হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন
বিডিআর বিদ্রোহের বিচার স্থগিত ও র্যাব ভেঙে দেওয়ার দাবি
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় অভিযুক্ত জওয়ানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিউইয়র্কভিত্তিক এ মানবাধিকার সংগঠন অবিলম্বে এ ‘গণবিচার’ স্থগিত করতে এবং এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত জওয়ানদের জন্য নতুন করে বিচারের ব্যবস্থা করারও দাবি জানানো হয়েছে।
২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও অন্যায্য বিচারসম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে এ দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। গতকাল বুধবার ঢাকায় ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘ভয় আমার পিছু ছাড়ছে না’ (দ্য ফিয়ার নেভার লিভস মি) শীর্ষক ৫৭ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য বরাবরই অভিযুক্ত র্যাবের বিরুদ্ধে বিজিবি (সাবেক বিডিআর) জওয়ানদের ওপর ব্যাপক হারে নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশের অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুলিশের মধ্যে একটি ‘অসামরিক ইউনিট’ বা নতুন সংস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে।
এ প্রতিবেদন তৈরির সময় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৬০ জনের সাক্ষ্য নেয়, যাঁদের মধ্যে ছিলেন বিদ্রোহে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, মামলার বাদী ও বিবাদীপক্ষের আইনজীবী ও সাংবাদিক। এ ছাড়া বাংলাদেশের দুই মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অধিকার-এর সহায়তাও নেওয়া হয়েছে।
গতকাল ঢাকায় প্রতিবেদন প্রকাশকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহের যে বিচার চলছে, তাকে আমরা “গণবিচার” হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু আমাদের এই অবস্থান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন নয়। কারণ, ব্যক্তির অধিকার রাষ্ট্রের আইন নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দ্বারা স্বীকৃত। আর বিডিআর সদস্যদের বিচার যে আদালতে হচ্ছে, তা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। কাজেই এ বিচার-প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গেই হওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, কী প্রক্রিয়ায় বিচার হবে, সেটি ঠিক করা সরকারের কাজ। কাজেই সমস্যাটা সরকারের। আদালতকে এ জন্য দায়ী করা যায় না। তাই ইতিপূর্বে নিষ্পন্ন হওয়া এ-সংক্রান্ত সব মামলার রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরির সময় বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ‘প্রতিবেদন তৈরির আগেই আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবি ও র্যাবকে চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু বিজিবি ও র্যাব আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়নি। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের সঙ্গে দেখা করেছি। বিডিআর বিদ্রোহের বিচার-প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ শুনেই তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। তবে তিনি খোলামন নিয়ে আমাদের প্রতিবেদনটি পড়ার আশ্বাস দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ প্রতিক্রিয়া “অসংগতিপূর্ণ”, যা আমাদের হতাশ করেছে। তার পরও আশা করব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে যত্ন নিয়েই প্রতিবেদনটি পড়ে দেখবেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর বিদ্রোহের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো ছয় হাজারের বেশি জওয়ানকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, স্বীকারোক্তি আদায়ের সময় পদ্ধতিগতভাবে তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। হাজতে থাকার সময় ৪৭ জন মারা গেছেন।
নির্যাতনের বর্ণনা: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের গবেষক তেজশ্রী থাপার গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে ‘ভয় আমার পিছু ছাড়ছে না’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি। গবেষণার কাজে তেজশ্রী থাপা ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন। এ সময় তিনি নির্যাতিত ও নিহত বিজিবি সদস্যদের পরিবারের সদস্য ছাড়াও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন।
এসব সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে থাপা সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্যাতিত লোকজনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপক হারে নির্যাতনের কথা জেনেছি। কখনো র্যাব, কখনো সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, কখনো জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা আবার কখনো এসব সংস্থা মিলেই নির্যাতন চালিয়েছে।’
নির্যাতনের পর বিজিবির সদস্যরা শারীরিকভাবে নানা সমস্যায় ভুগেছেন বলে তেজ থাপার সঙ্গে আলাপচারিতায় লোকজন উল্লেখ করেছেন। এক জওয়ান তাঁর স্ত্রীকে জানিয়েছেন, তাঁকে উল্টোভাবে ঝুলিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। অত্যাচার সইতে না পেরে তিনি জ্ঞান হারান। অন্য এক জওয়ানের মা জানান, ব্যাপক নির্যাতনে তাঁর ছেলে নুইয়ে পড়েছে। আরেকজনের স্ত্রী জানিয়েছেন, নির্যাতনের কারণে তাঁর স্বামী অসংলগ্ন কথা বলছেন।
তছনছ হয়েছে অসংখ্য পরিবার: গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক মো. নুর খান বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের পর পরই অনেক জওয়ান তাঁদের পরিবারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন, এদের কেউ কেউ নিখোঁজ রয়েছেন। বিজিবি জওয়ানদের অনেকের পরিবার পিলখানায় অবস্থান করত। বিদ্রোহের পর এরা অনেকটা ভাসমান হয়ে গেছে। অনেকে গ্রামে চলে গেছে। অনেকের সন্তান পড়াশোনা থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। কারও সন্তান আবার পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।
ব্র্যাড অ্যাডামস বিডিআর বিদ্রোহ দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক অভিযান না চালানোর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। বলেন, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের অভিযান না চালানোটা যথেষ্ট যৌক্তিক ছিল। সেনা অভিযান না চালানোয় সেখানে অনেক জীবন বাঁচানো গেছে।
এ ঘটনা কীভাবে সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে—প্রশ্ন করা হলে ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ওই বিদ্রোহ কীভাবে ঘটেছে, তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন আঁচ করতে পারল না, সেটি একটি ব্যর্থতা বলে গণ্য হচ্ছে। কারণ, এমন জায়গায় সেটি ঘটেছিল যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর হতাহতের বিষয়টি ঘটায় এটি স্পষ্ট যে হামলার লক্ষ্যবস্তু তিনি ছিলেন না। তবে গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।
বিচারের নামে অবিচার: ন্যায়বিচার হচ্ছে কি না—জানতে চেয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে ব্র্যাড জানতে চান, ‘আমরা এখন যে কামরাটি (২০ বাই ২০ ফুট) বসে আছি, এখানে আরও পাঁচ গুণ লোক জড়ো করা হলো। এখানে বিচার হচ্ছে আর একজন আইনজীবী ১০ থেকে ৩০ জন অভিযুক্তের পক্ষে সওয়াল-জওয়াব করছেন। আর প্রত্যেকের সঙ্গে ওই আইনজীবী ১০ মিনিট করে কথা বলার সুযোগ পেলেন। এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে কি না আপনারাই বলুন! তিনি বলেন, সন্দেহভাজন প্রত্যেক জওয়ানের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে মামলার বিষয় তৈরি না করলে, তাঁদের আইনজীবীদের যথাযথ সময় ও কাগজপত্র না দিলে ন্যায়বিচার অসম্ভব। এ রকম গণবিচার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একেবারেই সুবিচার নিশ্চিত করতে পারে না কিংবা বিদ্রোহের সময় কারা ভয়ংকর অপরাধগুলোর জন্য দায়ী ছিলেন, তার সঠিক উত্তর দিতে পারে না।
যথাযথ বিচার জরুরি: ব্র্যাড অ্যাডামস মনে করেন, বিডিআর বিদ্রোহের সময় মোট ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের প্রাণহানি, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের বিচার হওয়াটা জরুরি। বিশেষ করে, এসব ঘটনায় প্রকৃত অর্থে কারা দায়ী ছিলেন, তাঁদের তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করে দোষীদের শাস্তি দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর এটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।







delowar hossain
২০১২.০৭.০৫ ০৩:১৭Abdullah Al-Mamun. রংপুর ।
২০১২.০৭.০৫ ০৩:৪৪Din Islam Mamun
২০১২.০৭.০৫ ০৫:১৮sabnoor
২০১২.০৭.০৫ ০৭:১০Md. Kamruddin Akbar
২০১২.০৭.০৫ ০৭:৫৭Muhammed Jamal Hossain
২০১২.০৭.০৫ ০৯:৫৭Md Nasir Uddin Khan
২০১২.০৭.০৫ ১১:২১shanto
২০১২.০৭.০৫ ১১:৪৯Md. Salauddin
২০১২.০৭.০৫ ১৪:২৫Mohammed Rezaul Karim
২০১২.০৭.০৫ ১৪:৫২Philip Das
২০১২.০৭.০৫ ২২:৩৮