বদলে যাও বদলে দাও মিছিল

ইভ টিজিং: আমাদের ভাবনার অসাড়তা

গালিব মেহেদী খান | তারিখ: ০৫-০৭-২০১২

  • ৫ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

‘বদলে যাও বদলে দাও মিছিল’ ব্লগে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও নির্বাচিত চারটি ইস্যু নিয়ে অব্যাহত আলোচনা হচ্ছে। আজ ইভ টিজিংমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার একটি বিশ্লেষণাত্মক অভিমতসহ আরও দুজন লেখকের নির্বাচিত মন্তব্য ছাপা হলো।

ইভ টিজিং সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে, সে ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। আমরা যদি এর সঠিক কারণ নির্ণয় না করে এলোমেলো চিকিৎসা দেওয়া শুরু করি, তাহলে এর প্রভাব কমবে না, বরং আরও বেশি সংক্রামিত হবে। হচ্ছেও তা-ই! কেউ কেউ বলেন, এর বিরুদ্ধে কঠিন আইন করা উচিত। আমি বলব, কোনো লাভ নেই। শুধু আইন করে যদি সমস্যার সমাধান হতো, তাহলে মানুষ মানুষকে খুন করত না। অনেকেই বলেন মেয়েদের পর্দার কথা। আমি তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করেই বলব, লাভ নেই। কারণ, সব নারী যদি কাল থেকে দরজায় খিল এঁটেও বসে থাকেন, তবু দুর্বৃত্তরা নিবৃত্ত হবে না—যতক্ষণ না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, যতক্ষণ না নারী নিজে তাঁর আত্মসম্মানবোধে বলীয়ান হতে পারবেন, যতক্ষণ না পারিবারিকভাবে নারীকে মর্যাদার আসনে বসানো হবে।
আমাদের সমাজে একই নারীকে দেখা হয় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এবং খণ্ডিতভাবে। ফলে তাঁদের মূল্যায়নও করা হয় বিভিন্ন রূপে। কখনোই নারীকে পূর্ণাঙ্গরূপে চিন্তা করা হয় না, যা তাঁর সত্তাকে ঠিক মানুষের পর্যায়ে না পৌঁছিয়ে কিছুটা যেন ছোট করে রাখার একটা চেষ্টা। এটা কোনো বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই যে সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয়। তাই দেখা যায়, সমাজের সর্বনিম্ন শ্রেণী থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণী পর্যন্ত—সব ক্ষেত্রেই নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন।
তাহলে গলদটা কোথায়? ব্যাধিটা আমাদের মগজের, যা সারাতে হলে মগজকেই ধোলাই করতে হবে। নারী-পুরুষের মধ্যে যে দৈহিক গঠন ছাড়া কোনো পার্থক্য নেই, এই বোধটুকুতেই বড় সমস্যা। একজন নারী সবার আগে একজন মানুষ, তারপর নারী—সবার আগে এই চৈতন্য জাগ্রত করা প্রয়োজন। আসলে আমরা স্বার্থান্ধ হয়ে যাচ্ছি। নিজেকে নিয়েই আমাদের পৃথিবী। প্রতিবেশী বলে যে একটা শব্দ আছে, তা যেন ভুলে গেছি। তারপর আবার দায়িত্ব পালন। এই প্রশ্ন যেন বিস্ময়কর! সমাজকে নির্মাণ করা হয়েছিল মানুষের আর্থসামাজিক নিরাপত্তার খাতিরেই। আজ প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে এসে আমরা ভাবতে শুরু করেছি, আমরা প্রত্যেকেই স্বনির্ভর। এই সমাজ আমাকে কিছু দিতে পারে না, বরং স্বাধীনতা খর্ব করে। তাই আমরা এড়িয়ে যাই সামাজিক দায়বদ্ধতা। ভুলে গেছি সামাজিক মূল্যবোধ, কর্তব্য। আমরা যদি ভাবতাম সবাই এক, যদি সজাগ থাকতাম আমাদের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে, তাহলে মিরপুরের হজরত আলীকে হয়তো এভাবে প্রাণ দিতে হতো না। সেদিন হজরত আলী কিন্তু একা ছিলেন না, তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। যদি তাঁরা সবাই একটি করে ইটও হাতে নিয়ে দাঁড়াতেন, তাহলে নিশ্চয়ই দুর্বৃত্তরা গুলি ছোড়ার সাহস পেত না। এবং তাদের ধরাও সম্ভব হতো। এ একটি উদাহরণ-সূত্র দিয়েই আমি বলব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই আমাদের ইভ টিজিং অপরাধপ্রবণতা গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ।
আমরা যৌথ পরিবারের কথা শুনলেই চোখ কপালে তুলি। একবারও ভাবি না, আমরা কী মহান শক্তিকে হাতছাড়া করছি। এই পরিবারকাঠামো গড়ে ওঠে বাবা-মা, ভাইবোন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি ও চাচাতো ভাইবোনদের নিয়ে, যেখানে সবাই একে অন্যের প্রতি দায়বদ্ধ। একজন অন্যজনকে লেখাপড়ায় সাহায্য করে, বড় ছোটকে আদর করছে, প্রয়োজনে শাসন করছে। তারা একসঙ্গে খেলছে। আনন্দ করছে। যাদের আনন্দের সবচেয়ে বড় উপকরণ পারস্পরিক বন্ধন। হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকা। পরিবারের কোনো ছেলে বাইরে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে—এটা দেখার জন্য এই পরিবারের আছে কয়েক জোড়া বিশ্বস্ত চোখ। এই পরিবারের কোনো মেয়েকে তার প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে আত্মহত্যা করতে হয়নি। কারণ, কেউ কোনো অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায়নি। সে সুযোগও সে পায়নি। কেননা, এখানে শুধু কয়েক জোড়া বিশ্বস্ত চোখই যে আছে, তা নয়, আছে তার অনেক হিতাকাঙ্ক্ষীও।
এই পরিবারের কোনো ছেলে রাস্তায় ইভ টিজিং করে না। কারণ, প্রথমত তাকে তার আপন ও চাচাতো বোনদেরও দায়িত্ব নিতে হয়। একত্রে বসবাসের কারণে মেয়েদের পণ্য বা আনন্দোপকরণ হিসেবে না দেখে মানুষ বা বন্ধু হিসেবে দেখতে শিখেছে। এ ছাড়া ওই যে কয়েক জোড়া বিশ্বস্ত চোখ, যা তাকে সব সময়ই তটস্থ করে রাখে। এই পরিবারের কোনো পুত্রবধূ নির্যাতিত হন না বা নিহত হন না। কারণ, ওই পর্যন্ত কোনো ঘটনা ঘটার আগেই পরিবারের সদস্যরা সমাধান করে ফেলে। এখানে একজন ভুল করলে অন্যজন তার ভুল ধরিয়ে দেয়। এখানে কেউ কাউকে অন্যায় কোনো কাজে প্ররোচিত করলে অন্যজন তাকে নিবৃত্ত করে। এখানে কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—একে অন্যের পরিপূরক। আর তাই একজন কর্তা গত হলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা অথই সাগরে পড়ে না।
আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে সমগ্র মানবজাতিকেই যেখানে একটি পরিবারের কাঠামোতে আসা উচিত, সেখানে আমরা একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীই পারছি না একটি কাঠামোর মধ্যে আসতে—শুধু আমাদের সংকীর্ণতা আর আমাদের স্বার্থান্ধতার জন্য। যেদিন আমরা ভাবতে পারব সবাই আমরা এক। যে মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে আমারই বোন। যেদিন বিপদগ্রস্ত কোনো মেয়ে নির্দ্বিধায় কারও কাছে সাহায্য চাওয়ার সাহস পাবে, তার পাশ দিয়ে যে পুরুষ হেঁটে যাচ্ছে, ভাবতে পারবে, পুরুষটি তার শুভাকাঙ্ক্ষী। ঠিক তখনই ইভ টিজিং-দুর্বৃত্ততা উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করবে। মানুষই মানুষকে নিরাপত্তা দেয়। আমাদের প্রয়োজন সেই মনুষ্যত্বের উপলব্ধিটুকু।
 গালিব মেহেদী খান: বদলে যাও বদলে দাও মিছিল ব্লগের নিয়মিত লেখক।
kmgmehadi@yahoo.com
যোগ দিন ফেসবুক পেজে: www.facebook.com/bjbdmichil

জনমত জরিপের ফলাফল
বদলে যাও বদলে দাও মিছিলের ওয়েবসাইটে নতুন তিনটি জনমত শুরু হয়েছে চলতি সপ্তাহে। আপনিও অংশ নিন জরিপে।
ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের সাজা দিতে প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট বসা উচিত বলে মনে করেন?

 হ্যাঁ ৮৯%  না ৭%
 মন্তব্য নেই ৪%
৪ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত
আপনি কি মনে করেন, নৌ-দুর্ঘটনা কমাতে চলতি বাজেটেই নৌ-পুলিশ বাহিনী গঠন করা জরুরি?
 হ্যাঁ ৭৪%  না ২০%
 মন্তব্য নেই ৬%
৪ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত
শিশুদের জন্য একটি বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল অনুমোদন দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন কি?
 হ্যাঁ ৮২%  না ১৪%
 মন্তব্য নেই ৪%
৪ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত
www.bodlejaobodledao.com

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Md Nasir Uddin Khan

Md Nasir Uddin Khan

২০১২.০৭.০৫ ১১:৪১
আজ কাল কিছু কিছু মেয়ে যেভাবে পোসাক পরছে তাতেও ইভ তিজিংএ ছেলেদের উতসাহিত করছে।
২০১২.০৭.০৫ ১২:৪১
মেয়েদের পর্দার ব্যাপারটা অনেকে সমরথন না করলেও ইভ টিজিং এর বিরুদ্ধে এটা একটা বড় ব্যারিয়ার।

G. Rahman

G. Rahman

২০১২.০৭.০৫ ২২:৩৪
অনেকেই বলেন মেয়েদের পর্দার কথা। আমি তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করেই বলব, লাভ নেই। কারণ, সব নারী যদি কাল থেকে দরজায় খিল এঁটেও বসে থাকেন, তবু দুর্বৃত্তরা নিবৃত্ত হবে না.
Mr গালিব মেহেদী খান this is your assumption or opinion. In fact, Man-made assumption is often associated with error and flaw. On the other hand, Religions did not say the women must always stay inside the house, rather Islam strongly emphasized on the modest wearing both for men and women which is eve-teasing proof plus hygienic plus safe and plus...................Plus.........Plus...... without a single minus.

Hm kawsar

Hm kawsar

২০১২.০৭.০৬ ১১:৫২
আটসাট পুসাক নিছু মানুসিকতা জতদিন না পরিব্তন হবে ইবটিজিং এর সমাদান সম্ববনা

Mahbubul Hoque

Mahbubul Hoque

২০১২.০৭.০৬ ১৫:৪৭
১) কারণ, সব নারী যদি কাল থেকে দরজায় খিল এঁটেও বসে থাকেন, তবু দুর্বৃত্তরা নিবৃত্ত হবে না—যতক্ষণ না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, যতক্ষণ না নারী নিজে তাঁর আত্মসম্মানবোধে বলীয়ান হতে পারবেন, যতক্ষণ না পারিবারিকভাবে নারীকে মর্যাদার আসনে বসানো হবে।
২) আসলে আমরা স্বার্থান্ধ হয়ে যাচ্ছি। নিজেকে নিয়েই আমাদের পৃথিবী। প্রতিবেশী বলে যে একটা শব্দ আছে, তা যেন ভুলে গেছি। তারপর আবার দায়িত্ব পালন। এই প্রশ্ন যেন বিস্ময়কর!
লেখককে অনুরোধ করব উপরোক্ত বিষয়ে অর্থাৎ "নারীর অধিকার এবং প্রতিবেশী" এ ব্যাপারে ইসলাম কি বলেছে সে ব্যাপারে গভীর তথ্যানুসন্ধান করা। যাকে বলা হয় intensive study ভাসা ভাসা জ্ঞান দিয়ে নয়।