সুস্থ হবে, হাল ছেড়ে দেবেন না
আসুন মাদকমুক্ত থাকি, পরামর্শ সহায়তা ২৩-এর আসর
২৮ জানুয়ারি বিকেল পাঁচটায় পরামর্শ-সহায়তা ২৩-এর আসরটি অনুষ্ঠিত হয় ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে। এ আসরে উপস্থিত ছিলেন মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল; তাজুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট; অভ্রদাশ ভৌমিক, সহকারী অধ্যাপক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট; আহমেদ হেলাল, ক্রিয়ার পরিচালক; ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী। পরামর্শ সহায়তার আলোচিত বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
শুরুতে আহমেদ হেলাল সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, অনেকে বিশ্বাস করেন মাদকাসক্তি এমন একটা রোগ, যা কখনো ভালো হওয়ার নয়। তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েন, হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু মাদকাসক্তদের জন্য এখন বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা রয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে সঠিক পরিচর্যা এবং সময় নিয়ে চিকিৎসা করলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। আশাহত হবেন না। আপনাদের সন্তান, নিকটজন যে-ই হোন না কেন, তাকে উপযুক্ত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসুন, যাতে সে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসতে পারে।
একজন মায়ের প্রশ্ন: আমার সন্তান মাদকাসক্ত ছিল। এখন ভালো হয়েছে। এ লেভেল শেষ করে একটি অফিসে চাকরি করছে।
আমরাও তার ওপর খুশি। কিন্তু আমি চাই, যেসব পুনর্বাসন কেন্দ্রে থেকে সুস্থ হয়েছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুক।
তার যোগাযোগ ছিল, কিন্তু মাঝখানে পরীক্ষার জন্য কিছুদিন যেতে পারেনি। এখন মনে হচ্ছে সে কেন্দ্রগুলোতে যেতে চায় না। আমার প্রশ্ন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে যোগাযোগের ব্যাপারে কী করতে পারি?
পরামর্শ: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেটা হয়, অনেক দিন ভালো থাকার পর পুনরায় আবার নতুনভাবে মাদকাসক্ত হতে পারে। জেনে নেওয়া উচিত যে সে খারাপের দিকে যাচ্ছে কি না। ভালো থাকার সময় সব নিয়ম সঠিকভাবে মেনে চলছে কি না। যখন সে খারাপের দিকে যায়, তখন সবক্ষেত্রে অনিয়ম করে। চিকিৎসকের কাছে না যাওয়ার দুটো কারণ হতে পারে। এক. সে খারাপের দিকে যাচ্ছে। দুই. তার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে, সে আর খারাপ হবে না। এ দুটো বিষয়ই বিপজ্জনক। খারাপ হওয়ার লক্ষণগুলো তার মধ্যে দেখা যায় কি না, এ দিকটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তারপর বুঝিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে বলতে হবে, এখন ভালো থাকলেই হবে না, ভবিষ্যতে ভালো থাকতে হলে অবশ্যই পুনর্বাসন কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে হবে।
মাদকাসক্ত সন্তানের মায়ের প্রশ্ন: আমার সন্তান এখন ভালো। সে বিদেশে যেতে চায়। তার খুব ইচ্ছে বিদেশে পড়ার। এ বিষয়ে আমার করণীয় কী?
পরামর্শ: সে যেহেতু এখন ভালো, এ অবস্থায় বিদেশে যাওয়াটা সমর্থন করা যায় না। বিদেশে অবাধ স্বাধীনতার মধ্যে খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। মোহিত কামাল বলেন, দেশ থেকে ভালো হয়ে যারা বাইরে যাচ্ছে, তারা কোন দেশে যাচ্ছে, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ, যারা একটা মাদক নেয়, তারা অন্য একটা মাদক নেওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যারা বিদেশে গেছে, তারা দেশে ফিরেছে অধিক মাদকাসক্ত হয়ে। বিদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদক খুর সহজেই পাওয়া যায়। তাই সেখানে সব সময় মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে হয়। একজন মাদকাসক্তের মা হিসেবে আপনিই হচ্ছেন তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
মায়ের প্রশ্ন: আমার সন্তান মাদকাসক্ত ছিল। এখন ভালো হয়েছে। ভালো চাকরি করে, ভালো বেতন পায়। এটা তার জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হবে কি না? তা ছাড়া তার সঙ্গে অনেক বুঝেশুনে, আদর করে কথা বলতে হয়। এ ব্যাপারে আপনাদের কোনো পরামর্শ আছে কি না?
পরামর্শ: বেশি বেতন, কম বেতন—কোনো বিষয় না। কম টাকায় যেমন নেশা পাওয়া যায়, তেমনি বেশি টাকায়ও নেশা পাওয়া যায়। আর আপনি যে সব সময় তার সঙ্গে আদর করে কথা বলেন, এটা তার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সে আপনার এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। আপনার আবেগকে সব সময় নিযন্ত্রণে রাখতে হবে। আর পাঁচটা ছেলের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, তার সঙ্গেও সেভাবেই বলতে হবে।
একজন মায়ের কথা: আমার সন্তান কয়েক বছর ধরে অসুস্থ। বয়স ২৪ বছর। ও লেভেল পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। বাবার আদর, স্নেহ পায়নি, এটা তাকে দুঃখ দেয়। তার কিছু মানসিক সমস্যা হয়। তার বাবাও মানসিক রোগী। ছেলেকে চার বছরে চারবার হাসপাতালে ভর্তি করেছি। ভালো হয় কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আমার সন্তানকে এখন খুব ব্যয়বহুল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা এক বছর সময় নিয়েছেন। টাকার জোগান দিতে দিতে প্রায় সব শেষ।
পরামর্শ: প্রথমে তার মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করতে হবে। মানসিক সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই মাদকাসক্তের জন্য দায়ী হয়। এ জন্য ওর লং অ্যাকটিং অ্যান্টি সাইকোটিক ওষুধ খেতে হবে (দীর্ঘ সময় কার্যকর মানসিক রোগের ওষুধ)। এই ওষুধ নিয়মমতো খেলে সে মানসিক সমস্যা থেকে মুক্ত থাকবে। ফলে মাদক থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। ব্যক্তিত্বের, বন্ধুত্বের এবং মানসিক সমস্যা ছাড়াও হাতে বেশি টাকা থাকা, হতাশা, রাগ, ক্রোধ বিভিন্ন কারণে এ রোগটি বারবার ফিরে আসতে পারে। যেসব কারণে সে মাদক নিতে পারে, ওই কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এই কারণগুলো সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এ জন্য তাকে অন্যদের থেকে বেশি ফলোআপে রাখতে হবে। ফলোআপে থাকলে চিকিৎসকেরা এ বিষয়গুলো নিয়ে তার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবেন, যেটা তাকে সর্বক্ষণ মাদকমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে।
মাদকাসক্ত রোগীর ভাইয়ের কথা: আমার ছোট ভাই। অনেক দিন থেকে মাদকাসক্ত। পরিবারের সবাই মিলে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই ফেরানো যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, তার আচরণ তত খারাপ হচ্ছে। তাকে যদি কোথাও ভর্তি করি, তাহলে এলাকায় জানাজানি হবে, এটাও মানসম্মানের ব্যাপার। এখন আমার প্রশ্ন, তাকে বাসায় রেখে গোপনে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে কি না?
পরামর্শ: আমরা একটা বিষয় বারবার বলার চেষ্টা করি, যিনি মাদকাসক্ত হয়েছেন, তিনি কিন্তু অপরাধী না, তিনি আসলে অপরাধের শিকার। সড়ক দুর্ঘটনায় কারও পা ভেঙে গেলে আমরা তাকে দোষ দিই না, গোপন করি না, বরং চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। আমরা চালকের দোষ দিই, তার বিরুদ্ধে মামলা করি। কিন্তু আমাদের সন্তান, আপনজন কেউ মাদকাসক্ত হলে আমরা গোপন করি। আমরা মনে করি, সে অপরাধী। দিন দিন গোপন করার ফলে সে বড় রকমের অপরাধজনক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এটি তার জন্য এবং পরিবারের জন্য অনেক বেশি অপমানজনক হয়। গোপনে চিকিৎসার বিষয়ে আপনি জানতে চেয়েছেন। এ ব্যাপারে বলব যে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করেই রোগীকে চিকিৎসা করানো হয়।
একজন মাদকমুক্ত তরুণের কথা: অনুষ্ঠানে এসে আপনাদের কথা শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, একদিন আপনাদের মতো করে আমার মাও বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। আমি একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই, যাঁদের পরিবারে এই সমস্যা আছে, তাঁরা কখনো নিরাশ হবেন না। কেউ একবার চিকিৎসার পর ভালো হয়, আবার কারও ১০-১২ বার লাগতে পারে। কিন্তু ভালো সে হবেই। অবশ্য আমি খুব ভাগ্যবান যে একবারেই ভালো হয়েছি। আমি যখন মাদকাসক্ত ছিলাম, তখন কোথাও যেতে পারতাম না। আমাকে সবাই ভয় পেত, খারাপ চোখে দেখত, ঘৃণা করত। আমি চেষ্টা করতাম এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে, কিন্তু পারতাম না। অবশেষে পেরেছি। আমার মা বিষয়টি লুকিয়ে রাখেননি। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। আমি মায়ের কাছে অনেক ঋণী। মায়ের বিশ্বাস ছিল তার ছেলে একদিন ভালো হবে। আমার বিশ্বাস, আপনারা সবাই আমার মায়ের মতোই বিশ্বাস হারাবেন না। রোগীর ওপর বিশ্বাস রাখবেন, সে খারাপ না। সে একটি পরিস্থিতির শিকার।
পরামর্শ সহায়তা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন
প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান রওশন
গ্রন্থনা: আশফাকুজ্জামান
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






