সরকারের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন আপাতত বিকল্প ট্রানশিপমেন্ট প্রয়োজন ৫০ হাজার কোটি টাকা ১৫ ধরনের মাশুল আদায়ের সুপারিশ
ট্রানজিট এখনই নয়
ভারত, নেপাল ও ভুটানকে এই মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার মতো অবকাঠামো বাংলাদেশের নেই। অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণেই ট্রানজিট দেওয়ার জন্য এখন প্রস্তুত নয় বাংলাদেশ।
এ জন্য পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে কমপক্ষে তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। আর এ সময়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
ট্রানজিট নিয়ে সরকারের গঠন করা একটি বিশেষ কমিটি বা ‘কোর গ্রুপ’-এর প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ট্রানজিটের বিকল্প হিসেবে আপাতত ট্রানশিপমেন্ট দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ট্রানশিপমেন্ট হলো, যে দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হবে, সেই দেশের সীমান্তে এসে পণ্য ওই দেশের যানবাহনে করে ভূখণ্ড পাড়ি দেবে।
ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে ট্রানজিট-সুবিধা দিতে গত ২ ডিসেম্বর ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমানকে সভাপতি করে এই কোর গ্রুপ গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কোর গ্রুপের কার্যপরিধি ছিল চারটি, এগুলো হলো: ট্রানজিট রুট চিহ্নিত করা, অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও তা পুনরুদ্ধার, ট্রানজিট মাশুল এবং ট্রানজিটের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ। এর মধ্যে রুট নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বিষয়ে দুটি উপদলের প্রধান ছিলেন ট্রানজিট বিশেষজ্ঞ রহমত উল্লাহ। ট্রানজিট মাশুল নির্ধারণ বিষয়ে উপদলের প্রধান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (শুল্ক) শাহ আলম খান, বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের ট্রানজিট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণসংক্রান্ত অপর উপদলের প্রধান ছিলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণসংক্রান্ত উপদলের প্রধান ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমদ।
কমিটি ট্রানশিপমেন্ট দিতে বাংলাদেশি যানবাহন ব্যবহার করে ভূখণ্ড পাড়ি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আর বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের যৌথ উদ্যোগে একটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার ৫১ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশের থাকবে। এই কোম্পানির যানবাহনের মাধ্যমেই নিজ নিজ দেশের ভূখণ্ডে পণ্য পরিবহন করা হবে।
পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট দেওয়া হলে বছরে এক কোটি ৭৩ লাখ টন কার্গো বহন করা সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আর আপাতত ট্রানশিপমেন্ট দেওয়া হলে সম্ভব হবে এর ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ লাখ টন কার্গো বহন করা যাবে।
প্রতিবেদনে ট্রানজিটের জন্য সড়ক, রেল ও নৌরুটগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ১৫ ধরনের ট্রানজিট মাশুল নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আবার পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিটের জন্য আগামী ১০ বছরে কোথায়, কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হবে, তারও একটি বিবরণী রয়েছে প্রতিবেদনে।
ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান ও ট্রানজিট-সংক্রান্ত কোর গ্রুপের সভাপতি মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে এই মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আপাতত ট্রানশিপমেন্ট-সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
মুজিবুর রহমান আরও জানান, প্রতিবেদনটি মূলত ট্রানজিট নিয়ে সরকারের একটি অবস্থানপত্র। সরকারি পর্যায়ে এর আগে এ ধরনের কাজ হয়নি। প্রতিবেদনটির মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা ট্রানজিট-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সময় প্রতিবেদনটি একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
ট্রানজিট মাশুল: প্রতিবেদনে ১৫ ধরনের মাশুল আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে মাশুল কত হবে, সে বিষয়ে কোনো সুপারিশ করা হয়নি। এগুলো হলো: টোল (আন্তসীমান্ত ব্যবহারকারী মাশুল), প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর মাশুল, রেল, সড়ক ও নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন, জ্বালানি কেনার কর, ভারী যানবাহন ব্যবহার, বিদেশি যানবাহন নিবন্ধন, পার্কিং, যানজট, পরিবেশদূষণ (বায়ু ও শব্দদূষণ), প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্ট করা, দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মাশুল।
মূল মাশুল হিসেবে প্রতিবেদনে টোলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই টোলের মাধ্যমেই সড়ক, রেল ও নৌ-অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগকৃত অর্থসহ লাভ বা প্রিমিয়ামের সিংহভাগ উঠে আসবে।
বিনিয়োগ: পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট-সুবিধা দিতে আগামী ১০ বছরে ৪৯ হাজার ৮৩৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বিনিয়োগের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরবর্তী ২০ বছরে তা প্রিমিয়ামসহ উঠে আসবে। পৃথিবীর বৃহত্তম ট্রানজিট অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ইউরোপীয় ইউনিয়নে ট্রানজিট বিনিয়োগে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রিমিয়াম থাকে।
প্রতিবেদনে অবকাঠামো উন্নয়নে সড়কপথে ১১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, রেলপথে ৩২ হাজার ২৩ কোটি টাকা, নৌপথে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম বন্দরে এক হাজার ৭০৯ কোটি টাকা, মংলা বন্দরে দুই হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা এবং স্থলবন্দরগুলোর জন্য ২০১ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত মাশুল আদায়ের মাধ্যমেই বিনিয়োগে অর্থ আসবে। তবে তা নির্ভর করবে মাশুলের হারের ওপর। আবার মাশুল নির্ধারণের বিষয়টি নির্ভর করবে ট্রানজিট-সুবিধা গ্রহণকারী ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সমঝোতার ওপর। কেননা এসব দেশ কোন কোন রুট ব্যবহার করবে, আর প্রতিবছর কী পরিমাণ পণ্য বহন করবে, তার ওপরও বিনিয়োগ ও মাশুল নির্ধারণের বিষয়টি জড়িত। এ জন্য প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর: ট্রানজিট-সুবিধার আওতায় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন কনটেইনার ধারণক্ষমতার ৫৭ শতাংশ ও কার্গো ধারণক্ষমতার ৫৪ শতাংশ ব্যবহূত হয়।
আর মংলা বন্দরে বছরে ৬৫ লাখ মেট্রিক টন কার্গো আর ৫০ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতা রয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই বন্দরে মাত্র সাড়ে ১৬ লাখ টন কার্গো ও দুই হাজার ৬৫ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গ: ট্রানজিট-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ও আইনি বিষয় নিয়ে প্রতিবেদনে বেশ কিছু প্রটোকলের মাধ্যমে ট্রানজিটের সামগ্রিক বিষয়গুলোর আইনি কাঠামো দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় নিষিদ্ধ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য পরিবহন করা যাবে না। ট্রানজিট-সংক্রান্ত সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা এবং তা পরিপালন করা হবে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে ট্রানজিট মাশুলের বিষয়টিও আইনি কাঠামোতে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য কনটেইনার ও কনসাইনমেন্ট সিল করা, যানবাহনের নিবন্ধন, পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শুল্কায়ন ও ইমিগ্রেশন-প্রক্রিয়া, ট্রানজিট যানবাহনের চলাচলের সীমারেখা, বিমা, দুর্ঘটনা, বিরোধ বিধি ইত্যাদি বিষয় আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকবে।
ট্রানজিটের কিছু ঝুঁকির কথাও কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে। যেমন—যদি কম পণ্য পরিবহন হয় এবং অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থ যদি বিদেশি ঋণদান সংস্থা থেকে আনা হয়, তাহলে এই বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সুতরাং ট্রানজিট-সুবিধা টেকসই করতে সব পক্ষকেই সবার জন্য লাভজনক বা ‘উইন উইন সিচুয়েশন’ তৈরি করতে হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৭ এপ্রিল এই কোর গ্রুপ প্রতিবেদন জমা দিলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে অর্থমন্ত্রী একটি বৈঠক করেন। ট্রানজিট-সংক্রান্ত এই প্রতিবেদনের ওপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি জাতীয় সেমিনার করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের মতামত নেবে বলে জানা গেছে।







msu shimul
২০১১.০৪.২৪ ০২:০১MD MEHEDI HASSAN
২০১১.০৪.২৪ ০২:১৩Abdullah Al-Mamun. রংপুর।
২০১১.০৪.২৪ ০২:২২SR Taufiq
২০১১.০৪.২৪ ০২:৫১সুমন - দোহা - কাতার
২০১১.০৪.২৪ ০৩:১৪M. Shawkat Ali
২০১১.০৪.২৪ ০৬:৪৪Md. Abdul Latife, Sabuz
২০১১.০৪.২৪ ০৮:৪৫Shahparan (south korea)
২০১১.০৪.২৪ ০৯:২০Ghum Bibek
২০১১.০৪.২৪ ০৯:৩৬Asad
২০১১.০৪.২৪ ০৯:৫৪mohammed yasin
২০১১.০৪.২৪ ১০:২০mohammed yasin
২০১১.০৪.২৪ ১০:২৪FAYSAL RAHMAN
২০১১.০৪.২৪ ১০:৩১M.A.H. Tofail Mahmud
২০১১.০৪.২৪ ১০:৩৮Sharif Hasan
২০১১.০৪.২৪ ১৪:০০T Alahee
২০১১.০৪.২৪ ১৪:১১Mojibur Rahman
২০১১.০৪.২৪ ১৪:২৩mohammad
২০১১.০৪.২৪ ১৪:৩৩Md. Rahat Chowdhury Plabon
২০১১.০৪.২৪ ১৪:৩৪