আমাদের যে ভালো থাকতেই হবে

| তারিখ: ০৮-০৩-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • কাঠের জিনিসপত্র তৈরি করে সপ্তাহে দুই হাজার টাকা আয় করেন মায়া বেগম

    কাঠের জিনিসপত্র তৈরি করে সপ্তাহে দুই হাজার টাকা আয় করেন মায়া বেগম

  • আরও একটি রিকশা কিনবেন মঞ্জুয়ারা বেগম

    আরও একটি রিকশা কিনবেন মঞ্জুয়ারা বেগম

  • বোরো মৌসুমে জমিতে কাজ। বাকি সময় সেলাইয়ের কাজ করেন পূর্ণিমা মণ্ডল

    বোরো মৌসুমে জমিতে কাজ। বাকি সময় সেলাইয়ের কাজ করেন পূর্ণিমা মণ্ডল

এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল-এর পক্ষ থেকে সারা দেশের ১৮০ জন এসিডদগ্ধ নারীকে পুনর্বাসন করা হয়েছে গত ১০ বছরে। অভাবের তাড়নায় বা জীবিকার সন্ধানে কেউ বা বাসস্থান বদল করেছেন, কেউ বা বিক্রিও করে দিয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ নারীই সংগ্রাম করে টিকে আছেন। খুঁজে পেয়েছেন আত্মকর্মসংস্থানের পথ। নানা রকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে বেঁচে থাকার লড়াই। এই প্রতিবেদনে তাঁদের কয়েকজনের কথা তুলে ধরা হলো।

জীবনের ওপর ভরসা পাই এখন
সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার মুকুন্দগাতী বাজারের মায়া বেগম। জমিসংক্রান্ত ঘটনার জের ধরে ২০০৩ সালে এসিডদগ্ধ হন। প্রতিবেশীরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ সাহায্য করেনি। মামলা হলেও তা টেকেনি। মীমাংসা করতে বাধ্য হন।
প্রথম আলো আমাকে একটি কাঠ কুন্দানো মেশিন দেয়। কাঠ দিয়ে বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী লাটিম, কৃষিকাজে ব্যবহূত কাঁচির আছারি, গৃহবধূদের ঘরের সামগ্রী, রুটি তৈরির বেলনা, ফুলদানি ইত্যাদি তৈরি করতে থাকি। দিনরাত পরিশ্রম করে উত্পাদিত পণ্য প্রতি সপ্তাহে চার হাজার টাকা বিক্রয় হয়। খরচ বাদে দুই হাজার টাকা মুনাফা থাকছে। খুব ভালো আছি। চার ছেলেমেয়ের লেখাপড়াসহ সংসার চলছে ভালোভাবেই। জীবনের ওপর ভরসা পাই এখন। এই ছোট শিল্পের আয় দিয়ে আসা করছি বাকি জীবনটা ভালোভাবেই কেটে যাবে।

আরও একান একশা কেনার চিন্তা করব্যার নাগচি
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বড় গোবিন্দপুর গ্রামের মেয়ে মঞ্জুয়ারা বেগম (৩০)। স্বামীর সঙ্গে গরু বেচাকেনা নিয়ে একই গ্রামের ফুল মিয়ার দ্বন্দ্ব ছিল। এর জের ধরে ফুল মিয়া ও তাঁর সহযোগী মঞ্জুয়ারাকে এসিড নিক্ষেপ করে। ঘটনা ২০০৫ সালের ২৫ মে রাতের। এতে তাঁর গলা ও বুকের একাংশ ঝলসে যায়। এ ঘটনায় মঞ্জুয়ারার স্বামী আবদুুল মজিদ বাদী হয়ে ফুল মিয়াসহ তিনজনকে আসামি করে পলাশবাড়ী থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি (এসিড-০৫/০৫) গাইবান্ধা স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আদালত-১-এ বিচারাধীন রয়েছে। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো থেকে তাঁকে একটি রিকশা দেওয়া হয়।
মঞ্জুয়ারা বেগম নিজের ভাষায় বলেন, ‘মামলা চালব্যার যায়া হামার ঘরে সবকিচু চলি গেচে। তার ওপর মামলা তুলি নেওয়ার জন্যে আসামির নোকজন হামাক হুমকি দিব্যার নাগচে। তোমরা হামাক বাড়ি থাকি বাইর হবার দ্যায় নাই। মামলার সাক্ষীক অপহরণ করছিল। তকন মামলার খরোচ জোগান দূরের কতা, দুইব্যালা খাবার বুদ্ধি আচিল না। পোত্তম আলোত থাকি হামাক একনা একশা কিনি দেওয়ায় গতি হচে। প্রত্যেক দিন ১২০ থাকি ১৬০ ট্যাকা কামাই হয়। তাক দিয়া সংসার চলব্যার নাগচি। ছোলট্যাক ইসকুলেত দিচি। মাজেমধ্যে মানুষের বাড়িত কাম করি। মামলা নিয়া আর চিন্তা নাই। পোত্তম আলোত থাকি মামলা চলব্যার নাগচে। হামার ঘরে আর অভাব নাই।’ মঞ্জুয়ারার স্বামী আবদুুল মজিদ বলেন, ‘হামার বউয়ের ম্যালা ধরজো। ওর কতাত কাম করি কামাই বাড়ি গেচে। আরও একান একশা কেনার চিন্তা করব্যার নাগচি।’

তিন গাভির মালিক মাবিয়া
সাহায্য নিয়েও যে উন্নতি করা যায়, তার প্রমাণ পেয়েছি প্রথম আলো থেকে গাভি পেয়ে। অন্ধকার জীবন থেকে আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছি, এটাই আমার জীবনের বড় সার্থকতা। এভাবেই মনের ভাব প্রকাশ করলেন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার চিপলগাতী গ্রামের মাবিয়া বেগম।
জমিসংক্রান্ত ঘটনার জের ধরে ২০০৫ সালে এসিডদগ্ধের শিকার হন। চিকিত্সাশেষে সংসারজীবন কষ্টকর হয়ে ওঠে। মাবিয়া আরও বলেন, ‘প্রথম আলোর সহযোগিতায় আমি তিনটি গাভির মালিক। গাভি পালন করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এ বছরে কিছু জমি বন্ধক রাখার জন্য চিন্তাভাবনা করছি।’

ঘর না দিলে গাছতলায় থাকতে হতো
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাকশিয়া গ্রামে পূর্ণিমাদের বাড়ি। স্বামীর সঙ্গে বিরোধের কারণে ২০০০ সালের ২৮ জুন রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বামী এসিড নিক্ষেপ করেন। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। প্রথমে সাতক্ষীরা হাসপাতাল, পরে তাঁর উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকায় কয়েক দফা চিকিত্সা দেওয়া হয়। ২০০৩ সালে পূর্ণিমার ইচ্ছানুযায়ী প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের পক্ষ থেকে ৪২ হাজার টাকায় দেওয়া হয় একটি ঘর ও সেলাই মেশিন। পূর্ণিমা মণ্ডল জানান, বোরো মৌসুমে জমিতে ৬০ টাকা মজুরিতে বোরো খেতে কাজ করেন। এসিডে ক্ষতস্থানে রোদ লাগলেই জ্বালা করতে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য এ লড়াই। প্রথমে সেলাইয়ের কাজ করে ৩০০ টাকা আয় করলেও বর্তমানে ১০০ টাকার বেশি আয় হয় না। একমাত্র ছেলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। সংগ্রাম করে একবেলা খেয়ে না-খেয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন। পূর্ণিমা জানান, প্রথম আলো ঘর না দিলে গাছতলায় থাকতে হতো। স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখায় প্রথম আলো।

এখন তাঁর ১০টি ছাগল
‘স্বামী আলতাফ হোসেন দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকে চার সন্তান নিয়ে একা হয়ে পড়ি। ২০০৭ সালে সতিনের ভাই আমাকে এসিড ছুড়ে মারে। মামলা হওয়ার পর প্রভাবশালীদের চাপে গ্রাম্য সালিসে মীমাংসা হয়।’ এভাবেই বর্ণনা করলেন সিরাজগঞ্জ জেলার সলঙ্গা থানার এসিডদগ্ধ কোহিনূর বেগম। কোহিনূর আরও বলেন, ‘তিন মেয়ে, এক ছেলে নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় প্রথম আলো একটি গাভি দেয়। গাভিটি পালন করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে একটি ভালো আবাদি জমি ক্রয় করেছি। চলতি বছর গাভিটি অসুস্থ হলে বিক্রি করে তা তিনটি ছাগল ক্রয় করেছি। ছাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১০টি। জীবন এখানেই থেমে থাকেনি। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। একটি মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তাকে বিয়ে দেব।’

বাড়িটিই তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছে
স্বামী সামছুল মণ্ডল গর্ভে সন্তান থাকা অবস্থায় এসিডদগ্ধ সালমা আক্তারকে ফেলে রেখে চলে যান। সেই সময় প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে চার শতক জমি ও সেমিপাকা একটি বাড়ি করে দেওয়ার পর স্বামী ফিরে এসেছেন। এখন তাঁরা মিলেমিশে সংসার করছেন। দুই সন্তান নিয়ে বেঁচে আছেন সালমা। তাঁর ভাষায়, এই বাড়িটি তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছে। সালমা আক্তার মাগুরা সদর উপজেলার পাকাকাঞ্চনপুর গ্রামের আদিল উদ্দিনের মেয়ে।
সালমা জানান, প্রথম আলোর দেওয়া জায়গা আর বাড়িটি তাঁদের সম্বল। স্বামী বিষয়খালী বাজারে ফলের ব্যবসা করে যা আয় করেন, তা দিয়ে বেঁচে আছেন। মেয়েটাকে স্কুলে দিয়েছেন, এবার সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ছে।

পড়াশোনা করি ইংরেজি সাহিত্যে
নরসিংদী সরকারি কলেজে ইংরেজিতে স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তাহমিনা সুলতানা (২০)। মনোহরদী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০০২ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিবেশী এক চাচা এসিড নিক্ষেপ করেন।
তাহমিনা চোখের পানি ছেড়ে বলেন, ‘সেই থেকে সমাজে আমি একজন মৃত মানুষ হয়ে আছি। মৃত মানুষকে দেখলে আপনজনেরা যেমন ভয় পায়, তেমনি আমাকে দেখলে শিশুরা দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে।’ সে সময় প্রথম আলো থেকে এককালীন ১০ হাজার টাকা, প্রতি মাসে এক হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছি। এতে করে আমার অবস্থা এখন মোটামুটি ভালো।

ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছি
গাইবান্ধা পলাশবাড়ী উপজেলার কাতলি গ্রামে মনজু রানীর (৩৫) বাড়ি। ২০০৬ সালের ৪ এপ্রিল গভীর রাতে পূর্বশত্রুতার জের ধরে একই গ্রামের সাহারুল ও তাঁর লোকজন মনজু রানীর ওপর এসিড নিক্ষেপ করেন। এতে তাঁর শরীর ঝলসে যায়। সাহারুলসহ চারজনকে আসামি করে পলাশবাড়ী থানায় একটি মামলা করা হয়। সে সময় অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটত। ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে একটি রিকশা দেয়। সেই থেকে আমার স্বামীকে আর ভাড়ার রিকশা চালাতে হয় না। নিজের রিকশার আয় দিয়ে সংসার চালানোর পরও দৈনিক ১০ টাকা সঞ্চয় করছি। ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। বসতভিটা কিনে আবার সুখের সংসার গড়ব।’ মনজু রানীর স্বামী সাহারুল ইসলাম বলেন, ‘এসিডদগ্ধ হয়েও আমার স্ত্রী সংসারের বোঝা নয়। সে বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করে। তার উত্সাহে দিনরাত পরিশ্রম করছি।’

প্রথম শ্রেণীতে পড়ে সোনালী
বাবার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের কারণে মাত্র ১৮ দিন বয়সী সোনালীকে দুর্বৃত্তদের আক্রোশের শিকার হতে হয়। ২০০২ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা ঘুমন্ত অবস্থায় এসিড নিক্ষেপ করে সোনালী, তার মা খোদেজা বিবি ও বাবা নূর ইসলামকে। এসিডে সোনালীর চোখ, মুখ ও শরীর ঝলসে যায়। চোখ নষ্ট হয়ে যায় খোদেজা বিবির। সোনালীকে ২০০৬ সালে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ১০ কাঠা জমি কিনে দেওয়া হয়। সোনালীর বাবা নূর ইসলাম জানান, প্রথম আলোর দেওয়া জমির ফসল বিক্রি করে মেয়ের (সোনালী) নামে ব্যাংকে প্রতিবছর তিন হাজার ৩৫৪ টাকা রাখেন। বর্তমানে সোনালী প্রথম শ্রেণীতে পড়ছে গ্রামের বিদ্যালয়ে।
গ্রন্থনা: ফেরদৌস ফয়সাল
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন: কল্যাণ ব্যানার্জি, সাতক্ষীরা; আজাদ রহমান, ঝিনাইদহ; শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা; এনামুল হক, সিরাজগঞ্জ; নেয়ামত উল্যাহ, ভোলা ও মনিরুজ্জামান, নরসিংদী।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন