একাত্তর নিয়ে সেমিনারে বক্তারা
বিচার যত বিলম্বিত হবে, ন্যায় বিচার অর্জন তত দুরূহ হবে
নিউ জার্সির ইউনিয়ন শহরে অবস্থিত কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা দিন ধরে অনুষ্ঠিত এক সেমিনার ও সমাবেশে গত রোববার বক্তারা অভিমত প্রকাশ করেন যে, ১৯৭১-এ সংঘটিত গণহত্যার আইনসম্মত বিচারের মাধ্যমেই মানবসভ্যতার এক কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি সম্ভব। এই বিচার যত বিলম্বিত হবে, ন্যায়বিচার অর্জন তত দুরূহ হয়ে পড়বে।
কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলাদেশ স্টাডি গ্রুপ’-এর উদ্যোগে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার ইনস্টিটিউটের সমর্থনে দিনব্যাপী এই সেমিনারে বাংলাদেশ, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের গণহত্যা আইনবিষয়ক বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। এ ছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পর্যায়ে একাধিক বক্তা ১৯৭১-এর গণহত্যার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ তুলে ধরেন। বাংলাদেশ থেকে আসা বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবির এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হকও অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে একাত্তরের গণহত্যার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগের বিবরণ তুলে ধরেন।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত একরামুল কাদের এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল মোমেনও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানকেন্দ্রে গণহত্যার ওপর একটি চিত্র প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়।
কেন বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে গণহত্যার প্রশ্নে এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। এর আগে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ স্টাডি গ্রুপের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো একটি সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট দাউদ ফারাহি এক শুভেচ্ছা বক্তব্যে জানান, দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে গণহত্যাবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গণহত্যার বিচারের প্রশ্নে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যাপারে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রহ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আফগান বংশোদ্ভূত ফারাহি বলেন, ১৯৭২-এ কূটনীতিক পিতার সঙ্গে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশে এসে তিনি একাত্তরের গণহত্যার নিদর্শন ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কোনো গণহত্যাই আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতেই সব গণহত্যার অধ্যয়ন এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।’ বাংলাদেশে গণহত্যার প্রশ্নে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি কোর্স চালুর ব্যাপারে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীকার তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার ইনস্টিটিউটের পরিচালক হেনরি কাপলোভিত্স ১৯৭১-এর গণহত্যার প্রশ্নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কোর্স চালুর ব্যাপারে একই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ব্যাপারে কাজ অনেকটাই এগিয়েছে এবং আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে মাস্টার্স পর্যায়ে এই কোর্সটি চালু করা যাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদী। এক প্রশ্নের জবাবে কাপলোভিত্স প্রথম আলোকে জানান, ইতিমধ্যেই কোর্সের রূপরেখা খসড়া তৈরি হয়েছে এবং তা নিয়ে একাডেমিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই কোর্স চালুর ব্যাপারে অর্থ কোনো সমস্যা হবে না, তবে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত গ্রন্থের অভাব একটি অন্তরায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বিশিষ্ট গণহত্যা-বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম জোনসও গণহত্যার প্রশ্নে ইংরেজিতে নির্ভরযোগ্য গবেষণাগ্রন্থের অভাবের কথা উল্লেখ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান সুসান গ্রোনওয়ার্লড, যাঁর অধীনে এই কোর্সটি পরিচালিত হবে, তিনি জানান, আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে এই কোর্স চালু হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এ ব্যাপারে প্রবাসী বাঙালিদের সমর্থনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। কোর্সটি পুরোমাত্রায় চালু হতে হলে অন্ততপক্ষে ১৫ জন ছাত্র থাকতে হবে বলে গ্রোনওয়ার্লড জানান।
দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে একাধিক প্যানেল আলোচনায় একাত্তরের গণহত্যার ইতিহাস এবং এর বিচার প্রশ্নে বিভিন্ন আইনগত দিক পর্যালোচনা করা হয়। কোন আইনের ভিত্তিতে এই বিচার সম্ভব, তার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেন কানাডার বিশিষ্ট মানবাধিকার আইন-বিশেষজ্ঞ ডেভিড মাটাস, নিউ জার্সির রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার ক্লার্ক এবং ফ্লোরিডার সেন্ট টমাস স্কুল অব ল-এর আইনের অধ্যাপক রোজা প্যাটি। প্যানেল আলোচনায় বিভিন্ন বক্তা ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আইন পরিষদের গৃহীত গণহত্যার বিচারসংক্রান্ত আইনের ভিত্তিতে একাত্তরের গণহত্যার অপরাধীদের বিচার সম্ভব বলে অভিমত প্রকাশ করেন। এমনকি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের ভিত্তিতেও একাত্তরের সংঘটিত বিভিন্ন সাধারণ অপরাধের বিচার সম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আইন ও বিচারপদ্ধতি অনুসরণ বাঞ্ছনীয় বলে তাঁরা মত দেন।
ক্লার্ক অভিমত প্রকাশ করেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি ১৯৭১-এর গণহত্যার বিচারের জন্য উপযোগী, তবে এর কোনো কোনো ধারায় গণহত্যার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে তিনি এই আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশের অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ করেন। ডেভিড মাটাস বলেন, মৃত্যুদণ্ডাদেশের ধারা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সে ধারা কার্যকর করা হবে, এমন কোনো কথা নেই। মফিদুল হক জানান, একাধিক সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে এই আইনটি ইতিমধ্যেই যথাসম্ভব আন্তর্জাতিক আইনানুগ করা হয়েছে।
একাধিক প্যানেল সদস্য এই আইনের অধীনে গণহত্যার মূল হোতা, অর্থাত্ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখেন। রোজা প্যাটি অভিমত প্রকাশ করেন, এই বিচার পূর্ণাঙ্গ হবে না যদি গণহত্যার নীলনকশাকারীরা সে বিচার-প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত না হন। তিনি এ কথাও বলেন, এই বিচার-প্রক্রিয়া যত বিলম্বিত হবে, ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা ততই সুদূরপরাহত হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ স্টাডি গ্রুপের সদস্য এবং এই অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার আরিফ রহমান এই প্রতিবেদককে জানান, ১৯৭১-এর গণহত্যার স্মৃতি যাতে পৃথিবীর মানুষ ভুলে না যায়, সে উদ্দেশ্যেই তাঁরা এই অনুষ্ঠান করেছেন।
অনুষ্ঠানের পূর্ণ বিবরণ এবং বিভিন্ন বক্তার উপস্থিত গবেষণাপত্র বাংলাদেশ স্টাডি গ্রুপের ওয়েবসাইটে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েবসাইটের ঠিকানা: http://www.kean.edu/~bgsg/
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






