সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা এক ক্যাডারে, অন্যরা সহকারী কর্মচারী
প্রশাসনের ২৮ ক্যাডার পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব
সচিবালয়ের সব পদকে ক্যাডারের আওতা থেকে বের করাই হবে সংস্কারের প্রথম বিষয়
সচিবালয়ের সব কর্মকর্তাকে একটি ক্যাডারে এবং অন্যদের সহকারী কর্মচারী হিসেবে বিবেচনা করে প্রশাসনের ২৮টি ক্যাডার নতুন করে বিন্যাস করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ পদ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সবগুলো শ্রেণীকে বিলুপ্ত করা হবে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ক্যাডার পুনর্বিন্যাস-বিষয়ক এ ২২ দফা প্রস্তাব ও সুপারিশ জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। তবে দ্রুত মৌলিক সংস্কার করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ গ্রেড থেকে শুরু করে এক-তৃতীয়াংশ যাবে ক্যাডার পদে। এতে প্রথম দফায় পুলিশ ক্যাডারের সঙ্গে একই নীতিমালায় আয়কর, শুল্ক ও মূসক এবং নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগকে সংস্কার করার কথা বলা হয়েছে। তবে ক্যাডার সংস্কারের প্রথম বিষয়টি হবে সচিবালয়ের সব পদকে ক্যাডারের আওতা থেকে বের করা। প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এর একটি সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী ফল হবে ‘সচিবালয়ের নিযুক্তি রাজনৈতিক বিবেচনায় করে বাকি আমলাতন্ত্রকে দলীয় বিবেচনা থেকে মুক্তিদান’।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসনসচিব আবদুস সোবহান সিকদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবটি তাঁরা পেয়েছেন। ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সচিবালয় পুল: বর্তমানে সচিবালয়ে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণীতে বিন্যস্ত মোট পদাধিকারী প্রায় সাড়ে ১২ হাজার। প্রথম শ্রেণীর তিন হাজার ৫৬২টি পদের প্রায় সবাই বিভিন্ন ক্যাডারের। ক্যাডার-বহির্ভূত কর্মকর্তা মাত্র ২০ জন। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণীর দুই হাজার ১০১ জন, তৃতীয় শ্রেণীর তিন হাজার ২১১ এবং চতুর্থ শ্রেণীর তিন হাজার ৭৭ জন।
অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে বলেন, সচিবালয়ের এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ক্যাডার-বহির্ভূত বিবেচনা করা যথাযথ হবে। ক্যাডারের ছয় গ্রেডের কর্মকর্তারা সচিবালয়ে নিযুক্ত। এর মধ্যে রয়েছেন প্রথম গ্রেডের সচিব থেকে ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তা। প্রস্তাবে বলা হয়, চতুর্থ গ্রেড বা উপসচিব থেকে সচিবালয় পুল গঠন করার পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজিয়ে ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী সচিব থেকে শুরু করা যায়। নতুন এ পুলের সদস্যরা সবাই বিভিন্ন ক্যাডার থেকে আসবেন। কিন্তু একবার পুলে আসার পর তাঁরা সচিবালয়ের কর্মকর্তা হিসেবেই পদায়িত হবেন। অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
পুলিশ ক্যাডার: পুলিশ ক্যাডারের সংস্কার করে এ বাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করার সোপানটি বিস্তৃত হবে। বর্তমানে পুলিশ ক্যাডারে নয়টি গ্রেডে মোট কর্মকর্তা এক হাজার ৬০৮ জন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান পদবিন্যাস ‘একেবারেই অযৌক্তিক’ এবং মোটামুটিভাবে অস্থায়ী (অ্যাডহক) সিদ্ধান্তের ফলাফল। পুলিশ ক্যাডার সংস্কার করে দুই হাজার ৬৪৫টি পদ করা হবে। এর মধ্যে গ্রেড-১-এ মহাপরিদর্শকের পদ থাকবে তিনটি। এ ছাড়া গ্রেড-২-এ অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের ১২টি, গ্রেড-৩-এ উপ-মহাপরিদর্শকের ৩০টি, গ্রেড-৪-এ জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপারের ৫০টি, গ্রেড-৫-এ পুলিশ সুপারের ২৫০টি, গ্রেড-৬-এ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ৩০০টি, গ্রেড-৭-এ জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপারের ২০০টি, গ্রেড-৮-এ সহকারী পুলিশ সুপারের ৬০০টি এবং গ্রেড-৯-এ সহকারী পুলিশ সুপারের পদ থাকবে এক হাজার ২০০টি। অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রতিবেদনে বলেন, পুলিশ ক্যাডারের আয়তন বড় করা হলেও কেন্দ্রায়িত পুলিশ বাহিনীর বিকেন্দ্রীকরণ হবে। যেমন, শিল্প পুলিশ আলাদা বাহিনী হবে। বিশেষ বিভাগ ও স্বশাসিত বাহিনী থাকবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গতকাল স্বরাষ্ট্রসচিব সি কিউ কে মুশতাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাব নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আলোচনার পরই শুধু বলা যাবে, এর প্রতিফলন কী হবে।’
নিরীক্ষা ও হিসাব, শুল্ক ও মূসক এবং আয়কর: নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগে ক্যাডারভুক্ত পদ ৪৩০টি। ক্যাডার-বহির্ভূত প্রথম শ্রেণীর পদ এক হাজার নয়টি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীতে পদ যথাক্রমে এক হাজার ৭৬১ ও আট হাজার ৮২২। পুনর্বিন্যস্ত ক্যাডারে পদ হবে এক হাজার ৪৪০। হিসাব নিরীক্ষা ও হিসাব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আলাদা হলে সপ্তম গ্রেড পর্যন্ত এ দুই ধারার পদ থাকবে। শুধু ৮ ও ৯ গ্রেডে হিসাবরক্ষক পদ থাকবে। এর মধ্যে গ্রেড-১-এ জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত মহাহিসাব নিরীক্ষকের পদ হবে দুটি, গ্রেড-২-এ অতিরিক্ত মহাহিসাব নিরীক্ষক আটটি, গ্রেড-৩-এ জ্যেষ্ঠ উপ-মহাহিসাব নিরীক্ষক ৩০টি, গ্রেড-৪-এ উপ-মহাহিসাব নিরীক্ষক ১০০টি, প্রধান হিসাবরক্ষক ১৫০টি, গ্রেড-৬-এ জ্যেষ্ঠ উপপ্রধান হিসাবরক্ষক ২০০টি, গ্রেড-৭-এ উপপ্রধান হিসাবরক্ষক ২০০টি, গ্রেড-৮-এ জ্যেষ্ঠ সহকারী হিসাবরক্ষক ১৫০টি এবং সহকারী হিসাবরক্ষক ৬০০টি। এ ছাড়া শুল্ক ও মূসক ক্যাডারে ক্যাডার পদ ৫৩৯ এবং ক্যাডার-বহির্ভূত প্রথম শ্রেণীর পদ ৯৬৪টি।
ছয় গ্রেডের পদবিন্যাস: বর্তমানে সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্বে থাকা বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭০। অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, সে বিবেচনায় ১০ শতাংশ অতিরিক্ত পদের ব্যবস্থা রেখে এ ছয় গ্রেডে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম গ্রেডে সচিব ৮০টি, দ্বিতীয় গ্রেডে অতিরিক্ত সচিব ৭০টি, তৃতীয় গ্রেডে যুগ্ম সচিব ২১০টি, চতুর্থ গ্রেডে উপসচিব ৭০০টি, পঞ্চম গ্রেডে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ৩০০টি, ষষ্ঠ গ্রেডে সহকারী সচিব ৬০০টি, অর্থাৎ মোট এক হাজার ৮৮০টি পদে কর্মকর্তাদের বিন্যস্ত করা যেতে পারে। তবে গ্রেড-৬-এর সহকারী সচিব পদে এক-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তা আসবেন দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে পদোন্নতি পেয়ে। এর বাইরে সব কর্মকর্তার নিয়োগ হবে বিভিন্ন ক্যাডার থেকে।
তিনটি নির্দিষ্ট ক্যাডার: তিনটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের পুনর্বিন্যাসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পদবিন্যাসের প্রথম নীতি হবে প্রথম শ্রেণীর সব চাকরি ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা। নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের তাঁদের গ্রেডে আত্তীকরণ করতে হবে। গ্রেড-৯ থেকে ৩ পর্যন্ত পদোন্নতির জন্য ক্যাডারের আয়তনের ওপর বিভিন্ন গ্রেডের পদবিন্যাস হবে। কোনো কোনো গ্রেড সিলেকশন গ্রেডের বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত হবে। যেমন, সহকারী মূসক কমিশনাররা সহকারী ও জ্যেষ্ঠ সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে ৮ ও ৯ গ্রেডে, উপ-কর কমিশনার ও জ্যেষ্ঠ উপ-কর কমিশনার ৬ ও ৭ গ্রেডে, থানা অফিসার নবম ও অষ্টম গ্রেডে থাকতে পারবেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, উপ-মহাহিসাব নিরীক্ষকের জন্য জ্যেষ্ঠ একটি স্তর তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি ক্যাডারেই প্রথম, দ্বিতীয় গ্রেডের কিছু পদ থাকবে। এ পদ ৪ ও ৫ গ্রেডের পদের একটি আনুপাতিক হারে (যেমন ৫ শতাংশ) নির্ধারিত হবে। ৩ গ্রেডে পদসংখ্যা হবে স্তর হিসেবে যে পদ আছে সে অনুযায়ী। তবে ৪ ও ৫ গ্রেডে যত পদ আছে তার ন্যূনতম ১০ শতাংশ তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতির নীতি থাকবে। ক্যাডারের নিম্নতর স্তরে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে এক-তৃতীয়াংশ পদে পদোন্নতি হবে।
এ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবটি দেখেননি বলে কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন, ‘সরকারের শেষ সময়ে এসে এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ২৮টি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বেতন ২০ গ্রেডে বিন্যস্ত। এর মধ্যে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের সব পদে আছেন ৫৪ হাজার ৫৮৫ জন প্রথম শ্রেণীর ক্যাডার কর্মকর্তা। নিম্নতম নবম গ্রেডেই আছেন ৩১ হাজার ২৩৩ জন কর্মকর্তা। এ ছাড়া এই গ্রেডে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে পদোন্নতি বা নিযুক্তি পেয়েছেন ১০ হাজার ৫২৪ জন।







Aminul Huq
২০১২.০৭.০৫ ০৬:৪৭Abul Kalam
২০১২.০৭.০৫ ০৯:০৪হা হা হা....তারমানে সচিবালইয়ে আওয়ামী ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে আজীবন আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ হিসেবে রেখে দেয়া হবে?
Mokaddesur Rahman
২০১২.০৭.০৫ ১০:০০Nayan
২০১২.০৭.০৫ ১০:৩২Manirul Islam
২০১২.০৭.০৫ ১৬:১২S.M.Abdur Rahman
২০১২.০৭.০৫ ২২:২৮Shovon
২০১২.০৭.০৬ ১২:০৫