এমসি কলেজ
ছাত্রাবাস ধ্বংসের ছাইতে মুখ ঢাকুন
সিলেট এমসি (মুরারি চাঁদ) কলেজের শতবর্ষের পুরোনো ছাত্রাবাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের গুন্ডামির পর প্রথাগত রীতি অনুযায়ী, এহেন দুর্যোগ-পরবর্তী যা যা অবশ্যকরণীয়—অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা, থানায় কলেজ কর্তৃপক্ষের মামলা দায়ের, একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন ও পুলিশ তৎপরতার প্রমাণ হিসেবে কিছু ধরপাকড় করা হয়েছে। তবে খবরের কাগজে লেলিহান আগুনের পিণ্ড পাকানো লাল-হলুদ তাণ্ডবের ছবিটা মুছে যায়নি। কাগজের পাতা ছেড়ে দেশ-বিদেশে অসংখ্য মানুষের পাঁজর পুড়িয়ে জ্বলছে।
প্রথম আলোর সিলেট প্রতিনিধির প্রতিবেদনে জানা যায়, ৮ জুলাই বিকেলে ছাত্রাবাসের খেলার মাঠে ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের কর্মীদের বাগিবতণ্ডার একপর্যায়ে ছাত্রলীগের একজন কর্মীকে শিবিরের কর্মীরা মারধর করেন। এ খবর পেয়ে কলেজ ছাত্রলীগের দুটি বিবদমান পক্ষ ছাত্রাবাসে ঢোকে এবং বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভরত অবস্থায় এক পক্ষ ছাত্রাবাসের মোট পাঁচটি ব্লকের তিনটিতে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তিনটি ব্লকের ৪২টি কক্ষ পুড়ে ছাই।
কারা পোড়াল—এ প্রশ্নের জবাব যাঁদের খোঁজার, তাঁরা খুঁজবেন। আদৌ কতটা খুঁজবেন, খোঁজার প্রয়োজন মনে করবেন কি না, এটা তাঁদের বা তাঁদের নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রযন্ত্রের সিদ্ধান্তের বিষয়। মানুষ গুম হয়ে গেলে যে দেশে কোনো পাত্তাই আর মেলে না, দু-দুজন সংবাদকর্মী নিজেদের ঘরে খুন হয়ে পড়ে থাকলেও যাঁদের টনক নড়ে না, ১৬ বছরের নিরপরাধ দরিদ্র কিশোরের পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে শরীর থেকে পা-টাকে ছেঁটে ফেলার পরও যে রাষ্ট্রযন্ত্র জোঁকের মতো তার গোঁয়ার গোঁ ছাড়ে না, সে দেশে ১০০ বছরের বৃদ্ধ একটা ঐতিহাসিক স্থাপনা, তা যত নয়নাভিরাম ও স্মৃতিজাগানিয়াই হোক, পুড়ে ছাই হয়ে গেলে কারও সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটবে—এমন প্রত্যয় জাগে না। খবরের কাগজে পড়েছি, ঘটনায় ক্ষুব্ধ এমসি কলেজের প্রাক্তন ছাত্ররা, যাঁদের অনেকেই তাঁদের নিজ নিজ অঙ্গনে কীর্তিমান এবং দেশ-বিদেশে বরেণ্য, তাঁরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। আমাদের অর্থমন্ত্রী, যিনি নিজেও এ কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ জারি করেছেন বলে কাগজে দেখেছি, যাতে দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে পাকড়াও করা হয়। ঘটনাটা যেহেতু সরকারের অনুসারী ছাত্র নামধারীদের কারসাজি, সে জন্যই সম্ভবত তিনি দলনিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলেছেন। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারকে বিপদের সময় ঠেকা দেওয়া যেহেতু তাদের মহান দায়িত্ব, তাই প্রথম সুযোগেই তারা যে ডজনের বেশি ছাত্র নামধারীকে গরাদে ঢুকিয়ে ফেলেছে; তাদের কেউই সরকারি দলের অনুসারী অর্থাৎ অগ্নিসংযোগকারী নয়। অর্থমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি তাদের কিঞ্চিৎ মুশকিলে ফেলবে। তবে গরাদে ঢোকালেই তো আর দোষী সাব্যস্ত করা হয়ে যায় না। সে বিবেচনায় হয়তো তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ইতিমধ্যেই দু-চারজনকে আপসে বেঁধেছেঁদে ফেলে থাকবে। শোনা যায়, ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাসটি সাম্প্রতিক সময়ে শিবির বাহিনীর দুর্গে পরিণত হয়েছিল।
ছাত্রাবাস দখল, প্রভাব ফলানো, মাস্তানি—এসব বাহ্য। উপসর্গমাত্র। মূল কারণ, উত্তরটা যা আপনার-আমার মাথায় ধিকিধিকি জ্বলছে, সেটার তালাশ করা কঠিন কিছু নয়। এ এক প্রমত্ত ধ্বংসোন্মুখ সংস্কৃতির পরিবেশ, যা কোনো ধরনের স্থিতি, সৌন্দর্য, লালিত্য, শৃঙ্খলাকে কিছুতেই বরদাশত করে না। ভেঙে টুকরো টুকরো করে ছারখার করাই এর মোক্ষ। সমাজ, রাষ্ট্রের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এসব দুর্বৃত্তায়নের বিপক্ষে দাঁড় করানোর মতো শক্তিশালী তেমন নজিরও কোথাও নেই। সেই অর্থে ঘটনাটা আমাদের ব্যক্তিক ও সামষ্টিক জীবনযাপনের সীমাহীন উলঙ্গপনা ও ভাঙনেরই প্রজ্বলিত প্রকাশ। যেসব অর্বাচীন মূর্খ কাজটা করেছে, তাদের দূরতম কল্পনায় একবারও উঁকিঝুঁকি দেবে না, তারা কী করেছে? দেবে না—কারণ, যে উন্মূল জীবনচর্চায় তারা বেড়ে উঠছে, সেখান থেকে তাদের গ্রহণ করার মতো কিছুই নেই। তারা হিংসার প্রকাশ হিসেবে আগুনকেই দেখেছে, আগুন কী সংহার করছে, তা ভেবে দেখার শক্তি, সামর্থ্য, অনুভূতির কথা তাদের নিরেট মগজে অঙ্কুরিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি আশপাশে নেই!
যন্ত্রণার কথায় আসি। সিলেট এমসি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র আমি নই। ছাত্রাবাসটিতে কখনো ঢোকার সুযোগও হয়নি। তবে মনোলোভা অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পটভূমিতে অবস্থিত এ ছাত্রাবাসের সামনের চওড়া রাস্তা ধরে যতবারই যাওয়া-আসা করেছি, অপার মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়েছি। বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের বাংলা ও আসামে অঙ্গুলিমেয় দু-তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমসি কলেজ ছিল একটি। অত্যন্ত উঁচুমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া ছাড়াও এর অনন্যতা ছিল এর সৌন্দর্যে। বয়োজ্যেষ্ঠদের আবেগাপ্লুত হয়ে বলতে শুনেছি, আমাদের তাজমহল নেই, আছে মুরারি চাঁদ কলেজ। আমার মাতামহ ১৯২২ বা ২৩ সালে এ কলেজ থেকে বিএ পাস করেছিলেন এবং এ ছাত্রাবাসেই কলেজ-জীবন কাটিয়েছিলেন। আমার লন্ডনপ্রবাসী ছোট ভাই, যে এ ছাত্রাবাসে বছর দুয়েক কাটিয়েছিল, খবর শুনে ফোন করে কথা বলতে পারেনি। আমার ৮৫ বছর বয়সী বাবা, যিনি এ ছাত্রাবাসে কখনো থাকেননি, কাগজে ধ্বংসাবশেষ দেখে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থেকেছেন।
১৮৯২ সালে রাজা গিরিশচন্দ্র রায় তাঁর পিতামহ মুরারি চাঁদের নামে এমসি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে ১৯২০-২১ সালে কলেজ থেকে খানিকটা দূরে প্রায় ২০ কেদার (এক কেদার সমান ৩০ ডেসিমেল) জায়গাজুড়ে ব্রিটিশ যুগের আসাম ঘরানার স্থাপত্যরীতিতে ভারী ঢেউটিনে আচ্ছাদিত, পুরু পাকা দেয়াল, স্টিল ফ্রেমে কাচ বসানো লম্বাটে দরজা-জানালা ও ঢালাও বারান্দাশোভিত ছাত্রাবাস ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়। জানা যায়, বাংলা ১৩৩৬ সনের ২১ কার্তিক সিলেট সফরকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দর্শনীয় এ ছাত্রাবাসে দীর্ঘ সময় কাটান।
ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্রাবাসের সুপরিসর ৪২টি ভস্মীভূত কামরায় ছাই উড়ছে। প্রাক্তন অনেক ছাত্র নিজেদের নিঃসঙ্গতার ছবি চোখে দেখতে বুকে সাহস নিয়ে অকুস্থলে গিয়েছেন। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীকেও দেখা গেল, এককালে তাঁর নিজের কামরার ভস্মীভূত কক্ষের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা বুক চাপড়ে হাহাকার করেছেন মনে হয় না—রাগে-ক্ষোভে ফুঁসেছেন। এই রাগ-ক্ষোভের পরিণাম তাঁদের জানা নেই। তাঁরা কি কাউকে দুষবেন, না দুর্বৃত্তরা ধরা পড়েছে শুনে আশ্বস্ত হবেন? মনে হয়, কোনোটাই নয়। আগুনে ছাই হওয়া নিজেদের আত্মাকে নেড়েচেড়ে দেখে হয়তো ভাববেন, আমাদের এত জড় ঐশ্বর্য ছিল। আর কী আছে জ্বলে-পুড়ে খাক হওয়ার।
ওয়াসি আহমেদ: কথাসাহিত্যিক।







Mahmud Mamun
২০১২.০৭.১৬ ০৩:২৫Muhammad Shamsul Islam
২০১২.০৭.১৬ ০৫:৩৫Tanvir
২০১২.০৭.১৬ ০৬:৪৪Arifur Rahman
২০১২.০৭.১৬ ০৬:৫০nadimul karim
২০১২.০৭.১৬ ০৬:৫৭Tauhidun
২০১২.০৭.১৬ ০৭:০৪kishore
২০১২.০৭.১৬ ০৭:০৭Abul Kalam
২০১২.০৭.১৬ ০৭:২০সাহস সাংবাদিকদের সাহস কতটা নিচে নেমে গেছে?
মন্ত্রীরা সন্ত্রাসী লালন করবেন; লোক দেখানো মায়া-কান্না, মিথ্যা আস্ফালন করবেন-কারণ তারা তো সেই রকমই। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ঐ রকমই।
কিন্তু দু'একজন সাহসী সাংবাদিক কি এ জাতি পেতে পারে না?
এ জাতির আশার আলোগুলো ধীরে ধীরে আরো ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
Mahtaf Hossain
২০১২.০৭.১৬ ০৭:৫৪Shihab
২০১২.০৭.১৬ ০৮:২৩Selim Saroar
২০১২.০৭.১৬ ০৮:৪৯Mahadi Hasan
২০১২.০৭.১৬ ০৯:০৭Rupok Reza
২০১২.০৭.১৬ ০৯:১১amjad khan
২০১২.০৭.১৬ ০৯:৫০Syed Harun ur Rashid Towhid
২০১২.০৭.১৬ ১০:১২ABDUL MAJID QUAZI
২০১২.০৭.১৬ ১০:৩৭Taslimul Hoque
২০১২.০৭.১৬ ১০:৫২Nasim Hasan
২০১২.০৭.১৬ ১০:৫৭Ruksana Shirin
২০১২.০৭.১৬ ১১:১৭BIPLOB DAS
২০১২.০৭.১৬ ১১:২৪HASAN
২০১২.০৭.১৬ ১১:৩০
২০১২.০৭.১৬ ১১:৩০Nurul Islam Atik
২০১২.০৭.১৬ ১১:৪২তাই শুধু ধিক্কার জানাই........ এই ছাত্র নামের ..

২০১২.০৭.১৬ ১২:০৫
২০১২.০৭.১৬ ১২:০৬dalim ahmed
২০১২.০৭.১৬ ১২:৪৪এটা দেশের আপামর মানুষের মনের একান্ত ইচ্ছাই বলতে হয়।
কারণ যখন ছাত্র রাজনীতি দেশের কোন উপকারে আসছে না, ক্ষতি ছাড়া, তাহলে এটা দিয়ে আমাদের কি করার আছে?
Arif
২০১২.০৭.১৬ ১৩:১৩Shams
২০১২.০৭.১৬ ১৩:৫৬Russell
২০১২.০৭.১৬ ১৫:১৫Abul Kalam Azad
২০১২.০৭.১৬ ১৯:৩০Md. Moniruzzaman
২০১২.০৭.১৬ ২০:১৪নিজেদের দোষ ঢাকতে ছোটলোকের মত ঢোল বাজাবেন না। কীসের সাথে কী , পানতা ভাতে ঘী !!!!!!! ধন্যবাদ।