স চালু হয়। সেই থেকে পঙ্গু হাসপাতালের ওই এক কক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। অর্থোপেডিক চিকিৎসা অনেক দূর এগিয়ে গেলেও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা এখনো অবহেলিত ও উপেক্ষিত।







Shamsul Arefin
২০১২.০৭.১৬ ০৯:৩৯এখন আমার কথা হল কলেজের জন্য নির্ধারিত একটি জায়গায় অবৈধভাবে বসবাসকারী কিছু বস্তিবাসীর হাইকোর্টে করা রিট আবেদনের কারণে কলেজ ভবন নির্মাণ কাজ বছরের পর বছর বন্ধ থাকাটা সম্ভব হয় কিভাবে? শুধুমাত্র দেশটির নাম বাংলাদেশ বলেই কি? আমাদের নীতিনির্ধারকদের নীতির কি এতই অধঃপতন হল যে, যে জমিতে গড়ে উঠত একটি কলেজভবন, হাজার হাজার ফিজিওথেরাপিস্ট সেখান থেকে বের হয়ে জাতির সেবা করত সেখানে কিনা চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা, জুয়ার আসর। এত কিছু সত্বেও স্বাস্থ অধিদপ্তর মুখ বুজে বসে আছে। প্রশাসনের টনক নড়বে কবে? এর দায়ভারইবা কারা নিবে? স্বাস্থমন্ত্রী এতবার ওয়াদা দিয়েও এখন পর্যন্ত কলেজ নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেননি। তাহলে উনি আর কবে পারবেন? বেঁধে দেয়া আগামী সাতদিনের মধ্যে কলেজের কাজ শুরু হবে কি? নাকি এইবারো আগের মত ফাঁকা গলায় শব্দের বিস্ফোরণ ঘটালেন। সদিচ্ছাটাই আসল। অবৈধ কিছু বস্তিবাসীর কাছে ব্যর্থ স্বাস্থমন্ত্রীর নিরব গর্জন। দেশের স্বাস্থ খাতের মত বিশাল একটি খাতের ত্রানকর্তা তিনি। ওনাকে যদি বস্তিবাসীর কাছে হার মানতে হয় তবে এ লজ্জা শুধু ওনার নয়, পুরো জাতির। ব্যর্থতার দায় হসেবে উনার কি উচিত নয় পদত্যাগ করা?