বিশ্ব ধরিত্রী দিবস

সভ্যতার আয়ু নির্ধারণ করবে জলবায়ু

এম এম খালেকুজ্জামান | তারিখ: ২২-০৪-২০১২

  • ১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ুর শাশ্বত ধারা। সেই পরিবর্তনের জোয়ারে পরিবর্তন এসেছে পরিবেশ শব্দকোষেও। গত শতকের শুরুতেও পরিবেশ শব্দকোষ আজকের মতো বর্ধিত কলেবরের ছিল না নিশ্চিত। পরিবেশ শব্দকোষের ভান্ডারে নতুন নতুন শব্দ যেমন যুক্ত হচ্ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নতুন নতুন ঝুঁকি।
দিন দিন পরিবেশ-বিপর্যয় বাড়ছে, তেমনি উৎপত্তি ঘটছে এমন নতুন নতুন শব্দসমষ্টির। এমনই এক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনেটর গেলরড নেলসনের ১৯৭০ সালে শুরু করা এক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এসেছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। এর নাম দেওয়া হয়েছিল এনভায়রনমেন্টাল টিচ-ইন। ওই বছর আমেরিকার সানফ্রান্সিসকো সিটিতে প্রথম ধরিত্রী দিবস পালিত হয়।
বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে বৈশ্বিক জনমত তৈরি করার লক্ষ্যে প্রতিবছর ২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালিত হয়ে আসছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টির শুরু থেকে ধরিত্রী তার সন্তানদের যা দিয়ে আসছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জীবন এবং সৃষ্টির স্থায়িত্বের জন্য একটি টেকসই নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার চেষ্টা। একই সঙ্গে ’৯২ সালের রিও ঘোষণায় আহ্বান জানানো হয় যে প্রকৃতি ও পৃথিবীর সঙ্গে সম্প্রীতি স্থাপনের মাধ্যমে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরির দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়। আর এই লক্ষ্য সামনে নিয়ে আগামী জুনে বিশ্বনেতারা Rio+20 sustainable development conference-এ একত্র হবেন।
শিল্পবিপ্লবের অভিঘাতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে মানুষ বিপুলভাবে প্রকৃতি ধ্বংসযজ্ঞে নিয়োজিত হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির দ্রুততার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিরঙ্কুশভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এবং বাছবিচারহীনভাবে প্রকৃতিকে ব্যবহারের ফলাফল হচ্ছে বর্তমান বিপর্যস্ত পরিবেশ। কেবল বিজ্ঞানীদের তথ্য-উপাত্তেই নয়, সাধারণের অভিজ্ঞতাই বলে পরিবেশ বিপর্যয়জনিত জলবায়ু পরিবর্তন তথা জলবায়ুর পাগলাটে আচরণ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভয়াবহ।
পশ্চিমা ধনিক শ্রেণীর বিলাসী জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দায় মেটাতে অবাধ বাণিজ্যের প্রসার, আবার অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী বণিক শ্রেণীর নির্বিচার শিল্পায়নের প্রভাবে পরিবেশ, প্রতিবেশ তথা জলবায়ুই বিপন্ন। উন্নত দেশগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানি ইত্যাদি কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জলবায়ুর করুণ শিকার বাংলাদেশ, মালদ্বীপের মতো সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ। জাতিসংঘ চুক্তি কাঠামোর দেশগুলো ২০১০ সালে সমাপ্ত কানকুন সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ও জলবায়ুর পরিবর্তন সূচকসংবলিত যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে, তাতে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান ১০ হাজার ভাগের সাত ভাগ।
বাংলাদেশে জনপ্রতি কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ তিন টনেরও কম। যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনপ্রতি কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২ দশমিক ৮ টন, সেখানে আমেরিকার ২০ টন। জলবায়ু পরিবর্তনে ন্যূনতম ভূমিকার বিপরীতে বাংলাদেশকে সহ্য করতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়ংকরতম পরিবর্তনগুলো। জার্মানওয়াচ ও ম্যাপলক্রফট জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ১ নম্বরে রেখেছে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে এক লাখ ৯১ হাজার ৬৩৭ জন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে। এর মধ্যে শুধু ঝড়েই মারা গেছে এক লাখ ৬৭ হাজার ১৭৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো, ২৭.১১.২০১০)।
জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) মতে, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যদি না শিল্পোন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণের ব্যাপারে সংযমী হয় এবং যদি না এ-সংক্রান্ত কোনো আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়।
এনইপির মতে, কোপেনহেগেন মতৈক্য অনুযায়ী, চলমান শতকের গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দিতে না চাইলে ২০১১ সাল থেকে কার্বন নিঃসরণের হার ৬০ শতাংশ কমাতে হবে। কিন্তু কার্বন নিঃসরণের হার কমানোর চেয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো ‘কার্বন ব্যাংক’, ‘কার্বন ক্রেডিট’, ‘কার্বন বাণিজ্য’ ইত্যকার ধারণা নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষিতে নেমেছে। কার্বন বাণিজ্যের সবচেয়ে করুণ পরিহাস হচ্ছে, উন্নত দেশগুলো অর্থের বিনিময়ে জলবায়ু ধ্বংসের অধিকার কিনে নিচ্ছে। এই ধরনের বাণিজ্য-ব্যবস্থা যেভাবে হবে, কোনো দেশের বনাঞ্চল যতটা কার্বন ধারণ করতে পারবে, ততখানি কার্বন পোড়ানোর অধিকার সে দেশ বিক্রি করতে পারবে। বাণিজ্যপরায়ণ পশ্চিমাগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনকেও পণ্যায়িত করেছে। কার্বন ক্রেডিট সংগ্রহ করে দূষণের অধিকারী হও, শিল্পোন্নত দেশগুলোর বেনিয়াগোষ্ঠীর নতুন স্লোগান।
জলবায়ু রাজনীতি, জলবায়ু কূটনীতি ইত্যাদি প্রত্যয় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল। এবং এ সংক্রান্ত তথ্য প্রচার করেছে গোপন তারবার্তা ফাঁসকারী ওয়েবসাইট উইকিলিকস। ২০১০ সালের ৩ ডিসেম্বর ছাড় করা কিছু দলিলে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরেও কোপেনহেগেন পরিবেশ সম্মেলনে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘুষের বিনিময়ে ও জলবায়ু তহবিলের বরাদ্দ লোভ দেখিয়ে ১৪০টি দেশকে তাদের স্বার্থে তৈরি করা কোপেনহেগেন অ্যাকর্ডে সম্মত হতে বাধ্য করেছে। সাগরে তলিয়ে যাক, খরায় শুকিয়ে যাক, অভিযোজন তহবিলের বরাদ্দ পেলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে, এমন মনোভাবাপন্ন দেশের তালিকায় বাংলাদেশও আছে। তবে সেই শিকে ছিঁড়বে কি না তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ, অভিযোজন তহবিল বোর্ড বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের অদক্ষতা ও অস্বচ্ছতার কারণে অর্থছাড়ের বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বোল্ডারের ন্যাশনাল ওশিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফোরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) প্রত্নবিজ্ঞানী ডেভিড অ্যান্ডারসন ও ভারতের খরগপুর আইআইটির ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক অনিল গুপ্ত যৌথভাবে গবেষণা করে দেখিয়েছেন, চার হাজার বছর আগে সবুজ ও সফলা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে কেবল দীর্ঘ অনাবৃষ্টির কারণে। যদিও ঐতিহাসিকগণ ধারণা করেন, মধ্য এশিয়া থেকে আগত ঘোড়সওয়ারদের আক্রমণেই তা ঘটেছিল। ১০ হাজার বছরের উপমহাদেশীয় আবহাওয়ার পরিবর্তন ও মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের ওপর গুপ্ত ও অ্যান্ডারসনের যৌথ গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল একাডেমিক অব সায়েন্সের কারেন্ট সায়েন্স পত্রিকায়। গবেষকদ্বয় আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে পরিবেশ তথা জলবায়ু যদি আমাদের অবিমৃষ্যকারিতার শিকার হয়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বর্তমান সভ্যতার ধ্বংস প্রাপ্তি খুব দূরে নয়।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
khaliik@yahoo.com

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
২০১২.০৪.২২ ১০:১৬
name of water is life. so life or living beings there where is water. if we study history for some decades , we will find that cities / civilization developed near running rivers, when rivers lost it,s course, dried up. cities / civilization destroyed or ruined. if water bodies going to lose water due to human activities , the areas will be towards desertification and our cities / civilization will face tremendous pressure to exists. so we should try our best to retain water bodies. thnx Mr. Zaman for timely nice article. We should all jointly try to build a habitable planet for our next generation. Sowe should not destroy water bodies. not destroy forest. not pollute water both underground and surface, not pollute air. thnx.