সব

কারণ অ্যামোনিয়া গ্যাস নাকি অন্য কিছু?

ধানের পর মাছ ও হাঁস মরছে

উজ্জ্বল মেহেদী ও খলিল রহমান
প্রিন্ট সংস্করণ

হাওরে ধানের পর মাছ, এরপর মরতে শুরু করেছে হাঁস। হাওরবাসীর সারা বছরের জীবিকার সব অবলম্বনই শেষ হতে চলেছে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়। পচা ধান ও মাছের উৎকট গন্ধ হাওর ছাপিয়ে জনবসতি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
গত দুই দিনের বৃষ্টিতেও দূষণের মাত্রা, উৎকট গন্ধ কমছে না। সরকারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচা ধান পচে এই গন্ধ হচ্ছে। আর ধান পচার কারণে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমেছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে মাছ মরে যাচ্ছে।
শুধু কাঁচা ধান পচে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, নাকি অন্য কিছু? উৎসের সন্ধানে গতকাল শুক্রবার সকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল হাওর এলাকায় এসেছে। দিনভর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান হাওর ও খরচার হাওরের পানি, দূষিত হয়ে মারা যাওয়া মাছসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে দলটি। ‘মাদার ফিশারিজ’ হিসেবে সংরক্ষিত টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের পাদদেশে। বিশেষজ্ঞ দল সেখানে কোনো মরা মাছের সন্ধান পায়নি। তবে টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশে ফসলি হাওর হিসেবে পরিচিত তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওর ও খরচার হাওরে পানিদূষণ পাওয়া গেছে। এ দুটো হাওরের ধান পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে পচেছে।
দূষণ ও গন্ধের উৎস মেঘালয়ের ইউরেনিয়াম ও কয়লাখনির বর্জ্য থেকে কি না, এর জবাবে সৈয়দ মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা এখন কোনোভাবেই বলা যাচ্ছে না। আমাদের সংগ্রহ করা নমুনা নিয়ে উচ্চতর পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। তারপর বলা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা মনে করছি, কাঁচা ধান পচে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে দূষণের মাত্রা কমার সম্ভাবনা আছে।’ গতকাল সন্ধ্যায় তাঁর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলটি হাওর এলাকা পরিদর্শন করে সুনামগঞ্জ ছেড়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণায়ও এ রকম কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইউরেনিয়াম দূষণে মাছ মারা গেছে কি না, তা আণবিক শক্তি কমিশন ছাড়া আর কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না। তবে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত যেসব তথ্যপ্রমাণ আছে, তাতে ইউরেনিয়াম দূষণের কোনো লক্ষণ পাইনি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের দ্য শিলং টাইমস খবর ছেপেছে যে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ইউরেনিয়াম ও কয়লাখনি উত্তোলনের কারণে একটি নদীতে মাছ মরে যাচ্ছে। আমি মনে করি, ঢলের সঙ্গে সেই দূষিত পানি এসে হাওর-নদীর পানি দূষিত করছে।’ তাঁর মতে, এভাবে কখনো পানিদূষণ হয়নি কিংবা মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায়নি। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম নওশাদ আলমের মতে, হাওরে এর আগেও অনেকবার বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবেছে। তাই বলে এত ব্যাপক হারে মাছের মড়ক লাগেনি। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। মারাত্মক কোনো বিষক্রিয়া না হলে এভাবে মাছের মড়ক লাগতে পারে না বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে বিএফআরআইয়ের একদল বিশেষজ্ঞ ১১টি হাওরের মাছ ও পানির নমুনা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়া এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়ার কারণে হাওরে মাছ মরছে।
বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা গতকাল শুক্রবার হাওরে মাছের মৃত্যু নিয়ে করা তাঁদের প্রাথমিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছেন। এতে বলা হয়েছে, পানির নমুনাগুলোতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ১ থেকে দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। সাধারণত নিরাপদ মাছ চাষের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে ৫-৮ মিলিগ্রাম থাকার কথা। নমুনায় কয়েকটি জায়গায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি ছিল। ওই পানিতে মাছের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন। টানা কয়েক দিন পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য থাকলে সেখানে মাছের মড়ক লেগে যায়।
বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, গাছের পচনে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়াও মাছের মড়কের অন্যতম কারণ। নমুনায় পানিতে বিষাক্ত অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে দশমিক ৪ থেকে দশমিক ৬ মিলিগ্রাম। সাধারণত পানিতে বিষাক্ত অ্যামোনিয়ামের পরিমাণ প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রামের বেশি থাকলে মাছের জন্য তা অসহনীয়।
পানির উপরিভাগে তামাটে রং
সুনামগঞ্জে ভারী বর্ষণ শুরু হয় গত ২৭ মার্চ থেকে। সেই সঙ্গে সীমান্তের ওপার থেকে নামে ব্যাপক হারে পাহাড়ি ঢল। ঢলের পানিতে ভরে যায় সুনামগঞ্জের ছোট-বড় সব নদী। এরপর সেই ঢলের পানির তোড়ে একের পর এক ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় হাওরের বোরো ধান। চৈত্র মাসে এভাবে অতীতে সুনামগঞ্জে কখনো এত বৃষ্টি ও ঢল নামেনি।
গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার নীলপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, হাওরে পানির উপরিভাগে তামাটে রঙের আস্তরণ পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, পানিতে তেল পড়েছে। পানিতে ভেসে থাকা ধানগাছের ডগায় সেগুলো মিশে আছে।
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের হরিণাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় বেহেলি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুনু মিয়া জানান, ঝড়ের সময় বাতাসে দুর্গন্ধ পান তাঁরা। এতে তাঁর ঘরের দুই শিশু বমি করে দেয়। হাওরে পানি ঢুকে বদ্ধ অবস্থায় ছিল। তাই এত দিন বিষয়টি বোঝা যায়নি। ঝড়ের পরে মাছ মরে ভেসে ওঠায় এখন বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা হাওর উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আগে কখনো এ পরিস্থিতি হয়নি। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না দেখা দরকার। তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরপাড়ের জামলাবাজ গ্রামের জেলে রমিজ উদ্দিন বলেন, মানুষের ধান গেছে, মাছ ও হাঁস মরছে। বসতবাড়িতে যে হারে দুর্গন্ধ, তাতে মনে হয় মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপরিচালক মোহাম্মদ জাহেদুল হক গতকালও বলেছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ধানগাছ পচে পানি দূষিত হওয়ার কারণেই এমন হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রয়োজন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড হাওর অ্যাগ্রিকালচার বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর হোসাইন মিয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রচুর বৃষ্টি হলে দুর্গন্ধ কিছুটা কমবে। তবে আমি আগেও বলেছি, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে পানিদূষণের প্রকৃত কারণ বের করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
দূষিত পানি ব্যবহার এবং আধা মরা মাছ খাওয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, দূষিত পানি ব্যবহারে মানুষের শরীরে নানা চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে যেহেতু এসব মাছ বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে, তাই এগুলো খাওয়া ঠিক হবে না।
হাঁসের মড়ক
সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে ব্যাপক হারে মাছের মড়কের পর এখন শুরু হয়েছে হাঁসের মড়ক। দূষিত পানি ও পচা মাছ খেয়ে মরছে হাঁস। গতকাল কথা হয় ছয়জন হাঁসের খামারির সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নূরপুর গ্রামের আজিজুল ইসলাম জানান, তাঁর ৮০০ হাঁসের মধ্যে ২০০, বুড়িস্থল গ্রামের আবদুল মুমিনের ৯৭০টির মধ্যে ২২০, ভৈষারপাড় গ্রামের কামাল হোসেনের ১ হাজার ১০টির মধ্যে ১৭৯, একই গ্রামের পবন মিয়ার ১২০০ হাঁসের মধ্যে ১৩৫, লালপুর গ্রামের নুরুল আমিনের ১ হাজার ৫০টি হাঁসের মধ্যে ৪৫০ এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার আলী আকবরের ২ হাজার হাঁসের মধ্যে মারা গেছে ৬০০।
প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে হাওর-অধ্যুষিত উপজেলাগুলোর মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পানিতে চুন ছিটালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতো। কিন্তু মানুষের কাছে তো চুন কেনার টাকা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে জেলা মৎস্য বিভাগকে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এই টাকা দিয়ে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরে কিছু চুন ছিটিয়েছেন।
{প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি খলিল রহমান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি শাহীদুজ্জামান}

 

দুই মামলারই সাক্ষ্য থেমে আছে

দুই মামলারই সাক্ষ্য থেমে আছে

default image

নারীদের মধ্যে তামাক ও মাদক সেবন বাড়ছে

default image

শিক্ষা এখন রাজনীতির অংশ

মাঠ নেই, আছে মাদকের সমস্যা

মাঠ নেই, আছে মাদকের সমস্যা

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

বর্জ্যে ভরছে নদ

বর্জ্যে ভরছে নদ

আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে তুরাগ নদে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। এতে ভরাট...
default image

ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি হাজারীবাগের ট্যানারি বন্ধের প্রভাব পড়বে না

বালতিতে কাঁচা চামড়া নিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন শিক্ষার্থীরা। ট্যানারিতে গিয়ে এই...
প্রতিবন্ধী দুই সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন

প্রতিবন্ধী দুই সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন

আবুল হাসেম ও আনোয়ারা বেগম দম্পতির দুই ছেলেমেয়েই আঠারো পেরিয়েছেন। তবে তাঁদের...
default image

আ.লীগের চার সমর্থক হত্যা মামলা আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আওয়ামী লীগের চার সমর্থককে কুপিয়ে...
‘আইপি লগ’ কমপক্ষে এক বছর সংরক্ষণে বিটিআরসির নির্দেশ

সাইবার অপরাধ ‘আইপি লগ’ কমপক্ষে এক বছর সংরক্ষণে বিটিআরসির নির্দেশ

দেশের সব ইন্টারনেট সেবাদানকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানকে ‘আইপি লগ’ কমপক্ষে এক বছর...
বার্নাব্যুর মঞ্চ দখল করে নিলেন মেসি

বার্নাব্যুর মঞ্চ দখল করে নিলেন মেসি

লিগ টেবিলের সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়েই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে...
দুই মামলারই সাক্ষ্য থেমে আছে

রানা প্লাজা ধসের ৪বছর দুই মামলারই সাক্ষ্য থেমে আছে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্পভবন দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের মৃত্যুর বিচার...
হয়ে গেল ইউনিসের ১০ হাজার

হয়ে গেল ইউনিসের ১০ হাজার

চা বিরতির পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোস্টন চেজকে সুইপ করেই মাইলফলকটা ছুঁয়ে ফেললেন...
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info