সব

পুরোনো বইয়ের দোকান

ওয়াসি আহমেদ
প্রিন্ট সংস্করণ
রাশি রাশি পুরোনো বই। বইয়ের সে দঙ্গলে কখনো কখনো মিলে যায় গুপ্তধন! দেশ–বিদেশের বিভিন্ন শহরে বিচিত্র পুরোনো বইয়ের সম্ভার নিয়ে টিকে আছে যে দোকানগুলো, বই পড়ুয়ারা বারবার ঢুঁ মারেন সেখানে

নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোতে পাঠকেরা আসেন বিচিত্র বইয়ের সন্ধানে। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিনসত্তরের গোড়ার দিকে যখন কলেজে পড়ি, সবে আগাথা ক্রিস্টিতে মজতে শুরু করেছি, ভরসা বলতে তখন নীলক্ষেতে পুরোনো বইয়ের দোকানি সানোয়ার মিয়া। বয়স চল্লিশের আশপাশে, কালোঘেঁষা তেলতেলে চেহারা, কাঁচা-পাকা চুলে টান টান সিঁথি, গোঁফ ছিল মনে পড়ে, তবে বেশি মনে পড়ে খয়ের-জর্দায় টুকটুকে ঠোঁট-জিব, মুখ খোলামাত্র গনগনে অঙ্গারে লালে লাল উনুন।

শুরুটা হয়েছিল আগাথা ক্রিস্টি দিয়ে। তিন-সাড়ে তিন টাকায় একেকটা বই। বেছে বেছে নিতাম, ভেতরের পাতা উল্টে-পাল্টে, ব্যাক কভার পড়ে। বেশির ভাগ বই-ই বহু ব্যবহৃত, বোঝা যেত, সানোয়ার মিয়ার ডেরায় সেসব আসত নানা হাত ঘুরে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ইংরেজি পেপারব্যাক, বিশেষ করে পেঙ্গুইনের হালকা-পাতলা পকেট বুকের (পকেট বুক কেন বলা হতো বলতে পারব না) অঢেল সমাহার ছিল তাঁর সংগ্রহে। তবে অধিকাংশেরই দুর্বল, জরাজীর্ণ স্বাস্থ্য। ভালো স্বাস্থ্যের যে একেবারেই ছিল না তা নয়, হঠাৎ হঠাৎ প্রায় আনকোরা বইও মিলত। সেসবের দাম খানিকটা চড়া, তবে নিউমার্কেট বা স্টেডিয়াম মার্কেটের তুলনায় কিছু না। তারপরও তিন-সাড়ে তিন টাকা সে আমলে কম নয়। ফলে কিছুদিন যেতে অন্য পথ ধরতে হলো—তা সেই আদ্যিকালের বার্টার সিস্টেম। এইচএসসি ফার্স্ট পার্ট পরীক্ষা শেষ, সুতরাং সেকেন্ড পার্টে দরকার পড়বে না, এমন পাঠ্যবই দিয়ে বেশ কিছুদিন নির্বিঘ্নে চলল বিনিময়ব্যবস্থা। এর ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই সে সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতছাড়া হয়েছে। মনে আছে, আমীর আলীর হিস্ট্রি অব দ্য সারাসিনস দিয়ে পেয়েছিলাম ‘রিডার্স ডাইজেস্টে’র তিন খণ্ডের এনসাইক্লোপিডিয়া, যা আজও আমার বইয়ের তাকে টিকে আছে, ভালো অবস্থায়ই আছে। খুব সম্ভবত পরশুরামের গড্ডলিকা, সাগরময় ঘোষের সম্পাদকের বৈঠক-এর মতো অনন্যসাধারণ বই দুটোও ওভাবে পেয়েছিলাম।
সানোয়ার মিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চোকানো অব্দি অটুট ছিল। আশ্চর্য যা, তাঁর নিজের লেখাপড়ার দৌড় নিশ্চয় স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, কিন্তু বই তিনি ঠিকই চিনতেন। কার জন্য কী বই, তা-ও ভালো বুঝতেন। এমনকি পরিস্থিতি বুঝে সম্ভাব্য ক্রেতাকে ফুসলাতে বিশেষ কোনো বই বা লেখকের ওপর ছোটখাটো বক্তৃতা দিতেও তাঁকে শুনেছি—কানে তা যেমনই লাগুক। পরিষ্কার মনে আছে, একবার আমার সামনে একজনকে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো গছাতে গিয়ে তাঁর বক্তৃতার মাঝপথে রসিক ভদ্রলোক কার্ল মার্ক্সের দেশের বাড়ি নোয়াখালী না কাউখালী জিজ্ঞেস করামাত্র ভুল জায়গায় জ্ঞান ফলানোর লজ্জায়ই হবে, তিনি তাঁর লাল টুকটুকে জিব কেটে হাত জোড় করেছিলেন। ভদ্রলোক যে মাঝেমধ্যে তাঁর কাছ থেকে বই নিয়ে যান, আর তিনি যে একটা কলেজেও পড়ান, সানোয়ার মিয়ার বেমালুম ভুলে যাওয়াই ছিল বিপত্তির কারণ।
আজকের নীলক্ষেতে সানোয়ার মিয়া নেই। সেই নীলক্ষেতও নেই। এখন এটি গাইডবই আর পাইরেটেড বইয়ের আড়ত। সে যা-ই হোক, সেই কৈশোর পেরোনো বয়সে সানোয়ার মিয়ার সুবাদে পুরোনো বইয়ের প্রতি আমার আসক্তির যে শুরু, তা আজও ছেড়ে যায়নি।
মূল ব্যাপার, সস্তায় বই কেনা হলেও এ নেশার অন্য দিকটি হলো বই হাতড়াতে হাতড়াতে আচমকা গুপ্তধনের পেতলের ঘড়ায় হাত ঠেকার মতো এমন কিছুর সন্ধান পেয়ে যাওয়া, যার জন্য কোনো পূর্বপ্রস্তুতি থাকে না। একটি অতি বিরল বই রাসসুন্দরী দাসীর আমার জীবন পেয়েছিলাম আশির দশকে চট্টগ্রাম স্টেশনরোডের ওমর বইঘরে। উনিশ শতকের জমিদারগৃহিণী এ মহিলা জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ৫২ বছর আগে, ১৯০৮ সালে। আশ্চর্য, অনায়াস বর্ণনা, চাপা কৌতুক ও সরল দুঃখের স্মৃতিবেদনায় সেকালের অন্দরমহলের যে ছবি তিনি এঁকেছিলেন, বিশেষত সংসারের জাঁতাকলে আত্মবিলোপকারী নারীর, তাতে এতই আলোড়িত হয়েছিলাম, ভদ্রমহিলার আর কোনো বইপত্র পাওয়া যায় কি না, খুঁজে খুঁজে বিফল হয়ে হতাশ হয়েছিলাম। একইভাবে পেয়েছিলাম লন্ডন থেকে গত শতকের গোড়ার দিকে বেরোনো রবীন্দ্রনাথের সাধনার হার্ডবাইন্ড প্রথম সংস্করণ। তবে যে বইটি হাতে নিয়ে তেমন কিছু মনে না হলেও পরে পড়ে চমকে গিয়েছিলাম, সেটি ছিল এক পাকা সিঁধেল চোরের জবানিতে তার আশ্চর্য কাণ্ডকীর্তির সরল, খেদহীন, এমনকি আন্তরিক বয়ান। বইটির নাম মনে নেই, চোর ওরফে লেখকেরও না। লেখক-নাম বলে যা ছিল, তা নিশ্চয় ছদ্মনাম। অনুলিখিত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এত দিন পরও ছিন্ন মাকড়সার জালের মতো যেটুকু আজও স্মৃতিতে ঝুলে আছে, তাতে আমি নিশ্চিত, চোরের জবানিতে লেখা বইটির নানা কৌতূহলকর ঘটনা বানোয়াট ছিল না।

সস্তায় বই কেনা হলেও এ নেশার অন্য দিকটি হলো বই হাতড়াতে হাতড়াতে আচমকা গুপ্তধনের পেতলের ঘড়ায় হাত ঠেকার মতো এমন কিছুর সন্ধান পেয়ে যাওয়া, যার জন্য কোনো পূর্বপ্রস্তুতি থাকে না

ওমর বইঘর ছিল প্রকৃতই একটা দোকান। চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের উল্টো দিকের ফুটপাত ধরে এগোলে রিয়াজউদ্দিন বাজারে ঢোকার খানিকটা আগে তিন-চারটা খাড়া সিঁড়ির ধাপ ভাঙলেই হাটখোলা তাকের পর তাকজুড়ে বই আর বই। এ দোকানের খোঁজ আমাকে দিয়েছিলেন অগ্রজপ্রতিম সহকর্মী জামিল ওসমান, যিনি আমার চেনাজানার মধ্যে একজন অন্যতম অগ্রসর পাঠকও বটে। চাকরিসূত্রে সে সময় চাটগাঁয়ে থাকি। বন্ধুবান্ধব নেই, আড্ডা নেই, আড্ডার ঝোঁকও নেই। সঙ্গী বা কাজ বলতে পড়া। না-পড়া বই তো বটেই, পড়া বইও নতুন করে পড়ি আর অবাক হয়ে অনুভব করি আগের পাঠপ্রতিক্রিয়া টাল খাচ্ছে, কোথাও কোথাও আমূল বদলে যাচ্ছে। বস্তুতপক্ষে আমার পড়াশোনার শুরু সে সময়ই। পড়তে পড়তে লেখালেখি। আগে লিখতাম কবিতা। এবার গদ্য। সময় পেলেই ওমর বইঘরে ঢুঁ মারা চাই, সপ্তায় কম হলেও একবার। আমার আগ্রহের বই এলে ওরা নিজেরাই খবর দিত। কত বই যে ওখান থেকে জোগাড় করেছিলাম, আবার দেদার একে-ওকে ধার দিয়ে চিরতরে হাতছাড়া করেছিলাম, বলতে পারব না। একটা বইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। ব্রিটিশ-ভারতে ১০ বছর আন্দামানে কাটিয়ে ফেরা এক স্বাধীনতাসংগ্রামীর রোমাঞ্চকর আত্মজীবনী। বইয়ের বা লেখকের নাম মনে নেই। শুধু খুচরো কিছু ঘটনা আজও স্মৃতিতে চকমকি ঠোকে। তবে ওমর বইঘরের একগুচ্ছ অমূল্য বই কীভাবে যেন আজও রয়ে গেছে। দ্য নিউ আমেরিকান লাইব্রেরি থেকে ষাটের মাঝামাঝি প্রকাশিত নিউ ওয়ার্ল্ড রাইটিং নামে প্রতিষ্ঠিত ও সমসাময়িক লেখকদের কবিতা, নাটক, গল্প ও সমালোচনার আটটি সংকলন। কার লেখা না ছিল সংকলনগুলোয়! নাদিম গার্ডিমারের নাম তখন কজনই-বা জানত! বোর্হেসের ‘শেপ অব দ্য সোর্ড’ গল্পটি পড়ে কী খেয়ালে অনুবাদও করেছিলাম, যদিও এটি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে পড়ে না। দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য পাতায় হাসনাত ভাই (আবুল হাসনাত) অবশ্য আগ্রহ নিয়েই ছেপেছিলেন।
পুরোনো বইয়ের দোকানে খুঁজে পাওয়া নিউ ওয়ার্ল্ড রাইটিং সিরিজের কয়েকটি বইদেশের বাইরে বিস্তর পুরোনো বই ঘেঁটেছি মেলবোর্ন, দিল্লি, বার্মিংহাম, শিকাগো ও আয়ওয়ায়। পুরান দিল্লির দরিয়াগঞ্জে সপ্তায় এক দিন (সম্ভবত বৃহস্পতিবার) গোটা রাস্তার দখল নিয়ে পুরোনো বইয়ের যে বিশাল পসরা বসে, সেখানে কিন্তু বই খোঁজায় সুখ নেই। রাস্তায় ঢালাও ছড়ানো এক কিলোমিটার বা আরও বেশি জায়গাজুড়ে এত বইয়ের মধ্যে পছন্দের কিছু একটা খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। কুঁজো হয়ে, কোমর-হাঁটু ভেঙে কতক্ষণ! এ ছাড়া বইপত্রও এলোমেলো, অবিন্যস্ত—ইতিহাসের বইয়ের গায়ে গায়ে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, তন্ত্রসাধনা। আমার কয়েক বছরের দিল্লিবাসে বার কয়েক ঘোরাফেরা করেও সুবিধা করতে পারিনি।
মেলবোর্নে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ফুটপাত লাগোয়া প্রায় গা ঘেঁষে দুটো বাড়ির নিচতলার দুটো ঘরে পুরোনো বইয়ের দোকান। দুটোই আলাদা, নামফলক-টলক নেই, থাকার মধ্যে গোটা গোটা কালো হরফে বাড়ি দুটোর নম্বর। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ঘর দুটো যে বইয়ে ঠাসা বুঝতে ভেতরে, বেশ ভেতরে, দৃষ্টি ছুড়তে হতো। একটার ঢোকার মুখে প্রায়ই দেখতাম এক বৃদ্ধা এক মনে উলের কাঁটার প্যাঁচ কষছেন। বেচাবিক্রিতে মন নেই, পায়ের কাছে লম্বা লেজ ছড়ানো মস্ত কালো বিড়াল। উলের কাঁটা খুঁচিয়ে গেরোর পিঠে গেরোজুড়ে মহিলা যেন কোনো গূঢ় ফন্দি আঁটতে মগ্ন। এমন ভাববার কারণ, তাঁকে ওই অবস্থায় দেখামাত্র আ টেল অব টু সিটিজ-এর মাদাম ডেফার্জের কাল্পনিক অবয়বটা মাথায় নড়েচড়ে উঠত। মনে পড়ে না মহিলার দোকান থেকে কোনো দিন কিছু নিয়েছি। বই নাড়াচাড়ার সময় বিড়ালটা মহিলার পা ছেড়ে পেছন পেছন ঘুরঘুর করত আর মাঝেমধ্যে গাব্দা ঘাড় তুলে এমনভাবে চোখ ঘোরাত, ওটাকে তখন ঠিক বিড়াল মনে হতো না।
পাশের অন্য যে দোকান, সেটাও চালাতেন একজন মহিলা, তিনি মাঝবয়সী। চেহারা দেখে মনে হতো দোকান আলাদা হলেও তাঁরা মা-মেয়ে। দ্বিতীয় দোকানটায় দীর্ঘ সময় বই ঘাঁটাঘাঁটিতে কাটাতাম। মনে আছে, ওখান থেকে ‘এবরোজিন মিথস’-এর কয়েকটা বই নিয়েছিলাম, সেই সঙ্গে ব্রুস চ্যাটউইনের সংলাইনস পেয়ে মার্কার দিয়ে দাগিয়ে সারা রাত ধরে পড়েছিলাম। দৈনিক সংবাদ-এ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাপ্তাহিক কলাম ‘অলস দিনের হাওয়া’য় সংলাইনস সম্পর্কে পড়ে আগেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম।
কৌতূহলকর হলেও সত্য, পাশ্চাত্যে পুরোনো বইয়ের দোকান আগলাতে মহিলাদের প্রাধান্য প্রায় একচেটিয়া। বার্মিংহামে এ রকম এক দোকানের মালকিনকে পেয়েছিলাম, যাঁর ধ্যান-জ্ঞান বলতে ছিল ছবি আঁকা। বিষণ্ন, কিম্ভূত সব ল্যান্ডস্কেপ আঁকায়ই ছিল তাঁর ঝোঁক। দোকানে কে ঢুকছে, বইপত্র নেড়েচেড়ে জ্যাকেটে বা ব্যাগে ঢুকিয়ে চম্পট দিচ্ছে কি না, সেসবে যেন নজর নেই।
এসব পুরোনো বইয়ের দোকানের রহস্যময় একটা অনুষঙ্গ হচ্ছে বিড়াল। কয়লাকালো, দুধসাদা বা অন্য কোনো রংবাহারেরই হোক, বিড়াল একটার দেখা পাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
সে যাক, উন্নত দেশে পুরোনো বইয়ের দোকানের বই নামেই পুরোনো। বড় বড় বুক স্টোরে সদ্য প্রকাশিত বইয়ের জায়গা করে দিতে এসব বই ঠাঁই নেয় তথাকথিত ওল্ড বুকশপে। গ্রাহকের সুবিধা, প্রায় তকতকে বইগুলো পেয়ে যাচ্ছেন নামমাত্র মূল্যে।
বিদেশে কবে কোথায় কী বই কিনেছি, মনে করা কঠিন। উপস্থিতভাবে যে কয়েকটা প্রিয় বইয়ের নাম মনে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে উল্লিখিত চ্যাটউইনের সংলাইনস, রাজাগোপালাচারীর মহাভারত, মিলোরয়েড প্যাভিচের অবিশ্বাস্য উপন্যাস ডিকশনারি অব দ্য খাজার্স, আঁদ্রে জিদের দ্য ইমরটেলিস্ট, ব্রুনো সালজের দ্য স্ট্রিট অব ক্রকোডাইলস, জন লাকারের দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম দ্য কোল্ড ইত্যাদি।
আয়ওয়ার এক পুরোনো বইয়ের দোকানের কথা এখানে না বললেই নয়। আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামের আমন্ত্রণে ২০১৬-তে প্রায় মাস তিনেক ছিলাম ছবি আর কবিতার শহর আয়ওয়াতে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে খোঁজ পেলাম আমার দেখা সেরা পুরোনো বইয়ের দোকানের। নাম: হন্টেড বুকশপ। চারতলা পুরোনো বাড়ি, প্রতি তলায় ঠাসাঠাসি, তবে অত্যন্ত সুবিন্যস্ত বইয়ের ভান্ডার। খোঁজাখুঁজির ঝামেলা নেই, লেখকদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে ছাদ ছুঁই-ছুঁই তাকের পর তাক সাজানো। পুরোনো কে বলবে, সবই যেন সবে বাঁধাইখানা থেকে ওগরানো। দুই-তিন দিন অন্তর যেতাম। বইয়ের বোঝা বেশি হলে ফেরার সময় বিমানে ম্যালা মাশুল গুনতে হবে জেনেও প্রতিবারই অন্তত কিছু না কিছু না নিয়ে বেরোতাম না।
হন্টেড বুকশপ যিনি চালাতেন, তিনিও মহিলা, তবে তরুণী। হাতে রঙের ব্রাশ বা উলের কাঁটার বদলে কিন্ডেল। জিজ্ঞেস করলাম, চারপাশে এত জ্যান্ত বই থাকতে কিন্ডেল? জবাবে রহস্যময় হাসি। দোকানের নামে হন্টেড কথাটা কেন?—এর জবাবে একটা বই দেখালেন, যার নামও হন্টেড বুকশপ। মধ্যষাটে প্রকাশিত বইটার নাকি খুব কদর ছিল। বইটা তাঁর প্রিয়, নামটাও। দোকানের নামকরণের সার্থকতার প্রমাণ দিতে গিয়ে আমাকে বেয়াকুব ভাববার নিশ্চয় কারণ ছিল, গম্ভীর মুখে জানালেন, আটটার মধ্যে বন্ধ করে চলে যাই, রাত বাড়লে তিনতলায়-চারতলায় বড্ড বেশি দাপাদাপি শুরু হয়ে যায়। আমিও গম্ভীর মুখে তাঁর কথা হজম করে সায় দিলাম, তা তো হবেই, সারা দিন মানুষের আনাগোনায় ত্যানাদের বিশ্রাম জোটে না, রাত হলে তাই বইয়ের তাক থেকে বেরিয়ে হাত-পায়ের খিল ছোটান আর কি! তারপরও তরুণীর মুখের মেকি গাম্ভীর্যে ভাঙচুর নেই। বরং মশকরা যে করছেন না, তার প্রমাণ দিতেই যেন কান খাড়া করলেন। সত্যি সত্যি একটা আওয়াজ পেলাম। এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম, খানিকটা পেছনে একটা তাকের চূড়ায় বিকটাকায় বিড়াল। মিশমিশে কালো লোমমোড়া নধর শরীর, চোখ দুটো উজ্জ্বল, ভয়ধরানো—টরমেন্টিং।
পুনশ্চ: ওজনদরে বইপত্র কেনার কথা কি কেউ শুনেছে? আমার জানামতে অন্তত একজন এ কাজটি করতেন। তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। কায়েতটুলির এক চেনা লোকের বাতিল কাগজপত্রের গুদাম থেকে ইলিয়াস ওজনদরে কিনতেন পুঁথি। বাছবিচার নেই, পুঁথি হলেই হলো। কৌতূহলী পাঠক তাঁর এ ঝোঁকের কিছু ছাপ খোয়াবনামা উপন্যাসে পেলে পেতেও পারেন। খোয়াবনামার শ্লোকগুলো তো ইলিয়াসেরই বানানো।

 

সরদারের অপ্রকাশিত দিনলিপি

সরদারের অপ্রকাশিত দিনলিপি

মুখোমুখি কুরোসাওয়া ও মার্কেস

মুখোমুখি কুরোসাওয়া ও মার্কেস

সান্ধ্য মুখোশের চক্করে

সান্ধ্য মুখোশের চক্করে

প্রধান শিল্পীদের ছবি

প্রধান শিল্পীদের ছবি

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

ধন্যবাদ কাশবন

বইপত্র ধন্যবাদ কাশবন

কাশবন: কবি রফিক আজাদ স্মরণসংখ্যা। কাশবন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ও পত্রিকার সম্পাদক...
নির্মলেন্দু গুণ
বইটি প্রত্যেক মা-বাবার জন্য

বইপত্র বইটি প্রত্যেক মা-বাবার জন্য

ডা. আবু সাঈদ শিমুল এমন এক সময়ে বাচ্চা যখন খায় না কিছুই বইটি লিখেছেন, যখন...
আখতার হুসেন
আমি সেই দেশের কবি

কবিতা আমি সেই দেশের কবি

আমি সেই সবুজ দেশের কবি। স্বপ্নের শবদেহ বহন করা ছাড়া কোনো কাজ আমাকে দেয়নি...
জাহিদ হায়দার
default image

সময়

বাতাসের শরীরে পাঁচ হাজার বছর আগের কথা ধুতি পরে দাঁড়িয়ে আছে দশ হাজার বছর পরের...
জব্বার আল নাঈম
চালের দাম বাড়ছে, কষ্টে মানুষ

চালের দাম বাড়ছে, কষ্টে মানুষ

চালের দাম আরেক দফা বেড়েছে। এখন বাজারে গেলে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে দুই থেকে...
রাজীব আহমেদ
সাকিবের অন্য রকম আইপিএল

সাকিবের অন্য রকম আইপিএল

রাতটা ক্লান্তিতে কেটেছে। খেলা শেষে রাত তিনটায় পুনে থেকে ফ্লাইট ছিল। ভোরে...
তারেক মাহমুদ
শুধু উন্নয়ন নয়, উন্নত গণতন্ত্রও অপরিহার্য

বিশ্বের সামনে তিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ডেভিড ক্যামেরন শুধু উন্নয়ন নয়, উন্নত গণতন্ত্রও অপরিহার্য

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ভবিষ্যতে বিশ্বের...
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
default image

তিন সমস্যার চক্রে জনপ্রশাসন

ওএসডি ২৫৭ জন, চুক্তিতে দেড় শতাধিক, তিন পদে ১৪ শ অতিরিক্ত কর্মকর্তা, ওপরের...
মোশতাক আহমেদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info