সব

ভ্রমণ

হহেনহেইম ম্যানশনের তালাশে

মঈনুস সুলতান
প্রিন্ট সংস্করণ

জোহানেসবার্গের আপস্কেল এলাকা—ওয়েস্টক্লিফওয়েস্টক্লিফ বলে জোহানেসবার্গের একটি আপস্কেল এরিয়ার দিকে তাকাই। স্থাপত্যের নিরিখে আলিশান ভিলাগুলো ছায়াচ্ছন্ন হয়ে আছে হরেক কিসিমের গাছপালায়। তাদের ঝুলন্ত ব্যালকনি ছাড়িয়ে আকাশে রীতিমতো রং ছড়াচ্ছে বেগুনি ফুলে ফুলে জাকারান্দার কিছু প্রফুল্ল বিরিক্ষ। আর উৎফুল্ল সুরতের দুই বুয়ার সাহেব পাহাড়ের রিজে দাঁড়িয়ে রিমোট কন্ট্রোলে ওড়াচ্ছেন খেলনা উড়োজাহাজ। তাঁদের কোমরবন্ধে ঝুলছে পিস্তল; তাঁদের দুর্বল মনে করার কোনো কার্যকারণ নেই, যদিও এ দেশে হালফিল কায়েম হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ-রাজ। ফ্লাস্ক খুলে পানীয়তে চুমুক দিয়ে তাঁরা উড়োজাহাজ ডাইভ দিতে দিতে বাজপাখির দৃষ্টিতে দিগন্তের দিকে তাকান।
হাসপাতালের আঙিনায় হোয়াইট সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বিশাল একটি পাঁচ আঙুলঅলা হাতের ভাস্কর্যআমি হহেনহেইম ম্যানশনের তালাশে এদিকে এসেছি। ১৮৯৩ সালে ওয়েস্টক্লিফ শহরতলি যখন গড়ে ওঠে, তখন হিসাব-কিতাব করে পাহাড়ের রিজ অবিকৃত রেখে তার ঢালে তৈরি করা হয়েছে বনেদি মহল্লা এবং ব্যালকনি থেকে পরিষ্কার ভিউ পাওয়ার জন্য টিলা-টক্করের চাঁদিতে নির্মিত হয়েছে ম্যানশনগুলো। জোহানেসবার্গ শহর হিসেবে আফ্রিকার প্রাক্-ঔপনিবেশিক আমলের নগরাদি তথা কায়রো বা তিমবাকতুর তুলনায় অতটা বনেদি নয়। একটি নগরের সম্ভ্রান্ত হওয়ার পেছনে বয়সের যোগসূত্র থাকেই, যা মূলত জোগায় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কায়রো গড়ে ওঠে দশম শতকে ফাতেমি শাসকদের রাজধানী হিসেবে। আর মালি সাম্রাজ্যের মরু শহর তিমবাকতুর দবদবাই যে ট্রেড রুটের কল্যাণে দ্বাদশ শতকে পত্তনের পর থেকে জৌলুশপূর্ণ—বিষয়টি খোদ ইবনে বতুতা তাঁর নথিপত্রে লিখে গেছেন। সে নিরিখে জোহানেসবার্গ ইতিহাসে মশহুর মুরব্বি গোছের নগরগুলোর সামনে নাদান বালকের মতো। নগর হিসেবে এখানে ঘরদুয়ারের বউনি হয় কেবল ১৮৮৬ সালে। তবে অস্বীকার করা যায় না, এর আলগা একটা শ্রী আছে। কায়রো বা তিমবাকতুকে যদি ধ্রুপদি কলাকারের মনোজ্ঞ মূর্ছনার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে জোহানেসবার্গের রূপ হবে অনেকটা পপ সিঙ্গারের মতো। অস্থির, ক্রাইমের দৃষ্টিকোণ থেকে রিস্কি হলেও শিল্পকলার নিরিখে বিকাশ প্রয়াসী—হাঁকে-ডাকে আম-আদমিদের মন মাতানো।
হাঁটতে হাঁটতে পার্কটাউন বলে ওয়েস্টক্লিফের আরেকটি ম্যানশনের সামনে চলে আসি। উঁচু চৌদেয়ালের ওপর শুধু কাঁটাতারই নয়, বসানো আছে সুরার বোতল-ভাঙা রঙিলা কাচ। স্থপতি হিসেবে স্যার হিভার্ট বেইকের নাম এখানে তাম্রলিপিতে উৎকীর্ণ। জরাজীর্ণ পোশাকের তিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রহরী দেউড়িতে দাঁড়িয়ে। এক দারোয়ান বন্দুক কাঁধে খুকখুক করে কাশে বেসামাল হয়ে। বিষণ্ন গোছের এ প্রহরীকে কাশিতে এমন বিপন্ন দেখায় যে আমি ঘুরে তার দিকে তাকাই। ম্যানশনকে এমনভাবে জড়িয়ে আছে ক্লোজ সার্কিট টিভি ও ইলেকট্রনিক সার্ভিলিয়েন্সের বদখত কলকবজা—কোনো কুদরতই নেই আমার মতো আম-আদমির ওখানে পা দেওয়ার।
আমার গন্তব্য হহেনহেইম ম্যানশন। পুরোনো একটি পুস্তকের মানচিত্র ঘেঁটে আমি সামনে বাড়ি। স্কয়ারের পাশ দিয়ে ত্যাড়াবাঁকা হয়ে ছুটছে এলোপাতাড়ি ট্রাফিক। ফিকফিক হেসে তার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে দুহাতে পাঁচটি বল নিয়ে লুফালুফি করছেন এক কৃষ্ণাঙ্গ জাগলার। সাইরেন বাজিয়ে ছুটে যায় অ্যাম্বুলেন্স। পা-হীন বামুন গোছের একজন মানুষ মন্থর হয়ে আসা গাড়িগুলোর ভেতর দিয়ে তার নিম্নাঙ্গ ঘঁষটে আগ বাড়ছেন। তাঁর পিঠে ঝুড়িভরা পলিথিনের ছোট ছোট ব্যাগে এপ্রিকট। লোকজন দিব্যি এঁকেবেঁকে পাড়ি দিচ্ছে সড়ক। বিভ্রান্ত হয়ে আমি আবার মানচিত্র ঘাঁটি। দিক নির্ণয়ে ভুলভাল কিছু হয়নি আমার। এসব কেওয়াজ-কিরবিছের মধ্যে এক কৃষ্ণাঙ্গ প্রস্তরযুগের কুঠারের মতো দেখতে একটি হাতিয়ার নিয়ে কিছুক্ষণ ভক্করছক্কর করেন বটে, তবে কাউকে আক্রমণের খায়েশ তাঁর নেই। শুধু বস্তুটি ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মন্থর হয়ে আসা গাড়ি থামিয়ে ঝোলা থেকে বের করে বিক্রি করেছেন রঙিন ফটোগ্রাফস। আমি তাঁকে নজর করছি দেখে কাছে এসে ছবিটি দেখান তিনি। সিলভার ব্লন্ড চুলের এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবতীর নগ্ন দেহ-হাত-পা ও কোমরে পরানো রুপার শেকল।
স্কয়ারের আরেক দিকে বিকল এক গাড়ির খোলা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে স্যুট পরা এক হিন্দুস্থানি। ভদ্রলোকের কপালে জ্বলজ্বল করছে রক্তচন্দনের টিকা। তাঁর গাড়ির টায়ার ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। আমি জানতে চাই, কোথায় হহেনহেইম ম্যানশন? থাকার তো কথা এখানে? ভদ্রলোক পানের খিল্লি মুখে পুরে তাজ্জব হয়ে জবাব দেন, ‘হহেনহেইম ম্যানশন তো ছিল এখানে অনেক বছর আগে।’ দোতলা ভবনের দিকে নির্দেশ করে তিনি বলেন, ‘বেরাদর, ম্যানশনটি ডিমোলিশ করে ওই জায়গাতে তৈরি হয়েছে জেনারেল হসপিটাল।’ আমি এবার হাসপাতালের দিকে আগাই। প্রত্যাশা করে এসেছিলাম হহেনহেইম নামের এডওর্ডিয়ান স্থাপত্যকেতার বিশাল একটি ইমারতে একটু ঘুরে বেড়াব। তার ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন কামরায় থাকবে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি আদিবাসী উপজাতীয় সংস্কৃতির দ্রব্যসম্ভারের নমুনা। হলকক্ষের ফায়ার প্লেসটিও দেখার আগ্রহ হচ্ছিল। এই ফায়ার প্লেসকে ঘিরে না লেখা হয়েছে শিশুদের জন্য একটি ধ্রুপদি বই জক অব দ্য বুসবেল্ড। ভাবছিলাম, হলকক্ষে বসে খাব পর্যটকদের জন্য আয়োজিত হাই-টি অনুষ্ঠানে এক পেয়ালা চা। আন্দাজ করছিলাম, হাই-টির পর ম্যানশনের হর্স ক্যারেজে চড়ে স্টাইলসে দেখতে বেরোব ওয়েস্টক্লিফের দালান-দুমেলা। এসব ভেবে পিনডাউন শার্টের সঙ্গে ওয়াচকোট পরে ইন্দ্রের নতুন দার মতো খুব জাঁক করে এসেছি। এখন ঘটনা হচ্ছে, আই অ্যাম অল ড্রেসড আপ অ্যান্ড নো হোয়ার টু গো।
হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষমাণ রোগীগেল রাতে ঘুম হচ্ছিল না। তাই পত্রপত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে খুঁজে পাই জোহানেসবার্গ নিয়ে অনেক বছর আগে লেখা পাতা ছেঁড়াখোড়া একটি পর্যটনি পুস্তক। সেটি থেকে হহেনহেইমে যে শ্বেতাঙ্গ এক ডিপেন্ডেবল ট্যুর কোম্পানির ইন্তেজামে ট্যুরিস্টদের জন্য বিকেলবেলা হাই-টির আয়োজন করা হয়, এবং পরে দর্শনীর বিনিময়ে ঘোড়ার গাড়ি চড়িয়ে হ্যারিটেজ দেখানোর বন্দোবস্ত আছে—এসব আবজাব পড়েছিলাম। পুস্তকটির প্রকাশের সন-তারিখ পয়লা পড়া উচিত ছিল। পুরোনো বইপত্র পেলে আমার হুঁশ ঠিক থাকে না, এটা অনেকটা চারিত্র্য-দোষের মতো। ম্যানশনটি লোপাট হয়েছে বলে এত দূর এসে পথভ্রষ্ট লাগে। আমার প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবের গরমিল তো হামেশাই ঘটছে। তার ওপর বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত একটি ম্যানশন বাঁচিয়ে রাখার চেয়েও জোহানেসবার্গে হাসপাতালের প্রয়োজন অনেক বেশি। একটু খারাপ লাগে, ঐতিহ্য হিসেবে ইমারতটি সংরক্ষণ করলে ভালো হতো না? কিন্তু ঐতিহ্য ব্যাপারটি কী? ওয়েস্টক্লিফের বনেদি শ্বেতাঙ্গরা আজ অবধি নিয়ন্ত্রণ করছে জোহনেসবার্গের ডায়মন্ডের খনি। তাদের ম্যানশনগুলো তো গড়ে উঠেছিল কালো মানুষদের প্রাকৃতিক সম্পদ না-হকভাবে অপহরণের নির্যাস দিয়ে। এসব ঐতিহ্য মূলত অপরাধ, এসব জায়গায় চা পানে গাঁটের পয়সা বরবাদ করে ঘোড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে হোয়াইটদের তেজারতিকে জিইয়ে রাখা হবে কৃষ্ণাঙ্গদের লড়াইয়ের প্রতি হারামখোরির শামিল। আমার ভাবনাচিন্তায় বেহদ গরমিল থাকলেও একটি উচিত শিক্ষা হয়, কেতাবি কেতায় তথ্যে সুরসিক না হয়ে পর্যটনে বাস্তবের পদাতিক হওয়াই যে সমীচীন, তা বিলক্ষণ বুঝতে পারি। সুতরাং, হাসপাতালের বাস্তবতা কী তার হদিস পাওয়ার জন্য সরেজমিন করতে আগুয়ান হই।
হাসপাতালের আঙিনায় হোয়াইট সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বিশাল একটি পাঁচ আঙুলঅলা হাতের ভাস্কর্য। করতলে আঁকা এইচআইভি এইডসের প্রতীক। গেট দিয়ে ঢুকে মেডিকেল সাপ্লাই লেখা দুখানা ভারী বুলেটপ্রুফ আর্মার্ড ভ্যান। ওগুলো থেকে বন্দুকধারী সান্ত্রিরা নামাচ্ছে ওষুধের বাক্স। এ ধরনের গাড়ি অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত হয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে টেলার মেশিনে টাকা আনা-নেওয়ার কাজে। তবে কি জোহানেসবার্গে ওষুধপত্র লুট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে? আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে এক হিন্দুস্থানি দাঁড়িয়ে পড়ে জানতে চান, ‘হাউ ইজ ইট?’ ওষুধপত্রের সরবরাহে আর্মার্ড ভ্যানের ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি জবাবে বলেন, ‘ওষুধপত্রের ডাকাতি আজকাল এত বেড়েছে, কাচের শিশি-বোতল ভেঙে তৈরি হচ্ছে গ্লাসবিড, কিছু ড্রাগস আনাড়ি-অনপড় ডাকুরা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করছে, বিশেষত এইচআইভি এইডস শাসনে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয় যে অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগস, লুটে নিতে পারলে তা ব্ল্যাকমার্কেটে বিক্রি করা যায় ডাঁসা দামে। আনগার্ডেডভাবে আর্মার ছাড়া ভ্যানে করে ওষুধপত্র আনা-নেওয়াতে রিস্ক আছে না?’ বলে আমার দিকে তাকান তিনি। ডাকাতেরা আগারে-পাগারে শুদ্রভদ্র না বুঝে ড্রাগসের সিরাম সিরিঞ্জে ভরে ফোঁড়াফুঁড়ি করলে মুসিবত যে হবে, এটা বুঝতে পারি আমিও।
পার্কটাউন ম্যানশনতাঁর কাছে এসে দাঁড়ান এক েপ্রগন্যান্ট তরুণী। মেয়েটি ফরসা, ওর চোখেমুখে সুগার-বেইবি গোছের আবেশ ছড়িয়ে আছে। শরীরে জুঁত পাচ্ছেন না, তাই তিনি কি বসে ছিল বিকল গাড়ির ভেতরে? নমস্কারে সম্ভাষণ জানালে তাঁর চুলে আটকানো সোনালি টিকলির দিকে তাকাই, স্পষ্ট বোঝা যায় বিবাহিত হয়েছেন তিনি সদ্য, সম্প্রতি কি এসেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়? তাঁর রুটস কোথায়, হারিয়ানা নাকি জয়সিলমিরে? নোলক দুলিয়ে তিনি বলেন, ‘গুড ডে টু ইউ।’ উন্নত নাকের এ অলংকারটি আকারে বৃত্তাকার। তাতে দাড়ে বসানো পাথরের টিয়া পাখি—একদম মাইক্রো সাইজের। খেচরের দাড়ের নকশা করা এ রকমের জেওর আমি আগে কখনো চাক্ষুষ করিনি। মেয়েটি উসখুস করলে হিন্দুস্থানি ভদ্রলোক বিদায় নেন ‘ধেয়ান সে পথ চলিয়ে জি’ বলে। আমি দাঁড়িয়ে থাকি। কোথাও যাওয়ার পথ পাইনি বলে ঢুকেছি হাসপাতালে, আর কিসের ধেয়ান করব, ধেয়ান তছনছ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা যে ঘটে গেল!
আমাকে আবার আগ বাড়তে হয়। করিডরে ঘন হয়ে ভাসছে অ্যান্টিসেপটিক লোশনের গন্ধ। পে কাউন্টারে চেক, ক্রেডিট কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে জনা কয়েক রোগী। কাছেই কয়েকটি বেঞ্চ পাতা। তাতে সারি দিয়ে বসা ডাক্তারের দর্শনপ্রার্থী মানুষজন। রোগীদের বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। চেহারা-সুরতে মধ্যবিত্ত। ঠিক মাঝামাঝি বেশ কিছু কালো মানুষের ভেতর স্যান্ডউইচ হয়ে বসে এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতি। বয়সের ভারে জরাগ্রস্ত। আমি তাঁদের দিকে তাকাচ্ছি দেখে গোল রিমলেস ফ্রেমের চশমা পরা বৃদ্ধ মাথা ঝাঁকিয়ে নড করেন। পাশে বসা সম্ভবত তাঁর স্ত্রী, ছাদের দিকে চোখ রেখে শূন্যতায় দেখছেন দিবাস্বপ্ন। করিডর পেরিয়ে যেতে যেতে জ্যাকেট পরা এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সঙ্গে চোখাচোখি হয়। তিনি ‘হাউ ডু ইউ ডু’ বলে এমন হাসিমুখে তাকান যে মনে হয় আমার কল্যাণ কামনা করা তাঁর উপশমের জন্য খুবই জরুরি। পেছনের আঙিনায় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দেখি পরপর তিনটি ট্রলিতে লাশ ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষ্ণাঙ্গ কর্মীরা। বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকতে আঁকতে চলছেন পকেট-বাইবেল হাতে এক শ্বেতাঙ্গ নার্স।
হাসপাতালের ব্যাকইয়ার্ড একসময় ছিল হহেনহেইম ম্যানশনের কেয়ারি করা বাগিচা। এখনো দাঁড়িয়ে আছে বাহারি বিরিক্ষ। গাছের বাঁধানো গোড়ায় দাঁড়িয়ে-বসে, আধশোয়া হয়ে ঘাসে অপেক্ষমাণ মানুষজন। নামমাত্র দর্শনীর বিনিময়ে গরিবগোর্বাদের চিকিৎসার কাউন্টারগুলোর এনট্রেন্স ব্যাকইয়ার্ডে। আমি এইচআইভি এইডস কাউন্টারকে নিশানা করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের আশপাশে ঘুরপাক করি। সম্ভাব্য মৃত্যু-ভাবনায় কাউকে অস্থির মনে হয় না। কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষেরা সেলফোনে কথা বলছেন, ম্যাগাজিনে দেখছেন ফুটবল খেলার রমরমে ছবি। নারীরা মাই দিচ্ছেন শিশুকে, তাঁদের মধ্যে দু-একজন বোধ করি পেশায় রূপজীবা, মেকআপ রিফ্রেশ করতে করতে তাঁরা বিনিময় করছেন পুরুষদের সঙ্গে ইঙ্গিতময় দৃষ্টি। সস্তা খেলনা নিয়ে মেতে আছে বাচ্চারা, স্পষ্টত থেমে থাকেনি সৃষ্টি। তবে বেশ কিছু মানুষ, বয়স্ক তাঁরা, তাঁদের চোখেমুখে থিকথিকে পলিময় কর্দমের মতো জমে আছে ক্লান্তি। আমি কথা বলি টুকটাক কারও কারও সঙ্গে। সাতসকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সূর্যের চড়া আলোয় উত্তপ্ত হয়েছে এ আঙিনা, খাওয়াদাওয়া হয়নি অনেকের, অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগসের সাপ্লাই শেষ হয়ে গেছে ঘণ্টা খানেক আগে, সবাই অপেক্ষায় আছেন আবার কখন বুলেটপ্রুফ আর্মার্ড ভ্যানে করে আরেক দফা চালান আসবে।
টিভি ক্লিনিকের সামনের লাইনটিও ছোট নয়। দেখি, পার্কটাউন ম্যানশনের দারোয়ানও এসে দাঁড়িয়েছেন বন্দুক হাতে। তাঁর কাশিটি খুব জোরদার। কাশতে কাশতে হামানদিস্তা দিয়ে সুপারি কাটার আওয়াজ হয় তাঁর বুকে। বন্দুক মাটিতে জায়গার দখলদারি হিসেবে রেখে একটু সরে থুতু ফেলেন তিনি। সবুজাভ শ্লেষ্মায় চুণি পাথরের তীব্র লাল ছড়ায় চকচকে আভা। একটি পাতা দিয়ে তা ঢেকে দিতে দিতে এত জোরে তিনি হাঁপান যে, মনে হয় তাঁর পাঁজরে ছটফট করছে কীটনাশক খাওয়া পোষা ময়না।
বাইবেল হাতে লাশের ট্রলির পাশে হেঁটে যাওয়া শ্বেতাঙ্গ নার্স এবার মেগাফোন নিয়ে এসে দাঁড়ান অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের ভিড়বাট্টার ভেতর। একটি লাশের কোনো কুটুমখেশ হাজির আছেন কি না, ইংরেজি ও জুলু ভাষায় তা বারবার অ্যানাউন্স করেন তিনি। পাঁচটার পর মরদেহ পাঠিয়ে দেওয়া হবে বেওয়ারিশদের মর্গে, উদ্বিগ্ন মুখে কপাল কুঁচকে অনেক বড় করে ক্রুশ আঁকেন তিনি রোদেলা বাতাসে।
গেট দিয়ে ঢোকেন এক বয়স্ক পাদরি। রোজারি বিডের জপমালা হাতে তিনি এইডস কাউন্টারের দিকে এগোলে অপেক্ষমাণ রোগীদের কেউ কেউ উঠে দাঁড়িয়ে ‘সানিবনানিফাদার’ বলে অভ্যর্থনা জানায় তাঁকে। পেছন পেছন তাঁর নওজোয়ান অনুচর, গাত্রবর্ণে সে কালো, ঠেলে নিয়ে আসে ভারী একটি শপিংকার্ট, তাতে বোঝাই দেওয়া মিষ্টি বনরুটি ও পানির বোতল। পাদরির হাসিটি অনেক দিন পর বাড়িফেরা আত্মীয়ের মতো, খুব কাছের। অনুচর খাবার বিতরণ করলে পাদরিও হেঁটে হেঁটে সবার হাতে তুলে দেন ছোট্ট একটি চকলেট বার। শপিংকার্ট আমার কাছাকাছি হলে আমি বনরুটি নিতে চাই না। পাদরি এগিয়ে এসে বলেন, স্টকে জলের বোতল অনেক আছে, নাও একটি, এই গরমে বেশি করে পান করতে হয় পানি। তাঁর সঙ্গে কথা হয় টুকটাক। কিছু রোগী তাঁর পরিচিত। যে চার্চে তিনি ধর্মযাজক—সেখানে উপাসনা করে তারা। ব্ল্যাক মার্কেট থেকে অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ কেনার কিমত নেই এদের।
সরে এসে দাঁড়াই ম্যানশনের সুরকি বিছানো টেনিস কোর্টে। ওখান থেকে ওয়েস্টক্লিফের ভিলাগুলো দৃশ্যমান হয় আংশিকভাবে। ঝুলন্ত ব্যালকনির দিকে তাকালে মনে হয়, লাক্সারি ক্রুজের এক জাহাজ বিলাতের লিভারপুল থেকে ভেসে এসে নোঙর করেছে আফ্রিকান কোস্টে। দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক বল্গা কালোদের হাতে এলেও অর্থনৈতিক সম্পদের মণিরত্নঅলা ভালো সব অলংকারাদি এখনো থেকে গেছে শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের সিন্দুকে। হাসপাতালের আঙিনায় রোদে অরক্ষিত কৃষ্ণাঙ্গ রোগীদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আমি ভাবি, আর কত যুগ এ ম্যানশনগুলোর ধনদৌলত সুরক্ষিত থাকবে ইলেকট্রনিক সার্ভিলিয়েন্সের হেফাজতে?

 

সরদারের অপ্রকাশিত দিনলিপি

সরদারের অপ্রকাশিত দিনলিপি

মুখোমুখি কুরোসাওয়া ও মার্কেস

মুখোমুখি কুরোসাওয়া ও মার্কেস

সান্ধ্য মুখোশের চক্করে

সান্ধ্য মুখোশের চক্করে

প্রধান শিল্পীদের ছবি

প্রধান শিল্পীদের ছবি

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

ধন্যবাদ কাশবন

বইপত্র ধন্যবাদ কাশবন

কাশবন: কবি রফিক আজাদ স্মরণসংখ্যা। কাশবন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ও পত্রিকার সম্পাদক...
নির্মলেন্দু গুণ
বইটি প্রত্যেক মা-বাবার জন্য

বইপত্র বইটি প্রত্যেক মা-বাবার জন্য

ডা. আবু সাঈদ শিমুল এমন এক সময়ে বাচ্চা যখন খায় না কিছুই বইটি লিখেছেন, যখন...
আখতার হুসেন
আমি সেই দেশের কবি

কবিতা আমি সেই দেশের কবি

আমি সেই সবুজ দেশের কবি। স্বপ্নের শবদেহ বহন করা ছাড়া কোনো কাজ আমাকে দেয়নি...
জাহিদ হায়দার
default image

সময়

বাতাসের শরীরে পাঁচ হাজার বছর আগের কথা ধুতি পরে দাঁড়িয়ে আছে দশ হাজার বছর পরের...
জব্বার আল নাঈম
চালের দাম বাড়ছে, কষ্টে মানুষ

চালের দাম বাড়ছে, কষ্টে মানুষ

চালের দাম আরেক দফা বেড়েছে। এখন বাজারে গেলে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে দুই থেকে...
রাজীব আহমেদ
সাকিবের অন্য রকম আইপিএল

সাকিবের অন্য রকম আইপিএল

রাতটা ক্লান্তিতে কেটেছে। খেলা শেষে রাত তিনটায় পুনে থেকে ফ্লাইট ছিল। ভোরে...
তারেক মাহমুদ
শুধু উন্নয়ন নয়, উন্নত গণতন্ত্রও অপরিহার্য

বিশ্বের সামনে তিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ডেভিড ক্যামেরন শুধু উন্নয়ন নয়, উন্নত গণতন্ত্রও অপরিহার্য

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ভবিষ্যতে বিশ্বের...
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
default image

তিন সমস্যার চক্রে জনপ্রশাসন

ওএসডি ২৫৭ জন, চুক্তিতে দেড় শতাধিক, তিন পদে ১৪ শ অতিরিক্ত কর্মকর্তা, ওপরের...
মোশতাক আহমেদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info