সংস্কৃতি সংবাদ

আশা, একাত্তর ও অঁদ্রে মালরো

আহমেদ মুনির | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ

নগরের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে ফেইম প্রযোজিত অঁদ্রে মালরোর জীবনভিত্তিক নাটক আশা–এর একটি দৃশ্যকোনো কারণে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসে শেষ না হয়ে আরও প্রলম্বিত হলে হয়তো ভিন্ন এক ইতিহাসই লিখতে হতো। মুক্তি বাহিনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের হয়ে বিশ্বের নানা দেশের মানুষ তখন লড়াইয়ে নামতেন এ দেশের স্বাধীনতার পক্ষে। বাংলাদেশ হয়ে উঠত ১৯৩৬ সালের স্পেন, যেখানে বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষজন লড়াইয়ে নেমেছিলেন ফ্যাসিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে।

 ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফরাসি সাহিত্যিক অঁদ্রে মালরোর এক ঘোষণা এমন সম্ভাবনাই তৈরি করেছিল। সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে একটি ট্যাংক বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন তিনি। এই কথা নিছক আস্ফালন ছিল না। ৭০ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের জন্য কাজও শুরু করেছিলেন তিনি।

গত ২৩ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ভিনদেশি এই বন্ধুর ৪০তম প্রয়াণ দিবস। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস লেস পোয়ার বাংলা অনুবাদ আশা প্রকাশের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে মালরো স্মরণে বছরব্যাপী আয়োজন শুরু হয়েছিল। গত ২৬ নভেম্বর ছিল সেই আয়োজনের সমাপ্তি অনুষ্ঠান। এবারের আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের সময় মালরোর এই ভূমিকার বিষয়টি আরও বিশদভাবে জানা গেল। পাশাপাশি ছিল মালরোর দর্শন, শিল্পভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণী আলোচনা, প্রামাণ্য নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক শামসুল আরেফিনের সভাপতিত্বতে স্বাগত বক্তব্য দেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের পরিচালক রাফায়েল ইয়েগার। সঞ্চালনা করেন লেস পোয়া উপন্যাসের অনুবাদক গুরুপদ চক্রবর্তী।

ব্যক্তির জীবন মানবজাতির ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত, এবং ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইও একসময় অমোঘ হয়ে ওঠে। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিটশের এই দর্শন দ্বারা যে ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন মালরো, আলোচনায় সে বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ।

১৯৭৩ সালে মালরোর বাংলাদেশ সফরের সময় তাঁকে দোভাষী হিসেবে সঙ্গ দিয়েছিলেন অধ্যাপক মাহমুদ শাহ কোরায়ইশি। অায়োজনে প্রদর্শিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে কোরায়ইশির মুখ থেকে সে সময়কারই নানা ঘটনা শোনা গেল। এর মধ্যে ছিল মালরোর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের ঘটনাও। গণহত্যার স্মৃতিধারণ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে মালরো যা বলেছিলেন, তা শুনে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। তাঁর উক্তিটি ছিল এমন, ‘এটা পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে জীবিত ছাত্রের চেয়ে শহীদের সংখ্যা বেশি।’

অসীম দাশ নির্দেশিত ফেইমের প্রামাণ্য নাটক আশা অঁদ্রে মালরোর নানা সময়ের কোলাজ চিত্র। অসাধারণ এই প্রযোজনায় ব্যাক স্ক্রিনে ছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধের চলমান ছবি। মঞ্চে প্রবেশ করা তরুণ-তরুণীরা কখনো হয়ে উঠছিলেন স্পেনের গৃহযুদ্ধে অংশ নেওয়া শ্রমিক, কখনো এ দেশেরই মুক্তিকামী মানুষ। নাটকে নানা চরিত্র চিত্রায়ণের পাশাপাশি মালরোর দর্শন নিয়ে কথা বলেন তাঁরা। তাঁর রচিত নানা বইপত্র নিয়েও আলোচনায় মেতে ওঠেন। স্পেন থেকে ইন্দো–চীন, মাঝে বাংলাদেশ। সর্বত্রই মালরো ও তাঁর মুক্তির বাণী। সেই বাণীর সারসংক্ষেপ হলো, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা জীবনের চেয়েও মূল্যবান।

বাংলাদেশে ফ্রান্সের ডেপুটি হেড অব মিশন ও কালচারাল কাউন্সিলর জাঁ পিয়েরে পঁসে মালরোকে একবাক্যে ‘ফরাসি মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন দর্শকদের সামনে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে মালরোর এর চেয়ে বড় পরিচয় আর কী হতে পারে।

আপনার পছন্দের এলাকার সংবাদ

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আরও সংবাদ

View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইল: info@prothom-alo.info
 
topউপরে