শিরোনাম:



শিক্ষা

বিরাট জনগোষ্ঠীর বিবর্ণ শিক্ষাচিত্র

শরিফুজ্জামান

দেশে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, নামের মোহ এবং দুর্নীতি। সব মিলিয়ে শিক্ষাচিত্রটা বিবর্ণ। এসব নিয়ে প্রচ্ছদের প্রতিবেদনগুলো তৈরি করেছেন শরিফুজ্জামান

দেশে স্কুল-কলেজের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত এ সংখ্যা বেড়েই চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। কিন্তু বাড়ছে না লেখাপড়ার মান। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু ওই চিত্র মূলত রাজধানী বা বড় কয়েকটি শহরকেন্দ্রিক। এর বাইরে বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষাচিত্র বিবর্ণ, হতাশাব্যঞ্জক।
দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেয় সরকার। চাহিদা যাচাই না করে দেশজুড়ে অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় সরকারি তহবিলের একটি বড় অংশ অপচয় হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে, দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশ ছাত্র। এই হিসাবে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় তিন কোটি ৩৩ লাখ। এদের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে প্রায় তিন কোটি শিক্ষার্থী। চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরে শিক্ষা বাজেটের অনুন্নয়ন খাতের ৬২ শতাংশ বা তিন হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হচ্ছে। তাই দেশের বেসরকারি শিক্ষার হালচাল নিয়েই এই অনুসন্ধান।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০১ সালে অপ্রয়োজনীয় এবং নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, এমপিওভুক্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুর্বল ও নিম্নমানের। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণ করার আগেই সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে নতুন করে এমপিও দেওয়া বন্ধ রাখে জোট সরকার। এর কারণ সম্পর্কে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুক বলেন, একেকজন সাংসদ ৫০ থেকে ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সুপারিশ করেন। চাপ সামলানো সম্ভব নয় বলে এমপিওভুক্তি বন্ধ রাখতে হয়।
২০০৩ সালের ৪ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সম্পাদক মাহবুবুল আলমকে আহ্বায়ক করে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ২০০৬ সালের জুন মাসে প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, ‘১৯৯৫ সালে এমপিও দেওয়ার পরিমাণ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়। এর ফলে যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে অনুসরণীয় নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে বহিঃচাপ, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এতে সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ বহুগুণে বেড়েছে।’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে সুষম বণ্টনব্যবস্থা থাকা দরকার বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ রাখা হয়েছে।
২০০৯ সালে এসে বতর্মান সরকারও অপ্রয়োজনীয় ও দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে। । শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ইতিমধ্যে রাজশাহী বিভাগে এই কাজ শেষ হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
নীতিমালা মানা হয় না: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) পরিচালিত জাতীয় শিক্ষা জরিপ অনুযায়ী (মে, ২০০৯) দেশে এখন এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৯৯১টি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকাশিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যালোচনা প্রতিবেদনের (জুন, ২০০৬) পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বেতনের সরকারি অংশ (এমপিও) পাওয়া কমপক্ষে পাঁচ হাজার ৫৯০টি বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাস্থাপনের ক্ষেত্রে ওই নীতি মানা হয়নি।
ওই প্রতিবেদন বলছে, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় প্রয়োজনের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। এ ছাড়া ৬২ জেলার ২৭২টি উপজেলায় নীতমালা লঙ্ঘন করে মাধ্যমিক স্কুল তৈরি করা হয়েছে। মোট ২০৭টি উপজেলায় রয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কলেজ। এ ছাড়া ১৯৪টি উপজেলায় আছে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি মাদ্রাসা। অন্যদিকে নীতিমালা অনুযায়ী প্রাপ্যতা থাকলেও ২২টি উপজেলায় প্রয়োজনীয় স্কুল, ১০৭টি উপজেলায় প্রাপ্য কলেজ এবং ২৬টি উপজেলায় চাহিদামাফিক মাদ্রাসা নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলছিলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই, সেখানে আধিক্য আছে। আবার যেসব এলাকায় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন সেখানে গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়টি ছাত্র ও শিক্ষকসংখ্যার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি আরও বলেন, দেশে বহু বছর আগে স্কুল ম্যাপিং হয়েছিল। এরপর আর এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই আসলে কত সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেই। এ সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক, ছাত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণে একটি জাতীয় জরিপ করে অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আতিকুর রহমান বলেন, নীতিমালায় কিছু অস্পষ্টতাও রয়েছে। বলা হচ্ছে, ১০ হাজার জনসংখ্যার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের তিন ধরণের প্রতিষ্ঠান হতে পারে। দেখা গেছে, ১০ হাজার জনসংখ্যার জন্য আইনের ফাঁক দিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি করে বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দাখিল মাদ্রাসা স্থাপন হয়ে গেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক: নবম জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিষয়ে অসংগতি চিহ্নিত করতে সাংসদ মো. শাহ আলমের নেতৃত্বে একটি সাব-কমিটি গঠন করে। গত ২২ জুন ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সুষম নীতি অনুসরণ না করে কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও এমপিওভুক্তি হয়েছে।
শিক্ষানগর নামে পরিচিত রাজশাহী। নগরসহ জেলা জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। জেলায় প্রাপ্যতা অনুযায়ী ৩৫টি কলেজ থাকার কথা। সেখানে গড়ে উঠেছে ১৫৬টি কলেজ। এর মধ্যে মহানগরেই গড়ে ওঠা কলেজের সংখ্যা ৩২।
রাজশাহী জেলায় রাজনৈতিক প্রভাবে কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, এর প্রমাণ পাশাপাশি পাঁচ গ্রামে ছয়টি কলেজ স্থাপনের ঘটনা। জেলার দাউদকান্দি, তেজপাড়া, ভেড়াপোড়া, কালুপাড়া, ধোপাঘাটা ও কোরিসা গ্রাম মিলিয়ে বড়জোর দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে ছয়টি কলেজ। পাশাপাশি এই পাঁচটি গ্রাম পড়েছে রাজশাহীর দুর্গাপুর, মোহনপুর ও পবা উপজেলায়। এই তিনটি আবার পৃথক সংসদীয় এলাকা। এ জন্য সাংসদদের সুপারিশে দূরত্ব ও জনসংখ্যার শর্ত শিথিল করে পাঁচ গ্রামে ছয়টি কলেজ স্থাপন করা হয়েছে।
ভেড়ামারা আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম বলেন তখন স্থানীয়সাংসদ আনুষ্ঠানিক পত্রের মাধ্যমে দূরত্ব বিষয়ে বিদ্যমান শর্ত শিথিল করার অনুরোধ করেছিলেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, এই এলাকায় এতগুলো কলেজ বানানো গেলেও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তো আর বাড়ানো যায় না। ছাত্রছাত্রী সংগ্রহের জন্য শিক্ষকেরা তাই বাড়ি বাড়ি যান। উপহারসামগ্রী নিয়ে হাজির হন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গত জুন মাসে রাজশাহীর ২০৪১টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পরিদর্শন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তাহমিনা বেগমের নেতৃত্বে ২৪টি গ্রুপ এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে। এ সময় তারা ৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ দেখতে পায়। এসএসসি, দাখিল এবং এসএসসি কারিগরি পরীক্ষায় শূন্য ভাগ পাস করা ৭২টি প্রতিষ্ঠান তারা পরিদর্শন করে। পরিদর্শক দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শনে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্তির শর্ত পালন করা হচ্ছে না বলে দেখা গেছে।
দিনাজপুরে প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ২০০। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১৮০০। এ ছাড়া অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৪০০। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাপ্যতার তুলনায় ওই জেলায় মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় তিন গুণ।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুল আলম বলেন, জেলায় এমন বিদ্যালয় আছে যেখানে বোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নেয় তিনজন, পাস করে একজন। দিনাজপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. ছফর আলী প্রথম আলোকে বলেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চলছে না, সেগুলো বন্ধ করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া উচিত।
প্রদীপের নিচেই অন্ধকার: রাজশাহীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অস্বাভাবিক হলেও ঢাকা শহরে এই সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম। ২০০৩ সালে জনসংখ্যা হিসাব করে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরে আরও ৬৫৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা উচিত। এর মধ্যে ৩৭৪টি বিদ্যালয়, ২৭৪টি মাদ্রাসা এবং আটটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ আছে। গত পাঁচ বছরে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে, এখন রাজধানীতে বসবাস করে প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। এই হিসাবে কত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন তার হিসাব শিক্ষাবিভাগের কাছেও নেই।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ২০০৩ সালের তুলনায় জনসংখ্যা বেড়েছে। তখনই ঢাকা শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি ছিল। এখন তা প্রকট হয়েছে। তিনি আরও বলেন, একটি মহাপরিকল্পনা ছাড়া শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া ঠিক হবে না। তা ছাড়া এলাকাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার বিকল্প নেই।
সরকারি হিসাবে ঢাকা জেলায় ৫৮৫টি মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল থাকলেও দিনাজপুর জেলায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ৬৮৭টি। ঢাকার চেয়ে দিনাজপুর জেলায় ১০২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেশি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ ঢাকা জেরায় জনসংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ, দিনাজপুরে এই সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ।
শিক্ষা বিভাগের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, গত তিন দশকে সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার দিক থেকে ঢাকা শহর পিছিয়ে আছে। এর মূল কারণ হিসেবে জমির দুষ্প্রাপ্যতা। ১৯৯৯ সালে সরকারি উদ্যোগে রাজধানীতে ১১টি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে তিনটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। বাদবাকিগুলো চলে গেছে ঢাকার বাইরে। বিদ্যালয়ের জমির মূল্য বাবদ যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, এর পরিমাণ যথেষ্ট ছিল না।
ঢাকা শহরে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর মানেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। মহানগরে সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে ২৪টি। সব কটি সরকারি খরচে পরিচালিত হয়। শিক্ষকদের মানও কাছাকাছি। কিন্তু ঢাকা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে প্রথম শ্রেণীর একটি আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করে ১৪ থেকে ১৫ জন শিশু। মোহাম্মদপুর, মতিঝিল ও ধানমন্ডি এলাকার সরকারি বিদ্যালয়েও প্রতি আসনের জন্য ১০-১২ জন শিশু প্রতিযোগিতা করে। আর নবাবপুর, নিউ গভর্নমেন্ট স্কুল, ইসলামিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও মুসলিম হাইস্কুলে যত আসন তত শিক্ষার্থীও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক মো. ফরিদ উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের সুনাম আছে, সেই প্রতিষ্ঠানের দিকেই অভিভাবকেরা ঝোঁকেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তি করার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের অবস্থান, শিক্ষার পরিবেশ ও অভিভাবকের সচেতনতা বড় বিষয়।
প্রাথমিকে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতে ভারসাম্য নেই: রাজধানীর বেশির ভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষক অনুপাতে বড় ধরনের তারতম্য রয়েছে। বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদারটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাড্ডার ভোলা সরকারি বিদ্যালয়, এরশাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মান্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষার্থী বেশি। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাড়তি শিক্ষার্থী নিয়ে এসব বিদ্যালয় চললেও আরও অনেকেই এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়; কিন্তু সবাইকে সুযোগ দেওয়া যায় না।
সরকারি হিসাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত এখন ১:৫০। এই অনুপাত কমিয়ে ১:৪৬ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। ২০০৩ সালের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকে প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য ৪০ শিক্ষার্থী থাকা মানসম্মত। অন্যদিকে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে এই অনুপাত ১:৩০-এ নেমে আসা উচিত। খসড়া জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ৬৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু এবং প্রাথমিক শিক্ষার স্তর বিন্যাসের ফলে অবকাঠামো নির্মান ও শিক্ষক নিয়োগ খাতে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাব মতে, দেশের ৪৮ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালিত হয় সরকারি উদ্যোগে। বেসরকারি ও দাতা সংস্থাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে পরিচালিত হয় বাকি ৫২ ভাগ প্রতিষ্ঠান।
উল্লেখ্য, দেশে সরকারিসহ ১১ ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৮ হাজার ৩৬৩টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন প্রায় সোয়া তিন লাখ এবং শিক্ষার্থী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভারসাম্যহীনতা অস্বাভাবিক: মাধ্যমিক স্তর ও কলেজে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের অবস্থা আরও খারাপ। সরকারি হিসাবে, দেশের ৪০ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক অনুপাতে ছাত্র কম, বাকি ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক অনুপাতে ছাত্র বেশি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮ হাজার ৭৭০, কলেজের সংখ্যা তিন হাজার ২৫৫টি।
২০০৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হওয়ায় গোপালগঞ্জের সাতপাড় হেমলতা আদর্শ গার্লস হাইস্কুল শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান পেয়েছে। টাঙ্গাইলের গোপালপুর শিমলা জমিরুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল থেকে তিনজন, মাদারীপুরের শিবচর আব্দুস সাত্তার ইবনে হালিমা সিরাজ গার্লস একাডেমি থেকে ছয়জন, টাঙ্গাইলের ধোপকান্দি গার্লস হাইস্কুলের নয়জন শিক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। শতভাগের তালিকায় স্থান পেলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেখানকার লেখাপড়া, শিক্ষকসহ সামগ্রিক অবস্থা ভালো নয়।
গত ২৯ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ডিগ্রি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, একজন পরীক্ষার্থীও পাস না করা কলেজের সংখ্যা ১৭টি। গত ২৬ মে প্রকাশিত মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৭২টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০০৪ সালে ওই সংখ্যা ছিল ৫৪৮। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, শিক্ষকের বেতন বন্ধ, এমপিও বাতিল, কারণ দর্শানোসহ বিভিন্ন কারণে শূন্যভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমছে।
মাদ্রাসায় নয় শতাংশ শিক্ষার্থী: দেশের মোট শিক্ষার্থীর নয় শতাংশ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মাদ্রাসাশিক্ষা আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও এর পাঠ্যবই, পাঠক্রম, পরীক্ষাসহ সবকিছুই পশ্চাত্পদ ধারায় চলছে। ফলে এই স্তরের বিপুল শিক্ষার্থী সমাজের মূল স্রোতধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। ২০০৯ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৯.১১ শতাংশ এবং মাদ্রাসা বোর্ডে ওই হার ছিল ৮৫.৮৫। এর কারণ জানতে চাইলে বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. ইউসুফ বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ১০০ নম্বরের ইংরেজি পরীক্ষা দেয়, সাধারণ ধারায় ২০০ নম্বরের ইংরেজি পরীক্ষা দিতে হয়। এছাড়া মাদ্রাসার প্রশ্ন কিছুটা গতানুগতিক হয়। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে মাদ্রাসায় ২০০ নম্বরের ইংরেজি চালু করা হয়েছে। এছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমানে আনতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।
দেশে মোট নয় হাজার ৩৭৬টি সাধারণ মাদ্রাসা রয়েছে (কওমি বাদে)। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান বলছে, রাজশাহী বিভাগে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা তিন হাজার ৮৯টি দাখিল মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ওই বিভাগের জেলাগুলোতে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বেশি। ওই সব জেলায় শিক্ষার হারও তুলনামূলক কম। সারা দেশের মধ্যে মাদ্রাসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ জেলায়, ৩৯২টি। চট্টগ্রামে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর সংখ্যা শিক্ষার অন্যান্য স্তরের তুলনায় বেশি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাবে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ২০০১—২০০৫ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২২.২২ শতাংশ এবং ওই সময়ে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯.৭৪ শতাংশ। তার আগে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে (১৯৯৬—২০০১) সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছিল ২৮ শতাংশ এবং মাদ্রাসা বেড়েছিল ১৭ শতাংশ।
উল্লেখ্য, দেশে কওমি মাদ্রাসা রয়েছে ১৫ হাজার ২৫০টি। এগুলোর ওপর সরকার বা শিক্ষা বিভাগের কোনো নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ নেই।
অবহেলায় কারিগরি শিক্ষা: দেশে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শিক্ষার এই ধারায় বস্ত্র, কৃষি, কম্পিউটার, গ্রাফিক আর্টস, গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকস, মেরিন টেকনোলজিসহ ২৫ ধরনের কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এ মুহূর্তে দেশের মাত্র ৪০ শতাংশ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত। অথচ মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত হয়েছে ৮০ শতাংশ।
নবম জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির গঠন করা সাব-কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যবই আধুনিক নয়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ অপ্রতুল। সর্বোপরি, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় কম। এ প্রসঙ্গে কমিটি আরও বলেছে, ২০০৮ সালে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে মোট বরাদ্দের শতকরা মাত্র ১.৮৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে কারিগরি শিক্ষা খাতে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে অনাদর-অবহেলার জায়গা থেকে বের করে আনার চেষ্টা চলছে। যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না, তাদের দক্ষ মানবশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।
ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক: সরকারি হিসাবে, এখন পর্যন্ত ১০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসে না। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। প্রথম শ্রেণীতে যারা ভর্তি হয় তাদের শতকরা ২০ জন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। শিক্ষাবোর্ডগুলোর কম্পিউটার কেন্দ্রগুলোর হিসাবে, গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, নবম শ্রেণীতে নিবন্ধন করা ছাত্রছাত্রীদের ৪২ থেকে ৪৬ শতাংশ এসএসসি পরীক্ষার আগেই ঝরে যায়।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, শিক্ষার সব স্তরে ঝরে পড়ার বড় কারণ দরিদ্রতা। এ ছাড়া সামাজিক বিভিন্ন কারণ ও সুযোগের অভাব রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, রাতারাতি এ অবস্থায় পরিবর্তন আসবে না। তবে সরকার দরিদ্র এলাকায় টিফিন দেওয়া, হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল এবং অনগ্রসর এলাকায় শতভাগ বৃত্তি দেওয়াসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (১৯৭০—২০০৮): সরকারি হিসাবে, ১৯৭০ সালে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল সাত হাজার ৫২৩টি। এই সংখ্যা ২০০৮ সালে হয়েছে ৩১ হাজার ৪০১টি। তবে সারা দেশের গড় হিসাবে চার গুণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও দেশের কিছু এলাকায় এই সংখ্যা বহু গুণে বেড়েছে।
চার গুণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও শিক্ষার্থী বেড়েছে ১৯৭০ সালের তুলনায় পাঁচ গুণ। ১৯৭০ সালে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩৫১ জন। গত ৩৮ বছরে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে এক কোটি ৭৭ লাখ তিন হাজার ৫৮৫ জন।
অন্যদিকে শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে ছয় গুণ। ১৯৭০ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংখ্যা ছিল ৭৪ হাজার ৮৯৫ জন। ২০০৮ সালে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ছিল চার লাখ ২৬ হাজার ৭৯১ জন।
দায়দায়িত্ব কার, কতটুকু: অপরিকল্পিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, এর স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকেন জনপ্রতিনিধি বা শিক্ষা কর্মকর্তা। এদের কারও বিরুদ্ধে, কখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির গঠন করা সাব-কমিটির প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়েছে, এমপিও-সংক্রান্ত দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, আগে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা বাঞ্ছনীয়।
প্রবীণ তিন শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ এম এ আউয়াল সিদ্দিকী, অধ্যক্ষ মাজহারুল হান্নান এবং এম এ বারী পৃথক শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাঁদের অভিন্ন বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষায় আজকের সংকটের মূল কারণ রাজনৈতিক প্রভাবে অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তাঁরা ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির দাবি জানান। এর পাশাপাশি কারা, কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার পেছনে কাজ করেছে, তা খুঁজে দেখার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেন।
প্রচলিত নিয়মে একবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে তা সাধারণত বাতিল হয় না। এতে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি কমতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বাজেট বক্তৃতায় প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়া বরাদ্দ লেখাপড়ার পরিবেশ, পাসের হার প্রভৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কথা বলেন।
শেষ কথা: এই মুহুর্তে শিক্ষার অনুন্নয়ন বাজেটের ৬২ শতাংশ খরচ হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা খাতে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে শিক্ষার রাজস্ব বাজেটের বাকি ৩৮ শতাংশও ধীরে ধীরে বেতন-ভাতা খাতে চলে যাবে, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাবিদ, শিক্ষকসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কেউই মনে করছেন না, ঢাকা শহরের বাইরে আর নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে। এ প্রসঙ্গে সবার অভিন্ন মত হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে আগে জরিপ করে কোথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা উচিত। এ ছাড়া প্রয়োজন না থাকলেও গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ বা পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হোক।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার লক্ষ্যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর আশা, আর কোনো অযোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে না। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার সামনে এই আশা কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
২৭ বছরে অপচয় ৩৫৬ কোটি টাকা
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গত ২৭ বছরে ৩৫৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা অপচয় করেছে। ১৯৮১-৮২ সালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) প্রতিষ্ঠার পর এই বিপুল আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সম্প্রতি এক তদন্তে দেখা গেছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১৬ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ভুয়া শিক্ষকের নামে টাকা উত্তোলন, নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, সরকারের আর্থিক বিধি না মেনে অর্থ খরচ, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও উচ্চতর স্কেল দেওয়া, ভুয়া শিক্ষার্থী ও শাখা দেখিয়ে শিক্ষকের নামে টাকা উত্তোলন প্রভৃতি।
জানা যায়, ১৯৮১-৮২ সালে ডিআইএ দেশের ১৬১০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রায় ১১ লাখ টাকার অনিয়ম খুঁজে পায়। সর্বশেষ ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৮১০টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রায় ৫৪ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া যায়।

একনজরে দেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
প্রতিষ্ঠানের ধরন সংখ্যা শিক্ষার্থী শিক্ষক শিক্ষক: শিক্ষার্থী
প্রাথমিক বিদ্যালয় (১১ ধরন) ৭৮৩৬৩ ১৭৫৬১৮২৮ ৩১৫০৫৫ ১: ৫০ (মূল ধারা)
মাধ্যমিক স্কুল ১৮৭৭০ ৬৮৪০৫৪১ ২১১৬৪৯ ১: ৩২
কলেজ ৩২৫৫ ১৯৪৮৪১৮ ৮৭১৩৬ ১: ২২
মাদ্রাসা ৯৩৭৬ ১৯৮৪৬২৬ ১২৮০০৫ ১: ১৬
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩৫৯০ ৪৫১৮১৭ ২১৬৬৬ ১: ২০
মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১১৩৩৫৪ ২৮৭৮৭২৩০ ৭৬৩৫১১ ...
তথ্যসূত্র: জাতীয় শিক্ষা জরিপ (পোস্ট-প্রাইমারি), মে ২০০৯ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত ২০০৫ সালের তথ্য, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন, ২০০৭
দেশের স্নাতক (সম্মান), চিকিত্সা, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষা দেয়—এমন ৩৭০টি উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাবি অনুযায়ী দেশে এ ধরনের মাদ্রাসা ১৫,২৫০; শিক্ষার্থী ১৮,৫৭,৫০০ ও শিক্ষক ১,৩২,১৫০ জন। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০, শিক্ষকসংখ্যা ৩,২০,০০০ এবং শিক্ষার্থী প্রায় এক কোটি।

এমপিও ফেরত দিয়েছে কয়েকটি কলেজ
দেশের প্রায় সাত হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করছে। এর পাশাপাশি রাজধানীর নটর ডেম কলেজ, সেন্ট্রাল রোডে আইডিয়াল কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমপিও ফেরত দিয়েছে। রাজধানীর শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ এমপিও ফেরত দিতে চাইলেও কিছু শিক্ষক আইনের আশ্রয় নেওয়ায় বিষয়টি আটকে গেছে।
নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকায় চলতে পারায় আমরা অনুদান নেওয়া বন্ধ করেছি। আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ শামসুল আলম বলেন, দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো অর্থের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। আমরা সরকারি অনুদানের অর্থ না নিলে সরকার তা সুবিধাবঞ্চিত এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে খরচ করতে পারবে। ঢাকা সিটি কলেজ ১৯৯৪ সালে সরকারের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মিরপুর ঢাকা কমার্স কলেজ ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এমপিওভুক্তির আবেদন করেনি।
pintu.dhaka@gmail.com

সাক্ষাত্কারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ

গতানুগতিক ধারায় শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়

সাক্ষাত্কার নিয়েছেন: শরিফুজ্জামান

প্রথম আলো: গত ১০ মাসে শিক্ষা নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা ও ভাবনার কথা বলুন।
নুরুল ইসলাম নাহিদ: এই সময়ের মধ্যে একটি উপলব্ধি এসেছে যে, গতানুগতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন করা যাবে না। বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে গুণগত শিক্ষার পাশাপাশি জীবনসমৃদ্ধ শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষায় বরাদ্দ যেটুকু আছে, তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। এ ছাড়া অনিয়ম-দুর্নীতি কমাতে হবে। আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এটা কঠিন কাজ। তবে দুর্নীতি কমানো কঠিন হলেও অসাধ্য কোনো বিষয় নয়।
প্রথম আলো: কয়েক মাস আগে আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে?
নুরুল ইসলাম: শিক্ষার বিভিন্ন কার্যালয়ে বিভিন্ন কাজে আর্থিক লেনদেনের খবর বেশ পুরোনো। আমি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছি, মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজের জন্য কাউকে একটি টাকাও দিতে হবে না। প্রত্যাশিত কাজটি বিধিসম্মত হলে নিয়মনীতির মধ্যে তা এমনিতেই সম্পাদিত হবে। অনেক ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী একটি নথি সাধারণভাবেই নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু দালাল শুধু নথির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করে।
একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বলেছি, কোনো ধরনের অবৈধ কাজের সঙ্গে কোনোভাবেই নিজেদের সম্পৃক্ত করবেন না এবং দালাল বা কোনো অসত্ ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন না। এ ধরনের কাজে কোনোভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রথম আলো: শিক্ষানীতির খসড়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে, এটা বাস্তবায়িত হলে ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাবে। আসলে কি তাই?
নুরুল ইসলাম: এ পর্যন্ত দেশে একটি শিক্ষানীতিরও বাস্তবায়ন হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি চার মাসের মধ্যে একটি খসড়া শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। এটার ওপর জনমত যাচাই চলছে। পক্ষে-বিপক্ষে কয়েক হাজার মত এসেছে। প্রথম আলোর মাধ্যমে এদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই ভালো কাজে সঙ্গী হওয়ার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ধর্মের কথা বলে একটি মহল বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ সব আন্দোলন-সংগ্রামে ধর্মের অপব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, মাদ্রাসাশিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পরও আলেম-ওলামাদের সঙ্গে আমরা বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনে আরও আলোচনা করবে। আগামী জানুয়ারি থেকে শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে আশা করছি।
আমি একটি কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, শিক্ষানীতি কোনো দলের বিষয় নয়। এটা সমগ্র জাতির বিষয় এবং জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে দলনিরপেক্ষভাবে এবং জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষানীতি তৈরি হচ্ছে। কারণ আমরা সবাই জানি, শিক্ষার ওপর নির্ভর করবে জাতির ভবিষ্যত্।
প্রথম আলো: এমপিওভুক্তি নিয়ে কী হচ্ছে? দেশে আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে কি?
নুরুল ইসলাম: দেখুন, দেশে অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে অনেক। আবার ঢাকা শহরে যেমন আরও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরকার। সমস্যা হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে এত দিন বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান হয়েছে। বেকারত্ব ঘোচাতে প্রতিষ্ঠান তৈরিরও নজির রয়েছে। ছাত্রের চেয়ে শিক্ষক বেশি এবং কাম্য শিক্ষার্থী না থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন কয়েক হাজার। এই প্রেক্ষাপটে প্রায় অর্ধযুগ ধরে এমপিও স্থগিত রাখা হয়েছে। জাতীয় বাজেটে এই খাতে ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন ছিল ৬০০ কোটি টাকা। অতএব, বুঝতেই পারছেন, চাপ কতটা প্রবল হবে। ইতিমধ্যে সাড়ে ছয় হাজার আবেদন পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ওই কমিটি এমপিওভুক্তির নীতি তৈরি করবে।
প্রথম আলো: কারিগরি শিক্ষা সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন?
নুরুল ইসলাম: আমরা কারিগরি শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি। কারণ আমরা মনে করি, আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত আগামী প্রজন্মই হবে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিদেশি শ্রমবাজারের ভবিষ্যত্ চাহিদা মূল্যায়ন করে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার কারিকুলাম প্রণয়ন করা হচ্ছে। কারিগরি খাতের বাজেটও বাড়ানো হবে।
বর্তমান সরকার উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমানে পৌঁছাতে চায়। তবে শুধু মেধাবীদেরই উচ্চশিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসা উচিত। বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে কারিগরি শিক্ষাই আমাদের জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে পারে। এ জন্য খসড়া শিক্ষানীতিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে বাধ্যতামূলক কারিগরি বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বেকার না থেকে আত্মকর্মসংস্থানমুখী আয়বর্ধক কারিগরি শিক্ষার বিকাশ ঘটবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রথম আলো: পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গুদামে সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর ফলে পাঠ্যবই ছাপার কাজে বিঘ্ন ঘটবে কি? এটা দুর্ঘটনা, না নাশকতা?
নুরুল ইসলাম: প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এটি নাশকতা। এর সঙ্গে কার কীভাবে সম্পৃক্ততা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তবে সামগ্রিকভাবে এটা বলা যায়, সরকারবিরোধী গোষ্ঠী এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
দেশবাসী জানেন, এ বছর প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির পাশাপাশি মাধ্যমিকেও বিনামূল্যে বই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিকে আগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে অর্ধেক পুরোনো বই দেওয়া হতো। আগামী বছর থেকে প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থী নতুন বই পাবে। সব মিলিয়ে এ বছর ১৯ কোটি বই ছাপা হচ্ছে। এটা বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। যত চ্যালেঞ্জই আসুক, সরকার সারা দেশে সব শিক্ষার্থীর হাতে ১ জানুয়ারির আগে বই পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।
প্রথম আলো: মন্ত্রিসভা সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুমোদন করেছে। এতে উল্লেখ থাকা দূরশিক্ষণ, শাখা ক্যাম্পাস এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নুরুল ইসলাম: বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চশিক্ষাকে নিয়মনীতি ও ন্যূনতম মানে আনার জন্য আইনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছয়-সাত বছর ধরে আইনটি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। আপনারা জানেন এবং পত্রপত্রিকায় প্রায়ই লেখা হয়, আইনটি যাতে না হয়, সে জন্য চাপ ছিল। আমরা উচ্চশিক্ষার গুণ ও মানের স্বার্থে চাপ ও বাধা উপেক্ষা করেছি। দূরশিক্ষণ, শাখা ক্যাম্পাস ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ বিদ্যমান আইনে নেই, কিন্তু সেগুলো চলছে। কেউ বা আইনের আশ্রয় নিয়ে, কেউ কেউ গায়ের জোরে। আমরা সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে আগে আইনের মধ্যে আনতে চাই। এরপর সব ধরনের শিক্ষার ক্ষেত্রে নীতি তৈরি করে দেওয়া হবে।
প্রথম আলো: শিক্ষাক্ষেত্রে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
নুরুল ইসলাম: ইতিমধ্যে আমার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও নানা কারণে পাঠদান শুরু করতে বেশ দেরি হয়। এতে শিক্ষাবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণীর ক্লাস আবশ্যিকভাবে জানুয়ারি মাসের প্রথম কার্যদিবস থেকে শুরু করতে হবে।
এ ছাড়া উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, ঋণের এই টাকার সদ্ব্যবহার করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর সাধ্যমতো চেষ্টা করা; পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি, অনিয়মগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। শিক্ষা অধিদপ্তর, এনসিটিবি, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন কার্যালয় দুর্নীতিমুক্ত করা এবং এসব কার্যালয়ের কাজেকর্মে গতি আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
নুরুল ইসলাম: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই প্রতিষ্ঠানের সবাইকে শুভেচ্ছা।

দেশের ১৬১৪২ গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই

দেশের ১৬ হাজার ১৪২টি গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এর মধ্যে সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনা করলে এক হাজার ৯৪৩টি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা উচিত ছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে ওই তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা যায়, দেশের চর, সীমান্ত, হাওর-বাঁওড় ও পাহাড়ি এলাকায় প্রয়োজন থাকলেও বিদ্যালয় গড়ে না ওঠায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী দেশের কোন কোন গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, তার হিসাব বের করার উদ্যোগ নেন।
এ প্রসঙ্গে সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই চিত্র প্রমাণ করে, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো দেশের সর্বত্র, সব মানুষের কাছে, বিশেষ করে অনুন্নত ও অনগ্রসর এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের কতটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, সংশ্লিষ্টদের সেই হিসাব বের করতে বলেছিলাম।’ এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, সরকার না-হয় করতে পারেনি, বেসরকারি সংস্থাগুলো এসব প্রত্যন্ত এলাকায় কেন যায়নি—এটা তাঁরও প্রশ্ন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে সরকারি-বেসরকারিসহ ১১ ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮০ হাজার ৩৯৭টি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৭২টি এবং নিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৮২টি। প্রাথমিক স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশু-কিশোর।
জানা যায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৮ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা গ্রামের তালিকা চূড়ান্ত করে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী কুমিল্লা জেলার এক হাজার ১৭৩টি গ্রামে, মানিকগঞ্জ জেলার ৫৪৮টি গ্রামে, টাঙ্গাইল জেলার ৫২৮টি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এ ছাড়া দিনাজপুরের ৩৩৬, রংপুরের ২৩৭, জয়পুরহাটের ৩২৬, সিরাজগঞ্জের ৩৫৬, পাবনার ৩৬৮, সাতক্ষীরার ৩৩৫, নেত্রকোনার ৮৭৯টি গ্রামসহ বিভিন্ন জেলার কয়েক শ গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ও বোহাইলইউনিয়নের মধ্যবর্তী মাত্র আড়াই কিলোমিটার এলাকায় ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়গড়ে উঠেছে। অথচ বোহাইলইউনিয়নের নদীবেষ্টিত চরমাঝিড়া গ্রামে কোনো বিদ্যালয় না থাকায় ওই গ্রামের শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যমুনা তীরের বিভিন্ন গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়ে নদীবক্ষে বিলীন হওয়ার পর ওইসব গ্রামের স্কুলগুলো কামালপুর ইউনিয়নের দড়িপাড়া গ্রাম ও এর আশেপাশের আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে ঠাঁই করে নেয়। পরে সরকারি উদ্যোগের অভাবে স্কুলগুলো আর আগের ঠিকানায়ফিরতে পারেনি।
টেকনাফ প্রতিনিধি গিয়াসউদ্দিন জানান, কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের ছয়টি ইউনিয়নে গ্রাম রয়েছে ১৪৩টি। এগুলোর মধ্যে ৭৭টি গ্রামে সরকারি-বেসরকারি কোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ব্যক্তি উদ্যোগে দুর্গম গ্রামে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হলেও নানা সমস্যায় সেগুলোও পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রায় ৪৫ হাজারের মতো শিশু-কিশোর শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব শিশু-কিশোর লেখাপড়ার পরিবর্তে সমুদ্র উপকূলে চিংড়ি পোনা আহরণ, মাছ ধরা, পাহাড় থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহসহ বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের উচ্চ মহলে লেখালেখি করে ৭৭টি গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
হোয়াইক্ষ্যং ইউনিয়নের কম্বনিয়া পাড়ার বাসিন্দা সাহিলা চাকমা জানান, পাহাড়ঘেরা এই দুটি গ্রামে চার শতাধিক উপজাতি পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারে বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী অন্তত দেড় হাজার শিশু-কিশোর থাকলেও দুটি গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোবারক আখতার জানান, গ্রামগুলোতে বিদ্যালয় স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে ওপর মহলে কয়েকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে।

নামের মোহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!


আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নামে গড়া প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি বা এমপিওভুক্তি পাবে না, এটা কি হয়? বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে জিয়াউর রহমান বা ওই দলের মন্ত্রী-সাংসদদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া ঠেকাবে কে?
১৯৯০ সালের পর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দুবার করে ক্ষমতায় এলে ওই দুই দলের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতাদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার হিড়িক পড়ে যায়। মন্ত্রী ও সাংসদদের অনেকে নিজের নাম তো বটেই, মা-বাবা এবং স্ত্রীর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করে অমরত্ব লাভের ব্যবস্থা করেছেন। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ তাঁর নিজের এবং স্বজনদের নামে সারা দেশে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে এই ধারায় অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেন।
দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে হলে প্রভাবশালী বা স্থানীয় সাংসদদের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার উপায় থাকে না। সহযোগিতা ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নামকরণের বিষয়ে তাঁর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হয়।
বঙ্গবন্ধুর নামে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া গেছে। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি পর্যায়ের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে এই জাতীয় নেতার নামে। ডিগ্রি পর্যায়ের ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মিরপুর বঙ্গবন্ধু কলেজ, চন্দ্রা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কলেজ, টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী শেখ মুজিবুর রহমান কলেজ, গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, ফুলপুরে তারাকান্দা বঙ্গবন্ধু কলেজ, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর বঙ্গবন্ধু কলেজ, রাজশাহীর বোয়ালিয়ায় বঙ্গবন্ধু কলেজ, মেহেরপুর মুজিবনগর কলেজ, রূপসা বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ, বসুরহাট সরকারি মুজিব কলেজ, কচুয়া বঙ্গবন্ধু কলেজ, বহিমানগর শেখ মুজিবুর রহমান কলেজ, বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ, জলঢাকায় শিমুলবাড়ী বঙ্গবন্ধু কলেজ, মতিঝিলে বঙ্গবন্ধু ল কলেজ, মাদারীপুর বঙ্গবন্ধু ল কলেজ এবং চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু ল টেম্পল।
জিয়াউর রহমানের নামে ১৩টি কলেজ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জিয়াউর রহমানের নামে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে পল্লবী শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, পিরোজপুরের নাজিরপুর শহীদ জিয়া কলেজ, বরিশালের সাহেবের হাট শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ, রাজশাহী শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ, গাবতলী শহীদ জিয়া কলেজ, জয়পুরহাট শহীদ জিয়া কলেজ, ফতেপুর শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ, ফেনী সরকারি জিয়া কলেজ, জিয়া সারকারখানা কলেজ, ঝিনাইদহ শহীদ জিয়াউর রহমান আইন কলেজ, নোয়াখালী জিয়া এডুকেশন অব ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট ও রাজশাহীর শ্যামপুরে শহীদ জিয়াউর রহমান শারীরিক শিক্ষা কলেজ। এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের নামে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা পর্যায়ের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ফজিলাতুন্নেসার নামে আটটি কলেজ: বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেসার নামেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত আটটি কলেজ রয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য শেখ জামাল, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতসহ কয়েকজনের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।
নিজের ও বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠানের নমুনা: ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা মসিউর রহমান ও তাঁর বাবা-মায়ের নামে রয়েছে সাতটি প্রতিষ্ঠান। ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা শহিদুল ইসলাম ও তাঁর বাবা-মায়ের নামে রয়েছে তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সাবেক সাংসদ এম এ ওহাব বাবার নামে কলেজ স্থাপন করেছেন। ঝিনাইদহ-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ শফিকুল আজম খাঁন চঞ্চল তাঁর বাবার নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
নামকরণের নমুনা: চরফ্যাশন উপজেলার রসুলপুর এলাকায় ১৯৯৭ সালে রসুলপুর মহাবিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এরপর বিএনপির সাংসদ নাজিমউদ্দিন আলম নিজের নামে একই এলাকায় দুই কিলোমিটার ব্যবধানে নাজিমউদ্দিন আলম কলেজ গড়ে তোলেন। এরপর তিনি রসুলপুর কলেজকে নাজিমউদ্দিন আলম কলেজের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন।এ ছাড়া সাবেক ওই সাংসদ এলাকাবাসীর গড়া কলেজের নাম বদলে শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ নাম রেখেছেন। এ ছাড়া বাবা ও স্ত্রীর দুটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।
সাবেক সাংসদ নাজিমউদ্দিন আলম বলেন, ‘এলাকার জনগণ আমাকে এবং শহীদ জিয়াউর রহমানকে ভালোবেসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নামকরণ করেছে।’ এসব নামকরণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভোলা-৪ আসনের বর্তমান সাংসদ আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে জনতা বাজার কলেজ জবরদখল করে অবৈধভাবে শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ নামকরণ করা হয় এবং রসুলপুর কলেজকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নাজিমউদ্দিন আলম কলেজ নামকরণ করা হয়।
ভিন্ন চিত্র: রাজধানী ঢাকা ও নরসিংদীর রায়পুরায় নিজের এলাকায় মোট ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন সমাজসেবক আর কে চৌধুরী। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো রকম সহযোগিতা বা পরামর্শ চাওয়া হলে তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। আর কে চৌধুরী আরও বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে দেওয়ার পর তাঁর আর চাওয়া বা পাওয়ার কিছু নেই। এগুলো ভালোভাবে চলুক—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এম ওসমান ফারুক বলেন, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়লে এটা তার হয়ে যায় না। যাঁরা নিজের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চান তাঁরা ভুল করেন এবং ওই সব প্রতিষ্ঠান তখন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় না।
সরকারপ্রধানের অনুমতি লাগবে: বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রভাবশালী ও সুবিধাবাদী কিছু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার চেষ্টা শুরু করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বর মাসে একটি পরিপত্র জারি করে। এতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু্রশেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্য, চার জাতীয় নেতা, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ, ভাষাশহীদসহ জাতীয় প্রয়াত ও জীবিত নেতাদের নামে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে। আবেদন পরীক্ষা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারপ্রধানের কাছে তা অনুমোদনের জন্য পেশ করবে। শুধু সরকার প্রধান অনুমতি দিলে এ ধরনের নামকরণ করা যাবে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঝিনাইদহ থেকে আজাদ রহমান এবং চরফ্যাশন প্রতিনিধি মো. ইয়াছিন।

অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ

ছাত্র সংগ্রহে শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি ধরনা

আজাদ রহমান, ঝিনাইদহ

পেশায় তিনি শিক্ষক। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে পড়ানো ছাড়াও রয়েছে শিক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্ব। ভর্তি মৌসুমে নিরুপায় হয়েই শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি ছুটতে হয় তাঁকে। ভর্তি-ইচ্ছুক এবং তার অভিভাবককে অনুরোধ করেন। দিতে হয় ভালোভাবে পড়াশোনা করানোসহ নানা রকমের আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি।
এই শিক্ষক ঝিনাইদহ-৩ আসনের সাবেক সাংসদ শহিদুল ইসলামের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত আলফাতুন্নেছা মহাবিদ্যালয়ে চাকরি করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক বলেন, ‘চাকরি নেওয়ার সময় শর্ত ছিল, শিক্ষার্থী জোগাড় করতে হবে। এটা না করলে কলেজ চলবে কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থী না থাকলে কলেজ থাকবে না, কলেজ না থাকলে চাকরিও থাকবে না।’
এই অবস্থা শুধু ঝিনাইদহের আলফাতুন্নেছা কলেজের নয়, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। বাইসাইকেল, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ, বিনামূল্যে বই ও পোশাক দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও এখন শিক্ষার্থী ভর্তি করার চেষ্টা চলে।
শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলায় এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৮০টি, কলেজ ৫৫টি আর মাদ্রাসা ১১০টি। আর এমপিওভুক্তি ছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৮টি, কলেজ পাঁচটি ও মাদ্রাসা ২৩টি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর এসব বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এক লাখ ১২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। স্থানীয় সাংসদ ও তাঁদের স্বজনের নামে গড়া হয়েছে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান। মূলত নামকরণের আশায় গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই বর্তমানে ভুগছে শিক্ষার্থীর সংকটে।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু নিজের বা বাবা-মায়ের নামেই প্রতিষ্ঠান গড়াই লক্ষ্য ছিল না। ওই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েও ব্যাপক আর্থিক বাণিজ্য হয়েছে।
জানা যায়, ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা মসিউর রহমান এবং তাঁর বাবা-মায়ের নামে রয়েছে সাতটি প্রতিষ্ঠান। ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা শহিদুল ইসলাম ও তাঁর বাবা-মায়ের নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা এম এ ওহাবের বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কলেজ। ঝিনাইদহ-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ শফিকুল আজম খাঁনের বাবার নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাবেক সাংসদদের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার বিষয়ে সদর উপজেলার গান্নাবাজার মুক্তিযোদ্ধা মসিউর রহমান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, তাঁরা প্রথমে গান্নাবাজার কলেজ নামকরণ করেছিলেন। কিন্তু এমপিওভুক্তির সময় সাংসদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নাম পরিবর্তন করা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নামকরণের ক্ষেত্রে এককালীন ১৫ লাখ টাকা কলেজে দান করার বিধান থাকায় তিনি কলেজের হিসাবে ১৫ লাখ টাকা জমা দেন। পরে জমি ক্রয়সহ বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে তিনি টাকা ফেরত নিয়েছেন। কোটচাঁদপুর জি টি কলেজের শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সাংসদ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নামের ক্ষেত্রে কলেজের হিসাবে টাকা জমা ও খরচ—সবই হয় কাগজ-কলমে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অধ্যক্ষ জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে হলে সাংসদদের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার উপায় থাকে না। তাঁদের সহায়তা চাওয়া হলে কেউ কেউ নিজেদের ইচ্ছেমতো নামকরণের শর্ত জুড়ে দেন।
একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজনৈতিক কারণে আর শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে অর্থবাণিজ্যের আশায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি স্কুল-কলেজে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। টাকা দিয়ে চাকরি নিয়ে বেতন পাননি এমন শিক্ষকও রয়েছেন অসংখ্য। বিশেষ করে ঝিনাইদহ জেলার ১৫টি ডিগ্রি কলেজে শতাধিক তৃতীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা আজও বেতন পাননি।
টাকা দিয়ে চাকরি নিয়ে বেতন না পাওয়ায় ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া কলেজের শিক্ষকেরা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে যারা তাঁদের টাকা নিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাঁদের সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। ওই কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে জানান, তাঁদের কলেজের প্রায় সব শিক্ষককে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে চাকরি নিতে হয়েছে। কলেজের বিজ্ঞান শাখা অনুমোদন না থাকলেও শুধু টাকার জন্য ওই বিভাগে আটজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। যাঁরা আজও সরকারি বেতন পাননি। একইভাবে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ডাকবাংলো কলেজে অতিরিক্ত আটজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহের ছয়টি উপজেলার ১৫টি বেসরকারি ডিগ্রি কলেজে শতাধিক তৃতীয় শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের জানানো হয়েছে, একটি বিষয়ে দুজনের অতিরিক্ত শিক্ষকের বেতন দেওয়া সম্ভব নয়।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ডাকবাংলোয় অবস্থিত আব্দুর রউফ ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক শাহানুর আলম জানান, এনজিওর চাকরি ছেড়ে এখানে যোগদান করেন। তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হওয়ায় আজও বেতন পাননি। দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে চাকরির পাশাপাশি নিজে একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা করে সংসার চালাচ্ছেন। অপর এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাকরি পেতে তাঁকে এক লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়োগকর্তারা টাকার জন্য নিয়োগ দেন, কিন্তু তাঁরা ভাবেন না, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা বেতন পাবেন কি না।

মফস্বলে বিজ্ঞান, ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার্রবেহাল দশা

সোহেল রহমান

সুনামগঞ্জের কৃষ্ণনগর হোসেনিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের ৬১৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। একজন বিএসসির শিক্ষক নবম ও দশম শ্রেণীতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞান পড়ান। ইংরেজি পড়াচ্ছেন বাংলা ও ইতিহাসের শিক্ষকেরা। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের ব্যবহারিকের জন্য কোনো গবেষণাগার ও সহায়ক শিক্ষক নেই। নেই কোনো গ্রন্থাগারও। প্রায় একই চিত্র দেখা যায় সিলেটের পাঠানটুলা দ্বি-পাক্ষিক উচ্চবিদ্যালয় ও চট্টগ্রামের রায়পুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ে।
পর্যাপ্ত্রদক্ষ শিক্ষক, পাঠ্যবই ও অবকাঠামোগত নানা সংকটের ফলে দেশের মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি শিক্ষা নাজুক হয়ে পড়েছে। এসব বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান লাভ করতে না পেরে শিক্ষার্থীরা কোনো রকমে পাঠ্যবিষয় মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করছে। ফলে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে প্রচণ্ড হিমশিম খাচ্ছে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী।
‘বিজ্ঞান ও ইংরেজি বইয়ের ভাষাগুলো কঠিন হওয়ায় আমরা অনেকেই ঠিকমতো বুঝতে পারি না। স্কুলে একদিকে বিষয়ভিত্তিক ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। অন্যদিকে দুর্বোধ্য পাঠ্যবই নিয়ে বড়ই ঝামেলা পোহাতে হয়।’ জানাল রায়পুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী নুসরাত শিরিন। সুনামগঞ্জের সরকারি এস সি বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ফাহমিদা বলে, ‘আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ইংরেজিতে দুর্বল। এখন মাধ্যমিকের বইয়ের ভাষা খুব কঠিন মনে হয়।’ শিরিন ও ফাহমিদার মতো এমন অভিযোগ দেশের অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।
বিজ্ঞান ও গণিতে শিক্ষকসংকট প্রকট, নামেই ব্যবহারিক ক্লাস: সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীতে বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষক আছেন মাত্র একজন। তিনি একাই পড়াচ্ছেন পদার্থ, রসায়ন ও গণিত। এ বিদ্যালয়ে নেই কোনো বিজ্ঞানের গবেষণাগার। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, ‘ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ায় বিজ্ঞানের অনেক কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারছি না। মুখস্থ করেই ব্যবহারিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।’ তত্ত্বীয় বিষয়ের ক্লাসও ঠিকমতো হয় না বলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক প্রদীপ কান্তি জানান, বিদ্যালয়টি সমুদ্র উপকূলে হওয়ায় প্রায়ই বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষকদের অনেক বাড়তি চাপ নিতে হয়। ব্যবহারিকের যন্ত্রপাতি ও কক্ষসংকটের ফলে ঠিকমতো ক্লাস হয় না বলে তিনি জানান।
সিলেটের পাঠানটুলা দ্বি-পাক্ষিক উচ্চবিদ্যালয়ে ১২ শ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন ১৪ জন শিক্ষক। এর মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। এ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রণধীর দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকসংকটের ফলে বিজ্ঞানের ক্লাস ঠিকমতো হয় না। গবেষণাগারে পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকায় ব্যবহারিক ক্লাসও যথাযথভাবে হচ্ছে না। সংকটের সমাধানে একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।
চট্টগ্রামের বটতলী উচ্চবিদ্যালয়, সুনামগঞ্জের কৃষ্ণনগর হোসেনিয়া উচ্চবিদ্যালয়, মঙ্গলকাটা উচ্চবিদ্যালয়, এস সি বালিকা বিদ্যালয়, সিলেটের এইডেড হাইস্কুল, শাহ পরান উচ্চবিদ্যালয় ও জহিরিয়া এম ইউ উচ্চবিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষক ও গবেষণাগার-সংকটের প্রায় একই চিত্র। বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, সংকটের ফলে শিক্ষকদের বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ে ক্লাস নিচ্ছেন।
প্রকট শিক্ষকসংকট ও বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ায় বিজ্ঞানের জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো না বুঝেই মুখস্থ করে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় পাস করছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা জানান।
ইংরেজিতে দক্ষ শিক্ষক নেই: অভিজ্ঞ্রও দক্ষ্রশিক্ষকের অভাব, জটিল ও দুর্বোধ্য পাঠ্যবই এবং প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্বল ইংরেজি শিক্ষার ফলে দেশের মাধ্যমিক স্তরের ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ভোগান্তি ও উদ্বেগের কথা জানা গেছে। শিক্ষকদের অনেকেই ছাত্রছাত্রীদের এ সমস্যার সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
‘ইংরেজি ক্লাসে পড়া ঠিকমতো বুঝতে পারি না। পাঠ্যবইটাও জটিল মনে হয়। ক্লাসে স্যাররা যদি সহজভাবে বোঝাতেন, পাঠ্যবই কঠিন ও জটিল না করে বোঝার মতো করলে ইংরেজিটা ভালোভাবে পড়তে পারতাম।’ বলল সিলেটের শাহ পরান উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী খোরশেদ, তানজিনা ও এনায়েত।
চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক ও এফ এম ইউনূস প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক পর্যায়ে বলতে গেলে ইংরেজির কিছুই শেখে না। দুর্বল ভিত্তি নিয়ে তাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজি পড়তে অনেকটা বেগ পেতে হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও জরুরি।’
সুনামগঞ্জ্রএস সি বালিকা বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক আনিসুর রহমান কামাল বলেন, ‘বর্তমান পাঠ্যসূচি ইংরেজি শেখার উপযোগী বলে আমার মনে হয় না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান ইংরেজি শিক্ষাপদ্ধতিতে যে পাঠ্যবই আছে, তাতে কল্পনা করার জায়গা নেই। এটি একটি অনাকর্ষণীয় পাঠ্যসূচি।’ বর্তমান, পুরোনোসহ সব পদ্ধতির সংমিশ্রণে নতুন এক পদ্ধতিতে ইংরেজি শেখানোর কথা বলেন তিনি।
শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষকদের মানসম্মত বেতন ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করে সরকারকে পুরোনো সব আবর্জনা দূর করে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংকটের সমাধানে শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত তথ্য পরিহার করে তাদের কাছে সহজ ও বোধগম্য পাঠ্যবই প্রণয়ন, আধুনিক পরীক্ষাপদ্ধতি, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু করতে হবে। খুব দ্রুত এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ এ ছাড়া সরকারকে ‘পরীক্ষায় পাসের হার প্রতিযোগিতা’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে তিনি জানান।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মনির উদ্দিন বলেন, ‘সিলেটের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে শিক্ষকসংকট রয়েছে। বিজ্ঞানের গবেষণাগারও অনেক জায়গায় নেই। সংকটের সমাধানের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। ধীরে ধীরে এর সমাধান করা হচ্ছে।’

স্কুল ও শিক্ষকসংকটে শিক্ষা বঞ্চিত থাকছে চরের শিশুরা

অরূপ রায়, মানিকগঞ্জ, শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা ও মো. ইয়াছিন, চরফ্যাশন (ভোলা)

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের চরবৈষ্ণবী গ্রামের দিনমজুর বিল্লাল শেখের চার ছেলেমেয়ের কেউই কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি। স্কুলে যাওয়ার বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাঁর বড় মেয়ে বিলকিস আক্তারকে (১২)। ছেলে হাকি শেখ (১০), মো. তালুকদার (৮) ও ছোট মেয়ে ফতে খাতুনেরও (৭) কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি। শুধু বিল্লাল শেখের ছেলেমেয়েরাই নয়, যমুনা নদীতীরবর্তী ওই গ্রামের শিক্ষার চিত্র প্রায় একই।
চরবৈষ্ণবী গ্রামটিতে পরিবারের সংখ্যা ২৫০। এসব পরিবারে বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪০০, যাদের বেশির ভাগই স্কুলে যায় না। গ্রামটিতে একটি আনন্দ স্কুল থাকলেও সেটি কালেভদ্রে খোলা হয়। ওই স্কুলে ৩০ জন ছাত্রছাত্রীর বেশির ভাগ নিজেদের নামটাই লিখতে পারে না।
গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহমানের মেয়ে রহিমা খাতুন (১২) চরবৈষ্ণবী গ্রামের গেদা ঘোষের বাড়ির আনন্দ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে চার বছর ধরে সে ওই স্কুলেই পড়ালেখা করছে। কিন্তু সে কোনো পাঠ্যবইয়ের নামই বলতে পারে না।
রহিমার মা মমতা খাতুন বলেন, ‘আমাগো বাড়ির থিকা হরকারি (সরকারি) পাইমারি স্কুল সাত মাইল দূরে। হেনে যাইতে চাইরডাখাল পার অইতে অয়। তাই আমার চাইরডা পুলামেয়ার কাউরেই পড়াইবার পারি নাই। অনেক শক কইরা বড় মেয়াডারে আনন্দ স্কুলে বতি (ভর্তি) করচিলাম। কিন্তু স্কুলই খুলে না, পড়া লেহা আর কি শিকবো।’
শিবালয়ের আরিচা বন্দর থেকে নৌপথে অন্তত ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাবনার সীমান্ত এলাকায় চরবৈষ্ণবী গ্রামের অবস্থান। চারদিকে যমুনা নদীঘেরা ওই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছোট ছোট ছনের ঘর। বিদ্যুত্, রাস্তাঘাটসহ নাগরিক-সুবিধা বলতে কিছুই নেই গ্রামটিতে। দু-একটি পরিবার ছাড়া মাছ ধরা আর অন্যের বাড়িতে মজুরি খাটাই তাদের মূল পেশা।
১৬ অক্টোবর ওই গ্রামে গেলে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। গ্রামের কৃষক আকতার হোসেন, হারুন আলী শেখ ও রহম আলী জানান, গ্রামের প্রতিটি পরিবারেই চার থেকে সাতজন করে বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশু রয়েছে। শুধু বিদ্যালয়ের অভাবে এই ছেলেমেয়েদের তাঁরা পড়ালেখা করাতে পারেন না।
চরবৈষ্ণবী গ্রাম থেকে কাছের যে বিদ্যালয়, সেটির নাম মধ্যনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই গ্রাম থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব অন্তত ছয় কিলোমিটার। ছেলেমেয়েরা দূরের ওই বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহী নয়।
শিবালয় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যমুনা নদীতীরবর্তী তেওতা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র চারটি বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ের একটি থেকে অপরটির দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার, আর শিবালয় ইউনিয়নের চরাঞ্চলে কোনো বিদ্যালয়ই নেই।
শিবালয় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রণতোষ কুমার সেন বলেন, চরাঞ্চলে বিদ্যালয় গমনোপযোগী শিশুর তুলনায় বিদ্যালয়ের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল।
করুণ অবস্থা গাইবান্ধার চরে: গাইবান্ধার চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। নেই শ্রেণীকক্ষ, চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান টিনের তৈরি। দু-একটি পাকা ভবন থাকলেও সেগুলো সংস্কারের অভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে। নদীভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়েছে অনেক বিদ্যালয় ভবন। এ ছাড়া অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত হন না। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে বদলি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়া নেই বললেই চলে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, গাইবান্ধার সাত উপজেলার মধ্যে চারটি নদীতীরবর্তী। এগুলো হচ্ছে: গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ। চার উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়নে ৫৪টি চর রয়েছে।
গাইবান্ধার এই ১৩ ইউনিয়নের চরাঞ্চলে মোট ৯৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সরকারি ও ৫১টি রেজিস্টার্ড বেসরকারি। বিদ্যালয়গুলোতে মোট ১৫ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৩৪৮ জন। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোরও একই চিত্র।
মোল্লারচর রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের পাকা ভবন নেই। ২৮ হাত টিনের ঘরে কোনোমতো চারজন শিক্ষক দিয়ে ১০০ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা হচ্ছে। বেঞ্চ না থাকায় মাটিতে চট বিছিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র রাশেদুল ও সুমন জানায়, বিদ্যালয়ে নলকূপ ও ল্যাট্রিন নেই।
সিধাই গ্রামের মেম্বার আবু হানিফ জানান, সড়ক যোগাযোগ না থাকায় শিক্ষকেরা এখানে বেশি দিন থাকতে চান না। দু-এক মাস থেকেই বদলি নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, দুর্গম চরের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে বেতনের অর্ধেক টাকা খরচ হয়। তাই বাধ্য হয়ে কয়েক মাস চাকরি করার পর অন্যত্র বদলি নিতে হয়।
ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের হেলেঞ্চা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি টিনশেড ঘর থাকলেও বেঞ্চ নেই। তিনজন শিক্ষক ১১১ শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসিয়ে পড়াচ্ছেন। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, প্রয়োজনীয় বেঞ্চ ও ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম বলেন, চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে চেয়ার টেবিল বেঞ্চ কেনার জন্য। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়া গেলে এসব সমস্যার সমাধান হবে।
চরফ্যাশনের আট চরে স্কুলই নেই: ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নগণ্য। আটটি চরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নেই। ফলে এখানকার শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
চরফ্যাশনের মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সামালগীর আলম জানান, উপজেলার সিকদারের চর, চর ফারুকী, চর হাসিনা, চর স্টেফিন, জাহাজমারা, চর লিউলিন, চরহাদী, চর ফকিরা—এ আটটি চরে কোনো স্কুল নেই। ফলে চরাঞ্চলের শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এসব চরে দ্রুত বিদ্যালয় স্থাপন প্রয়োজন।

হাওরের তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খণ্ডচিত্র

আক্তারুজ্জামান

হবিগঞ্জের মাধবপুর শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের ৩৬৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য আছেন চারজন শিক্ষক। এই হিসাবে প্রায় ৯২ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন করে শিক্ষক। কিন্তু গত ১৫ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টায় গিয়ে দেখা যায়, নাসিমা আক্তার নামের স্কুলে কেবল একজন শিক্ষক আছেন।
হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাংশজুড়ে বিস্তৃত বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের এই একই দশা।
তিন বা চার—বিদ্যালয়ে যতজন শিক্ষকই থাকেন, তাঁদের মধ্যে কেউ এক বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (সিইনএড) প্রশিক্ষণে থাকেন, কেউ বা শিক্ষা কর্মকর্তাদের অগোচরে বা ভুয়া কারণ দেখিয়ে সারা বছর ধরেই বিদ্যালয়ের বাইরে থাকেন। অধিকাংশ শিক্ষকেরই ১৫—৩০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে বিদ্যালয়ে হাজির হতে হয়। তাই যাতায়াত এবং খরচের কথা চিন্তা করে তাঁরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে হাজিরা থেকে বিরত থাকেন। যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাও বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করেন না। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তিনটি স্কুলে গিয়ে যে চিত্র দেখা যায়, তা নিতান্তই হতাশাজনক। কিন্তু এর জন্য কাকে দায়ী করবেন—শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, নাকি প্রশাসনিক ব্যবস্থা?
তিনটি স্কুলের খণ্ডচিত্র: দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নাসিমা আক্তার একটি শ্রেণীকক্ষে ক্লাস নিচ্ছেন। অন্যান্য ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের চারদিকে হৈ ছৈ করছে। নাসিমা আক্তার নিজেও এই স্কুলের শিক্ষক নন, অন্য স্কুল থেকে প্রেষণে এসেছেন। তিনি জানান, এই স্কুলে চারজন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন শিক্ষককেই সিইনএড প্রশিক্ষণে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদও খালি। সুরাইয়া আক্তার নামের একজন এখন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় ছুটি নিয়েছেন। প্রেষণে আসা আরেক শিক্ষকও ওই দিন আসেননি।
এক ঘণ্টা পর গ্রামের উজ্জ্বলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও একই ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শরিফা আক্তার গ্রন্থাগারে বসে ছিলেন। বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষগুলোতে ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী ভেতরে-বাইরে দৌড়াদৌড়ি করছে। শরিফা আক্তার জানান, এই বিদ্যালয়ে ৫২ জন শিক্ষার্থী ও চারজন শিক্ষক আছেন। প্রধান শিক্ষক পরিমল রায় অফিসের কাজে মাধবপুরে গেছেন। আরেকজন শিক্ষক সাদিয়া আক্তার সিইনএড ট্রেনিংয়ে আছেন। সেদিন শরিফা আক্তারই বিদ্যালয়ের সার্বিক দায়িত্ব পালন করছেন।
শরিফা আক্তার বলেন, তিনি মাধবপুর শহর থেকে ১০ কিমি টেম্পুতে এবং পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে এসে বিদ্যালয়ে ক্লাস করেন।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পৈলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাসন্তী রায় গ্রন্থাগারে বসে শিক্ষার্থীদের পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন। অন্যান্য ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বারান্দায় ও রুমে দৌড়ঝাঁপ করছে। বাসন্তী রায় জানান, এই বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষকের মধ্যে সাকিফা শারমিন সিইনএড প্রশিক্ষণে আছেন, বিষ্ণু চন্দ্র চৌধুরী আছেন ছুটিতে। বাকি একজন আবু নাসের ১২টার দিকেই চলে গেছেন। ফলে এখন তাঁকেই স্কুলটি সামলাতে হবে।
নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন হয় না: হোম ভিজিট, মা সমাবেশ, উঠান-বৈঠক এমনকি বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব হচ্ছে একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার। উপজেলার ২৪১টি বিদ্যালয়কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করে প্রতিটির জন্য একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বে আছেন মাত্র দুজন কর্মকর্তা। ফলে সঠিকভাবে বিদ্যালয় পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না, সঙ্গে আছে দুর্নীতির অভিযোগ। একজন প্রধান শিক্ষক জানান, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের জন্য প্রতি বিদ্যালয়েই একটি আলাদা ‘তহবিল’ তৈরি করে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা যা বলেন: উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহান খানের কাছে স্কুলগুলোর এই দুরবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অধিকাংশ অভিযোগের বিষয়েই তিনি কিছু জানেন না। তবে যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলার দানপুর এবং রামেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষকের মধ্যে তিনজনকেই সিইনএড প্রশিক্ষণে পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজাহান খান বলেন, তিনি প্রশিক্ষণে কাউকে পাঠান না। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তালিকা অনুযায়ী তিনি শুধু বিদ্যালয় থেকে যাওয়ার ছাড়পত্রে সই করেন।

শিক্ষা বিষয়ে একের পর এক কমিটি

সুপারিশ বাস্তবায়নে ধীরগতি

এম. আহমেদএম. আহমেদ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছয় বিভাগে ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনসহ বেশ কিছু বিষয়ে সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে সংস্কার কমিটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই গঠন করা হয়েছিল ওই কমিটি। কিন্তু কমিটি কয়েক মাস আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ কমিটির মতো শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ কমিটিই তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পর্বটি চলছে ধীরগতিতে।
কমিটি গঠনের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একাধিকবার বলেছেন, তাঁরা চান সবার মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। এর জন্যই বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘কমিটি যেহেতু আমরাই গঠন করছি; সুতরাং তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও আমাদেরই। হয়তো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেটা আগে বাস্তবায়ন করা দরকার, সেটা আগে করা হচ্ছে। বাকিগুলো কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আস্তে আস্তে করা হবে।’
এ প্রসঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, সুপারিশ চিন্তার বিষয়। আর বাস্তবায়ন বস্তুগত বিষয়। এ জন্য সময় ও সম্পদের প্রয়োজন। তাই সুপারিশ বাস্তবায়নে একটু সময় লাগতেই পারে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দেশের শিক্ষাবিদদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের দিয়ে একাধিক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ১০ মাসে মন্ত্রণালয় অন্তত ২০টি কমিটি গঠন করেছে বলে জানা যায়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই পাঠ্যপুস্তক সংকট মোকাবিলায় করণীয় ঠিক করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগে বই-সংকটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও এর প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এদিকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে সঠিক ইতিহাস সংযোজনের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। দুটি কমিটি ইতিমধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কমিটির অতি প্রয়োজনীয় সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আর বাকিগুলো পরের বছর থেকে কার্যকর করা হবে। অর্থাত্ এখানেও সব সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
গত ২৫ মার্চ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে বিরাজমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তো সুপারিশসহ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয়ের উচিত তা পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।’
২০১০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথম পত্র ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে গত ১ জুলাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ কমিটির সুপারিশ আংশিক কার্যকর হয়েছে।
গত ৩ আগস্ট দেশের অঙ্ক শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে সুপারিশ প্রদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য তাজুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একইভাবে দেশের ইংরেজি শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গত ২৬ জুন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান আতফুল হাই শিবলীকে চেয়ারম্যান করে ১৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইংরেজি শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে দুই মাসের সময় দেওয়া হয় কমিটিকে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিরসনের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রদানের জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল আলমকে সভাপতি করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি তাদের প্রতিবেদন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক ছাপার জন্য কাগজ ক্রয়/সংগ্রহ, মুদ্রণ ও বিতরণকাজ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার জন্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কিছুদিন আগে জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রদানের জন্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখভালের জন্য একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে কমিটি হয়েছে।
গত ৬ এপ্রিলের এক পরিপত্রে শিক্ষানীতি ২০০০ অধিক সময়যোগী করতে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইতিমধ্যে কমিটি তাদের প্রতিবেদন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও মতামত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে শিক্ষানীতির সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু হবে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কমিটি গঠনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু ফল পেতে কেবল কমিটি গঠন করলেই চলবে না, সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য কাজী সালেহ আহমেদ বলেন, ‘এটা ঠিক যে কমিটির অনেক সুপারিশই বাস্তবায়ন হয় না। তবে আমার মতে, সুপারিশের আগেই ভাবা উচিত, যা সুপারিশ করা হচ্ছে তা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, সেটা দেখা।’

কওমি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে রাজনীতি

ওয়াসেক বিল্লাহ

কওমি মাদ্রাসা এবং এর শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনায় এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয়, দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিদেনপক্ষে ১৮ লাখ বলেও দাবি করছেন এ মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সংস্থার নেতারা। এই ধারার শিক্ষার কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা নিয়ন্ত্রণ নেই।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই আসে হতদরিদ্র পরিবার থেকে। ফলে সমাজের উঁচু শ্রেণী বা সরকার দীর্ঘদিন এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এই শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকেরা সব সময়ই বলে আসছেন, কোনো কোনো বিপত্গামী জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে জড়ালেও শিক্ষার্থীরা মূলত সমাজের শান্তি, স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে।
মাদ্রাসা, শিক্ষক, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অজানা: কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারের স্বীকৃতি, অনুমোদন ও অর্থায়ন ছাড়াই চলছে। এতে কত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, তার সঠিক হিসাব শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো সংস্থাতেই নেই।
খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আবদুর রব ইউসুফী প্রথম আলোকে জানান, গত ৮ এপ্রিল মালিবাগের জামেয়া শ্যরিয়া মাদ্রাসায় এক বৈঠকে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারাসিল আরাবিয়ার (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার বলেন, এই জরিপের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
২০০৬ সালে কওমি মাদ্রাসার সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যে হিসাব দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছে, আটটি স্তরে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৫ হাজার ২৫০টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ এবং শিক্ষক এক লাখ ৩২ হাজার ১৫০ জন। এই সংখ্যা নিয়েও অবশ্য বিতর্ক আছে।
স্বীকৃতি মেলেনি: লাখ লাখ শিক্ষার্থী তাদের ১৩ বছরের শিক্ষাজীবনে যা পড়ে, এর কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। শিক্ষাব্যবস্থায় নেই কোনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। বিভিন্ন সময়ে এসব মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো সরকারের কাছে এই স্বীকৃতি দাবি করেছে। গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই দাবি নিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থপ্রসূত কূটকৌশলই হয়েছে বেশি।
চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্তে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে ‘মাস্টার্সে’র সমমান দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে মনে করা হয়, এই ঘোষণা যতটা না এই ধারার শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় মূল কাঠামোতে নিয়ে আসার উদ্যোগ ছিল, এর চেয়ে বেশি ছিল কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের ভোট টানার কৌশল। প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক এবং উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গভিত্তিক চারটি আঞ্চলিক বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সংস্থা’র ৬২ জন আলেমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কওমি সনদের স্বীকৃতি ও পাঠক্রমের আধুনিকায়ন বিষয়ে আলেম-ওলামাদের নিয়ে একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
যে কারণে কমিটি হয়নি: বৈঠকের ১৫ দিনের মধ্যে কমিশন গঠনের কথা থাকলেও গত ছয় মাসে তা গঠিত হয়নি। বেফাক ও সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে দ্বন্দ্বের পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা মেরুকরণও এ জন্য দায়ী। কয়েকটি দলের নেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে জোট হিসেবে আছে আরও কয়েকটি দল। সরকারের বিরোধী নেতারা স্পষ্ট করেই বলছেন, বর্তমান সরকারের হাত থেকে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি আসুক—এটা তাঁরা চান না।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার প্রথম আলোকে জানান, সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাদ্রাসার সংখ্যা কম থাকলেও কমিশনে তারা বেশি সদস্য দাবি করার কারণে জটিলতা কাটেনি।
অন্যদিকে সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, বেফাক আসলে এই সরকারের কাছ থেকে কিছু নিতে আগ্রহী নয়। সেটা প্রকাশ করতে পারে না বলে একেক সময় একেক কথা বলে।
রাজনৈতিক স্বার্থ: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলেমদের বৈঠকের পর কওমি মাদ্রাসাশিক্ষার উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এরপর আবার রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সমর্থক আলেমরা এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা বাদ দিয়ে আলেম-ওলামাদের আন্দোলনে নামার পরামর্শ দেন।
গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে বিএনপিপন্থী পেশাজীবী নেতা ও দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান আলেমদের উদ্দেশে বলেন, ‘বর্তমান সরকার আপনাদের আবেদন-নিবেদনে সাড়া দেবেন—এ রকম আপনারা চিন্তা করছেন কেন?’
২১ এপ্রিল জামায়াতে ইসলামীর এক সমাবেশে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা বলেন, ‘যেসব আলেম নামের কলঙ্ক দালালি করতে গেছেন, তাদের কাজ শেষ হলে টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেবে।’
বেফাকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন সদস্য বলেন, ‘চারদিকে নানা ঘটনা ঘটছে। বিভ্রান্তির কোনো শেষ নেই।’
২০০৬ সালে জোট সরকার কওমি সনদের স্বীকৃতি ঘোষণা করার আগেও রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। ঘোষণা আসবে—এটা নিশ্চিত হয়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রীতিমতো কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। ঘোষণার কয়েক দিন আগে খেলাফত মজলিস স্বীকৃতির দাবিতে মুক্তাঙ্গনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচিও পালন করে। অথচ দলটি সে সময় চারদলীয় জোটের শরিক ছিল। এর আগে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটও একাধিকবার এই স্বীকৃতির কৃতিত্ব দাবি করে।
নেই একক সংস্থা: কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণে কোনো একক সংস্থা নেই। বেফাকুল মাদারাসিল আরাবিয়ার অধীনে চার থেকে পাঁচ হাজার মাদ্রাসা আছে। গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গায় আঞ্চলিক বোর্ড বেফাকুল মাদারিস, বগুড়ায় উত্তরবঙ্গভিত্তিক তানজিমুল মাদারিস, চট্টগ্রামের পটিয়ার ইত্তেহাদুল মাদারিস এবং সিলেটের আজাদ-দ্বিনী এ দারা—এই চারটি আঞ্চলিক বোর্ড মিলে গঠিত ‘সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সংস্থা’র অধীনে প্রায় দুই হাজার মাদ্রাসা আছে।
সিলেট বিভাগের আজাদ-দ্বীনি এদারা (সিলেট বিভাগ), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এ দ্বারা এ তালিমিয়া, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও নরসিংদী এলাকার মাদানীনগর এ দ্বারা, সিলেটের জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাটের মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণের জন্য কানাইঘাট এ দ্বারা, দ্বীনি শিক্ষা বোর্ড নামের সংস্থা হবিগঞ্জের মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার জানিয়েছেন, ‘কোনো বোর্ডের আওতায় নেই, এমন মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় চার হাজার।’
আরও যত মাধ্যম ও পাঠক্রম: মূলত দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ধর্ম শিক্ষা দেওয়ার জন্য কওমি মাদ্রাসা ছাড়াও আছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে নূরানী, হাফিজিয়া বা ফোরকানিয়া ও মসজিদকেন্দ্রিক মক্তব উল্লেখযোগ্য।
নূরানী মাদ্রাসায় মূলত কোরআন পড়ার সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয়। হাফিজিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় কোরআন মুখস্থ করানো হয়।
বর্তমানে কওমি মাদ্রাসায় ১৩ বছর মেয়াদের শিক্ষা দেওয়া হয়। নূরানী মাদ্রাসায় দুই বা তিন বছর পড়ে ছাত্রছাত্রীরা হাফিজিয়া বা ফোরকানিয়ায় ভর্তি হয়। এ ছাড়া কেউ কেউ জামাত বিভাগে পড়াশোনা করে।
যারা নূরানীতে পড়াশোনা করে না, তারা প্রথম চার বছর ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। এটা প্রাথমিক শিক্ষা বলে পরিচিত। চার বছরের প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় জামাত বিভাগে। এখানে পরের নয় বছরে আরবি ব্যাকরণ, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফেকাহ, আরবি সাহিত্য প্রভৃতি পড়ানো হয়।
উপলব্ধি এসেছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে: কয়েক বছর ধরে জামাত বিভাগে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও ভূগোল পড়ানো হচ্ছে। তবে সরকারি পাঠক্রম পরিবর্তন করে নিজেদের মতো বইগুলো তৈরি করেছে বেফাক। বেফাকের মহাসচিব জানিয়েছেন, তাঁরা দশম শ্রেণী পর্যন্ত একে নিয়ে যেতে চান। ২০০৬ সালে বেফাক কওমি মাদ্রাসার পাঠক্রম প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ভূগোল, বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করে।
যশোরের জামেয়া ইসলামিয়া দড়াটানা মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা কোরআন-হাদিস শিক্ষার বাইরে সরকারি পাঠক্রমের দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যক্রমও অনুসরণ করছে।
সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সংস্থার মহাসচিব রুহুল আমিন জানিয়েছেন, তাঁদের অধীনে থাকা মাদ্রাসাগুলোর কোনোটাতে পঞ্চম শ্রেণী, কোনোটাতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার বইগুলো পড়ানো হয়। তবে যে মাদ্রাসাগুলো কোনো বোর্ডের অধীনে নয়, সেগুলোতে কোরআন-হাদিস শিক্ষার বাইরে কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না।

দেশ নিরক্ষরমুক্ত হবে কবে?

শরিফুজ্জামান

দেশ নিরক্ষরমুক্ত হবে কবে? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে একের পর এক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের দৃষ্টান্ত রয়েছে। মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকেই নিরক্ষরমুক্তির বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়। বাস্তবে গত দেড় যুগে দেশ নিরক্ষরমুক্ত হয়নি, তবে সরকার ও দাতা সংস্থার অঢেল টাকা খরচ হয়েছে ওই খাতে। নিরক্ষরতা ইস্যু নিয়ে দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও তাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ২০১৪ সাল।
এর আগে ২০০০ সালের মধ্যে দেশ নিরক্ষরমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগের সরকার। এরপর বিএনপির সরকার প্রথমে ২০০৩ সালের মধ্যে এবং পরে ২০০৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার করেছিল।
সরকারি ও বেসরকারি তথ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ‘শিক্ষিত’। তাঁরা লিখতে, পড়তে ও গুনতে পারেন। ‘শিক্ষিত’ হিসেবে গণ্য করার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী শিক্ষার এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
নব্বই-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্যসহ কয়েকটি প্রকল্প বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে সরকারি হিসাবে শিক্ষার হার ছিল ৩৮ থেকে ৪০ ভাগ। এখন ওই হার ৬২ ভাগ। অর্থাত্ সাক্ষরতার হার সরকারি হিসাবে বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে দেশে শিক্ষার বর্তমান হার ৪১ থেকে ৪২ শতাংশ। ২০০৫ সালে গণসাক্ষরতা অভিযান বলেছে, এই হার ৪১ দশমিক ৭। ইউনেসকো, ঢাকা এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের উদ্যোগে ২০০৫ সালে জাতীয় নমুনা জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে শতকরা মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘লিটারেসি অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে ২০০৮’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, ১১ বছর বয়স্কদের শিক্ষার গড় হার এখন ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৫ বছরের অধিক বয়স্কদের বেলায় ওই হার ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে নিরক্ষরতা নিয়েদুর্নীতিও হচ্ছে। দুর্নীতির মহোত্সব ঠেকাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৪ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। সরকারি মূল্যায়নে দেখা যায়, ৬৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত গণশিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপক সাফল্য প্রচার করা হলেও অবস্থাটা ছিল ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’-এর মতোই।
এর আগে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার বাড়ানো এবং ঝরে পড়া রোধে নব্বই-পরবর্তী বিএনপি সরকারের প্রধান কর্মসূচি ছিল ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’। প্রথম শিক্ষক, পরে ডিলারের মাধ্যমে চাল বা গম দিয়েও দুর্নীতি ঠেকানো যায়নি। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ উপবৃত্তি বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। দেখা যায়, চাল বা গম বিতরণে দুর্নীতি যতটা ছিল, নগদ টাকা দেওয়ার বেলায় তা তুলনামূলক কম। কিন্তু কে দরিদ্র, কে নয়—মফস্বলে এ প্রশ্নের সমাধান বেশ কঠিন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন কর্মসূচিও পরিত্যক্ত হয়েছে। প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন (টিএলএম) রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, লুটপাট, শুভঙ্করের ফাঁকি এবং অপচয়ের নজির স্থাপন করেছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে সাক্ষরতার হার দাবি করা হয়েছিল ৬৫ দশমিক ৫। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই হার অতিরঞ্জিত দাবি করে সরকারিভাবে তা ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ বলে জানানো হয়। জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের মেয়াদে সাক্ষরতার ওই হার উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, সাক্ষরতার হার পঞ্চাশের কাছাকাছি। ২০১৪ সালের মধ্যে এই হার সত্যিকার অর্থে শতভাগে উন্নীত হবে, না এটা আবারও অঙ্গীকার হয়ে থাকবে, সেটি এখন দেখার বিষয়।

আদালত নিষিদ্ধ করেছেন

নোট-গাইড ছাড়া যেন লেখাপড়াই হয় না!

ফয়জুল্লাহ মাহমুদ

গত জুন মাসে নোট ও গাইড বই সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন উচ্চ আদালত। রায়ে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির এক সদস্যের আবেদন খারিজ করা হয়েছে। ওই আবেদনে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নোটবই নিষিদ্ধ করে জারি থাকা আইনটি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছিল। নাম ভিন্ন হলেও একই ধরনের হওয়ায়, নোটবইয়ের সঙ্গে গাইড বইকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন আদালত। এর ফলে নোটের সঙ্গে গাইডও এখন নিষিদ্ধ।
নোটবই নিষিদ্ধ করে আইনটি করা হয়েছিল ১৯৮০ সালে। আইনে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের নোট মুদ্রণ, ছাপা, বাঁধাই, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রথম থেকেই আইনটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। মাঝেমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) আইনটির কথা মনে করিয়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এক বছর আগে এ ধরনের একটি বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতেই প্রকাশকেরা আদালতের আশ্রয় নেন।
পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা একাধিক বই পড়লে তো আরও বেশি শিখতে পারার কথা। কিন্তু নোট বা গাইড নামের এসব বইয়ে প্রশ্ন ও উত্তর লেখা থাকে। ছাত্রছাত্রীরা তা মুখস্থ করে। তাই একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির যতটা বিকাশ হওয়ার কথা, এগুলো পড়ে ততটা হয় না। তা ছাড়া এসব বই যাঁরা লেখেন তাঁদের দক্ষতা বা পেশাদারিত্ব থাকে না। কোন বয়সের শিশুকে কতটা জটিল শব্দ বা বাক্য শেখানো যাবে, এসব বইয়ে সেই ক্রমবিন্যাস অনুসরণ করা হয় না। তাই কোমলমতি শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি।
‘নোট-গাইডের ওপর এই নির্ভরশীলতা সাম্প্রতিক চিত্র নয়’—এ কথা জানিয়ে শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বললেন, “মূলত শিক্ষাব্যবস্থাই এ জন্য দায়ী। মুখস্থনির্ভরতার কারণেই নোট-গাইডের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কেননা, ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকেরা ‘পাস’-এর নিশ্চয়তা চান। মেধার বিকাশের চেয়ে ফলাফলটাই তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
শুধু ছাত্রছাত্রীদেরই নয়। অনেক শিক্ষককেও নোট-গাইডের ওপর নির্ভর করতে দেখা যায়। এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয় পড়াতে গিয়ে অনেকে এই সহায়তা নেন। ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে, অনেক শিক্ষক তাঁর ছাত্রছাত্রীকে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর নোট-গাইড কিনতে পরামর্শ দেন। অনেক স্কুল তো কী কী বই কিনতে হবে, সেই তালিকা দিয়ে দেয়। আর বই বিক্রেতারাও এ ধরনের বই কিনতে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের রীতিমতো বাধ্য করেন। অভিযোগ আছে এর বিনিময়ে তাঁরা টাকা বা অন্য কোনোভাবে সুবিধা পান প্রকাশকদের কাছ থেকে।
একজন প্রকাশক সাধারণত তিন ধরনের বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকেন। প্রথমত, তিনি বোর্ডের বই ছাপেন, ওই বইয়ের নোট বা গাইড প্রকাশ করেন। আর প্রকাশ করেন বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণসহ সহপাঠ বই। বোর্ডের বইয়ের দাম সরকার ঠিক করে দেয়; প্রকাশক ও বিক্রেতারা নির্দিষ্ট কমিশন পান; এখানে লাভ কম। লাভ বেশি নোট, গাইড ও সহপাঠে। এর দাম তাঁরা নিজেরাই ঠিক করে নেন। মূল বইয়ের চেয়ে এর দাম কয়েক গুণ বেশি। বোর্ডের ষষ্ঠ শ্রেণীর একটি বইয়ের দাম যেখানে ২৪ টাকা ৬০ পয়সা, সেখানে ওই বিষয়ের নোট বা গাইডের দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত। একেক প্রকাশনীর নোট-গাইডের দাম একেক রকম। প্রকাশকেরা এই বাড়তি লাভেরই ভাগ দেন একশ্রেণীর শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে। এমনকি বিভিন্ন শিক্ষক সমিতির নেতারাও এ ধরনের প্রকাশকদের কাছ থেকে সুবিধা নেন বলে অভিযোগ আছে।
নোট-গাইডের যাঁরা ব্যবসা করেন, তাঁদের কাছ থেকে জানা গেছে, মাধ্যমিক স্তরে যত পাঠ্যবই ছাপা হয়, নোট-গাইডও ছাপা হয় প্রায় সমানসংখ্যক। এ বছর মাধ্যমিকে পাঠ্যবইয়ের চাহিদা ছিল সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সাধারণত একটি নোট বা গাইড বই মূল বইয়ের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। সে হিসাবে নোট-গাইডের বাজার সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বলে তাঁরা মনে করেন।
বই বিক্রির মৌসুমে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় গাইড বইয়ের চটকদার বিজ্ঞাপন। এর বিপরীতে আইনটি প্রয়োগের প্রচেষ্টা থাকে দায়সারা। কর্তৃপক্ষের সেই উদ্যোগও দমিয়ে রাখতে অনেক বেশি তত্পর থাকেন ব্যবসায়ীরা।
অবশ্য গত দুই দশকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টাও কিন্তু কম হয়নি। ১৯৯০ সালে সিদ্ধান্ত হলো এসএসসিতে ‘নৈর্ব্যক্তিক’ প্রশ্ন চালুর। অর্ধেক অর্থাত্ ১০০-এর মধ্যে ৫০ নম্বরের জন্য এ ধরনের প্রশ্নে প্রথম এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া হলো ১৯৯২ সালে। একটি বিষয়ে ৫০০টির প্রশ্ন-ব্যাংক থেকে প্রশ্ন করা হলো কয়েক বছর। এরপর প্রশ্ন-ব্যাংক তুলে নেওয়া হয়। ইংরেজি শিক্ষাকে আধুনিক করতে চালু হলো ‘কমিউনিকেটিভ’ ইংরেজি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল হলো না। এরপর প্রচলিত ফল পদ্ধতি পাল্টিয়ে চালু হলো গ্রেডিং পদ্ধতি। এছাড়া গত অর্ধযুগ ধরে চলছে একমুখী শিক্ষার তোড়জোড়। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে মাধ্যমিকের পাঠ্যবই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা থেমে গেছে। কঠোর সমালোচনার মুখে গত চার বছর ধরে থেমে আছে একমুখী শিক্ষা। আর পাঠ্যবই বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া নিশ্চিত করতে পারেনি। স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন বা ‘এসবিএ’ নামের একটি পদ্ধতিতে ১০০ নম্বরের বিষয়ের ৩০ নম্বর শিক্ষকদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীদের সারা বছরের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে শিক্ষকেরা ওই নম্বর দেবেন। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও চলছে ঢিমেতালে। শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তনের সর্বশেষ উদ্যোগ সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি।
সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে চারটি অংশ থাকবে, যা সহজ থেকে ক্রমে জটিল হবে। যাচাই করা হবে শিক্ষার্থীদের স্মরণশক্তি, অনুধাবনক্ষমতা, জ্ঞানের প্রয়োগ ও বিশ্লেষণক্ষমতা। এটা চালু করতে যাওয়ায় বিরোধিতার মুখে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। করণীয় ঠিক করতে তখন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয় গত বছর। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, আগামী বছরের ২০১০ সালে এসএসসিতে বাংলা ও ধর্ম—এই দুটো বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা হবে। পরের বছর প্রতিটি শাখায় আরও দুটি করে বিষয় এই পদ্ধতির আওতায় আসবে। আশ্চর্যজনক বিষয়টি হচ্ছে, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে মুখস্থ করার প্রবণতা এবং নোট-গাইডনির্ভরতা কমবে বলা হলেও ইতিমধ্যেই বাজারে এ ধরনের গাইড ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘চাইলে যে-কেউ এ ধরনের গাইড বের করতে পারে, তবে তাতে বিশেষ কোনো ফল হবে না।’ আগামী বছরের পাঠ্যবইয়ে প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে সৃজনশীল প্রশ্নের কিছু নমুনা সংযোজন করার সুপারিশ করতে যাচ্ছেন তাঁরা। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি পুরোপুরি চালু করা গেলে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি আমূল বদলে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশপুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা নোট-গাইড কেন পড়ে, তা আগে খুঁজে দেখা দরকার। শ্রেণীকক্ষে লেখাপড়ার পরিবেশ ফিরে এলে শিক্ষার্থীকে এ ধরনের বই পড়তে হবে না।’

সাক্ষাত্কারে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক

শিক্ষানীতিটি ভালো, তবে কিছু বিষয় গোলমেলে

সাক্ষাত্কার নিয়েছেন শরিফুজ্জামান

প্রথম আলো: দেশে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে। আমাদের এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?
ওসমান ফারুক: জনসংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। শিক্ষার্থী বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার ক্ষতি করছে। শিক্ষিত বেকার পুনর্বাসনের জন্য, কেউ বা নামের মোহে, কেউ কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। প্রয়োজনীয়তা, প্রাপ্যতা ও নীতি অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়নি। এখন দরকার ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
প্রথম আলো: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিতের একটা উপায় তো এমপিওভুক্তি। কিন্তু এমপিওভুক্তি নিয়ে তো ব্যাপক সমালোচনা চলে আসছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
ওসমান ফারুক: এমপিওভুক্তির সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হওয়ায় এটা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এই রাজনীতি ও দুর্নীতি মিলে পুরো বিষয়টি বিতর্কিত করে তুলেছে। সুষ্ঠুভাবে এমপিওভুক্তি সম্ভব নয় বলে ২০০৩ সালের পর এমপিওভুক্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটা এখন পর্যন্ত বহাল আছে। শোনা যাচ্ছে, এবার কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। দেখা যাক, কী হয়।
প্রথম আলো: এমপিওভুক্তি সুষ্ঠু না হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা কী?
ওসমান ফারুক: সুপারিশ বা তদবির। এমন সাংসদ আছেন, যিনি একাই ৫০ থেকে ১০০টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সুপারিশ করেন। শুধু সুপারিশ নয়, বিভিন্ন উপায়ে চাপ তৈরি করেন। জোট সরকারের শুরুর দিকে মাত্র একবার এমপিও দেওয়া হয়। তখন পুরো আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে এমপিওভুক্তির তালিকা চূড়ান্ত হয়ে আসে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না।
প্রথম আলো: নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?
ওসমান ফারুক: সরকার এখন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শতভাগ বেতন দেয়। পৃথিবীতে এমন ব্যবস্থা কোথাও আছে কি না সন্দেহ। তবে সরকার টাকা দিলেও স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়টি খুব ভালো। কিন্তু এর মধ্যে রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বার্থ ঢুকে পড়ায় বিষয়টি গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। আমার মনে হয়, যেহেতু সরকার শতভাগ বেতন দিচ্ছে, তাই একবারে না হলেও পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের দিকে যাওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে অযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদ দিতে হবে। আর এটা যত দিন না করা যায়, তত দিন এমপিওর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার শর্ত জুড়ে দেওয়া যেতে পারে। অর্থাত্ একবার এমপিওভুক্ত হলে সেটা যেন চিরস্থায়ী না হয়। এটা বজায় রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার মান, পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারসহ বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা উচিত।
প্রথম আলো: আপনার দৃষ্টিতে প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি কেমন হয়েছে? এটা কি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে?
ওসমান ফারুক: শিক্ষানীতির খসড়াটি বেশ ভালো। এর বর্ণনা সাধারণ মানুষ পড়েও বুঝবে। তবে কিছু বিষয় নিয়ে আমার আপত্তি আছে। বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। নীতিগতভাবে এটা সমর্থন করি, প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করতে পারলে ভালো। কিন্তু এটা অনিবার্য নয়, বাস্তবে এটা অসম্ভবও বটে। কারণ ৮০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। ওই সব বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং পুরোনো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই টাকা অবকাঠামোর বদলে শিক্ষার মানোন্নয়নে খরচ করা যেতে পারে। বিদ্যালয়কে শিশুর কাছে আকর্ষণীয় করা, বৈদ্যুতিক পাখা দেওয়া, বসার ব্যবস্থা করাসহ এখন পর্যন্ত অনেক কাজই বাকি আছে। প্রাথমিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০ করতে হবে। এ ছাড়া চারজন শিক্ষক দিয়ে একটি বিদ্যালয় চলতে পারে না। কারণ এই চারজনের মধ্যে ছুটি, অসুস্থতা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কারণে এক বা একাধিক শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন।
প্রথম আলো: শিক্ষানীতির কিছু বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে। এর যৌক্তিকতা কতটুকু?
ওসমান ফারুক: ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধান, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলো শিক্ষানীতিতে গোলমাল করে ফেলা হয়েছে। এমনিতেই বিষয়গুলো স্পর্শকাতর। সে জন্য সতর্কভাবে শব্দচয়ন এবং নীতি ঠিক করা প্রয়োজন ছিল। কিছুদিন আগে আমি নিজের জেলা কিশোরগঞ্জে গিয়েছিলাম। দেখলাম, সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মশিক্ষা নিয়ে অনেক ক্ষোভ। কেউ বা বুঝে, কেউ কেউ না বুঝে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করছে। প্রকৃতপক্ষে নবম-দশম শ্রেণীর পর ধর্ম শিক্ষা থাকছে না। ঐচ্ছিকভাবে থাকলেও এ রকম বিষয় আরও আট-দশটি রয়েছে। সুতরাং নবম-দশম শ্রেণীর পর ধর্ম শিক্ষার গুরুত্ব কমছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, ধর্ম শিক্ষা বুঝি উঠেই যাচ্ছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
প্রথম আলো: শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকের ভূমিকা যথেষ্ট কি না।
ওসমান ফারুক: আমরা সবাই চাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক আসুক। কিন্তু অনেক বছর ধরে অযোগ্য ব্যক্তিরাই এই পেশায় আসছেন। এটা ঠেকাতে জোট সরকারের সময় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) গঠন করা হয়। এখন ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে তাঁকে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হচ্ছে। আমার মনে হয়, প্রাথমিকেও এ ধরনের কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে এমন প্রস্তাব রয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষক নিয়োগ-প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করা যায়, তাহলে শিক্ষায় এর প্রভাব পড়বেই।
প্রথম আলো: সম্প্রতি মন্ত্রিসভা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুমোদন করেছে। এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ওসমান ফারুক: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান আইনটির বিভিন্ন দুর্বলতা রয়েছে। আইনে বলা আছে, পাঁচ কোটি টাকা, পাঁচ একর জমি এবং পাঁচ বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করতে হবে। আজকের যুগে এসব শর্ত যথেষ্ট নয়। এর সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিম্নমানের শিক্ষা দিচ্ছে। দূরশিক্ষণ ও আউটার ক্যাম্পাসে শিক্ষার নামে স্রেফ প্রতারণা করা হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কেন ভর্তি হয়, সেটি আমারও প্রশ্ন। শিক্ষামন্ত্রী থাকার সময় আমার জেলায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা খুলে প্রতারণা করা হয়েছিল। পরে অবশ্য সেটি বন্ধ হয়। এ রকম সারা দেশে অনেক শাখা খোলা হয়েছে। এগুলো বন্ধ করা দরকার।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া জোট সরকারের সময় শুরু হয়েছিল। তখন পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়। শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বোঝার জন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও অবস্থান নিরূপণ করে দেওয়া হয়। এত কিছুর পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে নিয়মনীতির আওতায় এসেছিল তা নয়। এখনো অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম, প্রতারণা ও অনৈতিক বাণিজ্য করে যাচ্ছে। এদের কারণে ভালো মানের শিক্ষা দেওয়া আট-দশটি বিশ্ববিদ্যালয় বদনামের ভাগীদার হচ্ছে। আমার মনে হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা হলে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই সাবধান হয়ে যাবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও অবস্থান খারাপ হলে সেখানে টাকা খরচ করে কেউ ভর্তি হবে না।
প্রথম আলো: শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আপনার ব্যর্থতা ও সফলতা মূল্যায়ন করুন।
ওসমান ফারুক: ব্যর্থতা ঠিক নয়, আরও কিছু কাজ করতে চেয়েছিলাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক নিয়োগ দিতে চেয়েছিলাম। এ ছাড়া প্রতি জেলায় একটি ভালো স্কুল এবং ঢাকায় ১১টি মডেল স্কুল করার চেষ্টা করেছিলাম। সেগুলো পরে আর ঠিকমতো এগোয়নি। সরকারের শেষ ভাগে এসে একমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা হয়তো ভুল ছিল। যারা এটা বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল, তাদের কাজকর্মে কিছুটা ঢিলেমি ছিল। এর পরও চেয়েছিলাম ধীরে ধীরে এর বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু সরকারের একটি অংশ এটা বন্ধ করার পক্ষে অবস্থান নেয়। বাস্তবতা হচ্ছে, একমুখী শিক্ষা আজ হোক, কাল হোক—চালু করতেই হবে।
আর সফলতা হচ্ছে, সময়মতো পাঠ্যবই দেওয়া। ক্ষমতায় থাকাকালে বই নিয়ে হইচই হয়নি। আর শিক্ষায় আজকের যতটুকু সফলতা, তা নকল বন্ধের জন্য এসেছে। শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে ফিরেছে। এমপিও বন্ধ করাসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষকদের দুর্নীতিবাজ অংশ অসাধু উপায় অবলম্বনে শিক্ষার্থীকে সহায়তা করে না।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
ওসমান ফারুক: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা।

কোচিং সেন্টারগুলোর নানান কেচ্ছা

সাইফুল সামিন ও আলী আসিফ

দেশের নামীদামি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনার অন্ত থাকে না। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সারা দেশে কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার। প্রতিটি কোচিং সেন্টারই নিজেদের দেশের শ্রেষ্ঠ কোচিং সেন্টার বলে দাবি করছে। এসব কোচিং সেন্টার শিক্ষার্থীদের টানতে নানা প্রলোভন ও অপকৌশলেরও আশ্রয় নিচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভুয়া ভর্তিসহ নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে। অভিযোগ এসেছে মেধাবীদের জোর করে নিজেদের ছাত্র বলে জাহির করার জন্য কোচিং সেন্টার কর্তৃক হুমকি প্রদর্শনেরও।
কোচিং সেন্টারের ছড়াছড়ি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং সেন্টারগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি কোচিং সেন্টার (ইউসিসি), ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির-সুমন), ইউনিএইড (মনির-মল্লিক-জহির), লিডস ভার্সিটি কোচিং সেন্টার, পজিট্রন বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টার, ঢাকা কোচিং, ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টার, ক্যাম্পাস, অ্যাডমিশন এইড, সানরাইজ ইত্যাদি। মেডিকেল কলেজ ও বুয়েটে ভর্তির কোচিং সেন্টারগুলোর মধ্যে রয়েছে সানরাইজ, ওমেকা, শুভেচ্ছা, রেটিনা, ম্যাক, থ্রি ডক্টরস ইত্যাদি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই কোচিং সেন্টারগুলোর শাখা রয়েছে।
সবাই সেরা: ইউনিভার্সিটি কোচিং সেন্টার (ইউসিসি) তাদের প্রসপেক্টাসে দাবি করেছে, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম মেধা স্থানসহ দুই হাজার ৫৮৭ জনকে ভর্তি করিয়ে বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছে তারা। এ ছাড়া ২৪ বছর ধরে তারা সাফল্যের শীর্ষে রয়েছে। ইউসিসির দাবি অনুযায়ী, তারা ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫ সালের টেলিভিশন-দর্শক অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ কোচিং নির্বাচিত হয়েছে।
ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির ও সুমন) তাদের প্রসপেক্টাসে দাবি করেছে, সাফল্যে তারাই শীর্ষে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছরের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম থেকে দশম স্থানসহ এক হাজার ৭৩৩ জনের বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছে।
তবে এই ধরনের জরিপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে একই রকম আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইউনিএইড (মনির-মল্লিক-জহির)। তাদের প্রসপেক্টাসে লেখা হয়েছে, ‘কোমলমতি ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের অনেকেই বিভিন্ন কোচিংয়ের মনগড়া ও অপ্রাসঙ্গিক জরিপের ফলাফলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। জরিপের ফলাফলকে কোচিং নির্বাচনের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে তারা প্রতারিত হয়।’
লিডস ভার্সিটি কোচিং তাদের প্রসপেক্টাসে দাবি করেছে, গত বছর গোল্ডেন ব্যাচে তাদের সাফল্য ৯০ শতাংশ এবং এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টার। ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং দাবি করেছে, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ৪৮৬ জনের সাফল্য পেয়েছে তারা। ইউনিএইড (মনির-মল্লিক-জহির) দাবি করেছে, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে তাদের কোচিং নিয়ে এক হাজার ৩৬৬ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
ওমেকা দাবি করেছে, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে আটজনসহ তারা ৮৪৫ জনের সাফল্য পেয়েছে। সানরাইজ দাবি করেছে, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে আটজনসহ তারা ৭৫২ জনের সাফল্য পেয়েছে।
সাফল্যের দাবি মোট আসনের চেয়ে বেশি: এই দাবি অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ভর্তি হয়েছেন নয় হাজার ৪০৪ জন শিক্ষার্থী। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ ও ‘ঘ’—এই চারটি ইউনিটে গত বছর আসনসংখ্যা ছিল চার হাজার ৭২৩টি। সানরাইজ ও ওমেকার হিসাব অনুযায়ী, বুয়েটে গত বছর ভর্তি হয়েছেন ১৫৯৭ জন শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা বুয়েটের মোট আসনের প্রায় দ্বিগুণ।
মেধাবী তুমি কার: গত শিক্ষাবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটে ২৩তম মো. মাসুদুর রহমান এবং ৫৪তম সাম্য সানন্দ সাহাকে ইউসিসি, ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির ও সুমন) ও সানরাইজ নিজেদের শিক্ষার্থী বলে দাবি করে প্রসপেক্টাসে তাঁর ছবি ছেপেছে।
‘খ’ ইউনিটে দুজন প্রথম স্থান অধিকারীর নাম পাওয়া গেছে। ইউসিসি তাদের প্রসপেক্টাসে খ ইউনিটে মহিউদ্দিন শামস রিফাতকে লিখিত পরীক্ষায় প্রথম এবং ফোকাস কোচিং তাদের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমানকে সম্মিলিত ফলাফলে প্রথম বলে দাবি করেছে। তৃতীয় ও অষ্টম স্থান পাওয়া মো. আসাদুজ্জামান এবং মো. রেজাউল করিমকে নিজেদের ছাত্র বলে দাবি করেছে ইউসিসি, ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির ও সুমন) ও ইউনিএইড (মনির-মল্লিক-জহির)। দশম স্থান পাওয়া মুহাম্মদ শরীফুল হককে নিজেদের ছাত্র বলে দাবি করেছে চারটি কোচিং সেন্টার।
এ ব্যাপারে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ইউনিএইড নামের একটি কোচিং সেন্টার প্রথমে আমাকে টাকার বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু সে প্রস্তাবে আমি রাজি না হওয়ায় তারা আমাকে হুমকি দিয়ে জোর করে ছবি ও তথ্য আদায়ের চেষ্টা চালায়।’
‘গ’ ইউনিটে দ্বিতীয় লীনা বিনতে আতাউর রহমানকে নিজেদের শিক্ষার্থী বলে দাবি করেছে ফোকাস ও ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির) এবং এর পক্ষে উভয় কোচিং সেন্টার লীনার নিজ হাতে পূরণ করা কোচিং সেন্টারের ফরমও ছাপিয়ে দিয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে লীনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার বড় বোন মোনা বিনতে আতাউর রহমান জানান, লীনা শুধু একটি কোচিং সেন্টারেই ক্লাস করেছে।
‘ঘ’ ইউনিটে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে দ্বিতীয় হওয়া আলী এহসান সিফাতকে নিজেদের ছাত্র বলে দাবি করেছে ইউসিসি ও ইউনিএইড নামের দুটি আলাদা কোচিং সেন্টার। তবে সিফাত জানান, তিনি কেবল ইউনিএইডে (মনির-মল্লিক-জহির) কোচিং করেছেন। তৃতীয় স্থান পাওয়া মো. ইফতেখার রহমানকে নিজেদের ছাত্র বলে দাবি করেছে লিডস, ইউসিসি ও দুই ইউনিএইড।
গত বছর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনকারী কে. এম. শিহাব উদ্দিনকে নিজেদের ছাত্র দাবি করেছে ওমেকা ও সানরাইজ কোচিং সেন্টার। তবে শিহাব ওমেকার প্রসপেক্টাসে ছাপা হওয়া লিখিতপত্রে উল্লেখ করেছেন, তিনি শুধু ওমেকাতেই কোচিং করেছেন এবং সানরাইজে মডেল টেস্ট দিয়েছেন। তবে সানরাইজের প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত পত্রে তিনি লিখেছেন, তিনি সানরাইজ ছাড়াও ওমেকাতে কোচিং করেছেন।
ছবি ছাপাতে যত প্রতারণা: ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া ছাত্র মো. আমিরুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার ফরম কেনার সময় ইউসিসি, হলের বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির) ও অ্যাডমিশন প্লাস আমার ছবি সংগ্রহ করেছে। আমি এ কোচিং সেন্টারগুলোর কোনোটিতেই কোচিং করিনি।’
‘খ’ ইউনিটে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম হওয়া আতিকুর রহমান জানান, ইউনিএইড নামের একটি কোচিং সেন্টার তাঁকে এক লাখ টাকা দিতে চেয়েছিল; কিন্তু তিনি তাদের সে প্রস্তাবে রাজি হননি।
ছবি ছাপাতে কোচিং সেন্টারগুলোর প্রতারণার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের প্রসপেক্টাসে ছাপানো মেধাবী ছাত্রদের ছবির মধ্যে অমিল, তথ্যের গরমিল ও বিভ্রাট ইত্যাদির মাধ্যমে। বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের প্রসপেক্টাসে ছাপা হওয়া একই শিক্ষার্থীর নাম ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। একই মেধাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার্থীর নামসহ ছবিও পাওয়া গেছে।
শিক্ষার্থী টানতে লোভনীয় পুরস্কার: উচ্চমাধ্যমিক শেষ করা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভর্তি কোচিং সেন্টারে টানার কৌশল হিসেবে কোচিং সেন্টারগুলো মেধাবীদের সংবর্ধনা, বৃত্তি প্রদান, পাঁচতারকা হোটেলে ভোজ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদি লোভনীয় পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ কোচিং সেন্টারের ছাত্র বানানোর জন্য কোচিং সেন্টারগুলো একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। ইউনিএইড (মনির-মল্লিক-জহির) তাদের প্রপ্রেক্টাসে উল্লেখ করেছে, ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনকারীর জন্য ল্যাপটপ পুরস্কার; ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির ও সুমন) তাদের প্রথম স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার উপহার দেয়। ফোকাস তাদের সেরা শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ এবং অন্য কম্পিউটার প্রদান করে।
যেমন খুশি বাড়ে কোর্স ফি: ইউনিএইড (কিরণ-জাহান-কবির ও সুমন), ইউনিএইড (মনির-মল্লিক-জহির) এবং ইউসিসিতে প্রতি ইউনিটে জনপ্রতি আট হাজার টাকা এবং দুই ইউনিটে ১১ হাজার ৫০০ টাকা করে এ শিক্ষাবর্ষে কোর্স ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ইউসিসি এই কোর্স ফির সঙ্গে ভ্যাট বাবদ অতিরিক্ত ফি আদায় করে।
লিডস ভার্সিটি কোচিংয়ে প্রত্যেক ইউনিটে জনপ্রতি আট হাজার ৫০০ টাকা এবং একসঙ্গে ‘গ’ ও ‘ঘ’ ইউনিটে ১০ হাজার টাকা ও ‘ক’ ও ‘ঘ’ ইউনিটে ১২ হাজার টাকা করে কোর্স ফি নেওয়া হয়। এর বাইরেও কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে আরও টাকা হাতিয়ে নেয়।
মেডিকেল অ্যাডমিশন কোচিংয়ের (ম্যাক প্রোগ্রাম) সব কটি কোচিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে একজন শিক্ষার্থীকে প্রায় ২৫ হাজার টাকা গুনতে হয় বলে এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন। থ্রি ডক্টরস একাডেমি নামের মেডিকেলে ভর্তি কোচিং সেন্টারে নিয়মিত ব্যাচে জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা এবং গোল্ডেন ব্যাচে ২৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। ওমেকা অ্যাডমিশন কোচিংয়ে প্রকৌশল কিংবা মেডিকেল ভর্তি কোচিং ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা করে রাখা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইয়াসিন রাসেলের অভিযোগ, ‘কোচিং সেন্টারগুলো তাদের ইচ্ছামতো কোর্স ফি নির্ধারণ ও প্রতিবছর এই ফির হার বাড়িয়েছে। কয়েক মাসের জন্য যে পরিমাণ কোচিং ফি তারা নেয়, তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এ ছাড়া কোচিং সেন্টারগুলো প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা আয় করলেও সরকারকে ঠিকভাবে কর দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত এবং এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালা থাকা উচিত।’
কোর্স ফি নির্ধারণের মাপকাঠির বিষয়ে জানতে চাইলে ইউসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহিদুজ্জামান রুবেল জানান, ‘কোনো নীতিমালা নয়, বরং চলমান দ্রব্যমূল্য ও সামাজিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আমরা কোর্স ফি নির্ধারণ করে থাকি।’
প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা দুর্নীতির অভিযোগ: বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভুয়া ভর্তিসহ বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলোর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনিয়মের অভিযোগও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুয়া ভর্তির সঙ্গে একটি কোচিং সেন্টারের পরিচালকের জড়িত থাকার বিষয়ে এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনের প্রাক্কালে ইউসিসি কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিপুল পরিমাণ ভোটার পরিচয়পত্র উদ্ধার করে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম ক্রয়ে দুর্নীতি করার অপরাধে ইউসিসি কুমিল্লা শাখার কর্মচারী ফেরদৌসকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশে সোপর্দ করে বলে প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপনকে প্রতিবেদন বলে প্রচার: বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টার (ইউসিসি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রসপেক্টাসের নয় নম্বর পৃষ্ঠায় ‘উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইউসিসির অবদান নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টিং’ নামের একটি ফটো যুক্ত করেছে। এতে বিভিন্ন সময়ে তাদের সাফল্যের সাফাই গেয়ে যেসব বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে, তাকে প্রতিবেদন হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এই বিজ্ঞাপনকে অনেক শিক্ষার্থীই পত্রিকার প্রতিবেদন মনে করে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কোচিং সেন্টার বলে পরিচিত ফোকাস কোচিংয়ের প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত উপদেষ্টামণ্ডলীর তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন চৌধুরী মাহমুদ হাসান; ব্যাংকিং বিভাগের চেয়ারম্যান এম মুজাহিদুল ইসলাম; কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. হায়দার আলী; সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান চৌধুরী এবং ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রবের নাম পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ইউসিসিতে অতিথি শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ক্লাস নেন বলে একটি সূত্র থেকে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে বাংলা বিভাগের সৌমিত্র শেখর ও উপল তালুকদারের নাম রয়েছে। তবে সৌমিত্র শেখর এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পর থেকে ইউসিসির সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ অপরদিকে ইউসিসির ছাত্র পরিচয় দিয়ে উপল তালুকদারের সঙ্গে কথা বলে ইউসিসিতে তাঁর ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে পরে ইউসিসিতে যোগাযোগ করা হলে তারাও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শিক্ষাবিদদের মতামত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার জন্য কোচিং সেন্টারগুলো চালু হলেও এখন শিক্ষার্থীরা এসব কোচিং সেন্টারগুলোর মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। প্রায় সময়ই তাদের নামে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জাল আবেদনপত্র মুদ্রণসহ বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যায়।’ এই সমস্যাগুলো নিরসনে কোচিং সেন্টারগুলোর জন্য সরকারের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকের একাধিক কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোচিং সেন্টারগুলোকে আমি কখনোই নীতিগতভাবে সমর্থন করি না। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই নয়, শিক্ষার্থীদেরও উচিত এই কোচিং সেন্টারগুলো এড়িয়ে চলা।’

বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর আড়ালে যা কিছু হয়

আনোয়ার হোসেন

‘চাকরিসহ স্টুডেন্ট ভিসা। ইউএসএ, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, স্কটল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড। পড়াশোনায় গ্যাপ গ্রহণযোগ্য—রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় রশি দিয়ে টানানো একটি ব্যানার জাতীয় বিজ্ঞাপনের ভাষা এ রকমেরই। বিজ্ঞাপনদাতা ল্যামবার্ডস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই বিজ্ঞাপনে চীনে বাংলাদেশের চেয়েও কম খরচে ডাক্তারি ডিগ্রি লাভের সুযোগের কথা লিখতেও ভোলেননি বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানটি।
এ ধরনের হাজারো বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে রাজধানীর অলিগলি আর রাজপথে। এসব চটকদার বিজ্ঞাপনের লক্ষ্যবস্তু যুবসমাজ। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করাই তাদের বাহ্যিক উদ্দেশ্য। আসলে উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশে পাঠানোর আড়ালে ‘আদম ব্যবসায়’ নেমেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। তাঁদের পাল্লায় পড়ে অনেকে খুইয়েছেন সর্বস্ব। লাখ লাখ টাকা জমা দিয়ে বিদেশে যেতে পারেননি। গেলেও তাঁদের অনেকেই এখন ঘুরছেন বিদেশের রাস্তায় রাস্তায়।
মুনতাসির বিল্লাহ নামের একজন ভুক্তভোগী অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম আলোকে জানান, তাঁকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে ভর্তি করে দেওয়ার কথা বলে সেখানে পাঠানো হয়। কিন্তু গিয়ে দেখেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে অন্য এক প্রতিষ্ঠানে তাঁকে পাঠানো হয়েছে। তিন কক্ষের একটি ক্যাম্পাস।
জানা যায়, উচ্চশিক্ষার নামে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। সিটি করপোরেশন থেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারা এই প্রতারণামূলক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জানান, বিজ্ঞাপনগুলোতে উন্নত দেশে পাঠানোর কথা উল্লেখ থাকায় শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত যুবকেরা পড়াশোনার আড়ালে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রতারকদের কাছে ধরনা দিয়ে থাকেন। কিছু প্রতিষ্ঠান এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদেরও বিদেশে পাঠানো হবে বলে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে।
রাজধানীর পান্থপথ, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, মৌচাক এলাকাতেই শ-খানেক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও কার্যালয় চোখে পড়ে। এগুলো পরিচালনার কোনো নীতিমালা নেই, সরকারি নিয়ন্ত্রণও নেই।
এ ব্যাপারে ল্যামবার্ডসের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাইদ আহম্মেদ শামস প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক বাংলাদেশি, সেগুলোতে পাঠালে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবকিছু হয় না। তিনি জানান, সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স নিয়ে সারা দেশে অন্তত ১০ হাজার প্রতিষ্ঠান বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর কাজ করছে। লাইসেন্সবিহীন এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে আরও অন্তত পাঁচ হাজার।
সূত্র জানায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা নির্দিষ্ট একটি দেশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সে অনুযায়ী এই বলে প্রচার শুরু করে যে, নির্দিষ্ট ওই দেশে চাকরি ও পড়াশোনা—দুটোই সহজে চালানো যায়। সে অনুযায়ী পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেওয়া, দেয়াললিখন ও সাইনবোর্ডের মাধ্যমে একযোগে প্রচার-প্রচারণার কাজ চলে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাজ্য। মাঝখানে বেশ কয়েক বছর আলোচনায় ছিল সাইপ্রাসে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়ামের মতো দেশও ‘পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি’প্রার্থীদের কাছে ছিল বহুল আলোচিত লোভনীয় নাম হয়ে উঠেছে।
‘অ্যামবিশন প্লাস কনসালট্যান্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা প্রায় অর্ধশত ছাত্র সর্বস্ব খুইয়ে এখন প্রতারকদের খুঁজছেন। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর নামে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ করে টাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা পালিয়ে যায় মাস কয়েক আগে। রাজধানীর ধানমন্ডি, সিলেট ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় ছিল।
প্রতারিত শিক্ষার্থীদের একজন কাজী হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এবং তাঁর খালাতো ভাই আসাদুজ্জামান জমি বিক্রি করে পোল্যান্ডে যাওয়ার জন্য চার লাখ টাকা করে দেন। তিন মাসের মধ্যে বিদেশে পাঠানোর কথা দিয়েছিল অ্যামবিশন প্লাস। কিন্তু ছয় মাসেও বিদেশে যেতে না পেরে এখন টাকা ফেরত চান তাঁরা। এর পরপরই আত্মগোপন করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হকসহ অন্যরা। তিনি অভিযোগ করেন, গত মার্চ মাসে এনামুল হককে ফার্মগেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেও ছেড়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আগ্রহী ব্যক্তিরা তথ্য জানতে এলে তাঁদের নানাভাবে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়। তিন মাসের মধ্যে বিদেশে পাঠানো হবে—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়ার পর তাঁদের ঘোরানো থাকে। একপর্যায়ে বলা হয়, যে কলেজে ভর্তির জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে, সেই কলেজের সঙ্গে তাদের সমস্যা চলছে। অন্য কলেজে ভর্তির জন্য চেষ্টা চলছে। এভাবে একপর্যায়ে তারা গা ঢাকা দেয়।
আব্দুস সালাম নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ‘ভিসা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান লন্ডনের স্কুল অব ইনফরমেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা নেয়। এটি ছিল ‘এ’ গ্রেডের কলেজ। কিন্তু কয়েক মাস ঘোরানোর পর তাঁকে না জানিয়ে এসেক্সে ‘বি’ গ্রেডের কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে। টাকা জমা দিয়ে দেওয়ার কারণে তিনি আর না করতে পারেননি। প্রায় ৩০০ লোকের কাছ থেকে এভাবে টাকা নিয়ে কলেজ বদল করে ফেলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এই বিষয়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কাউন্সিলর পরিচয় দেওয়া শাহীনুর আক্তার বলেন, অভিযোগকারীদের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার পর তাঁরা বলতে পারবেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কামরুল হাসান পুরানা পল্টনে ‘ইউনাইটেড ফরেন অ্যাডমিশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ রকমের একটা রফা করেন যে, তাঁকে লন্ডনে পাঠানোর জন্য স্পন্সর জোগাড় করে দেবে ওই প্রতিষ্ঠান। বিনিময়ে ৮০ হাজার টাকা দেন তিনি। গত বছরের আগস্ট মাসের ঘটনা এটি। এক বছর পেরিয়ে গেলেও কামরুল হাসানের লন্ডনে যাওয়া হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী এখনো টাকা ফেরত পাননি তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ‘ইউনাইটেড অ্যাডমিশন’-এর মহাব্যবস্থাপক বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সর দেওয়া হয় না। একান্ত পরিচিত কেউ হলে অনেক সময় করা হয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশের বাইরে। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
বিদেশে ছাত্র পাঠানোর নামে প্রতারণা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে খুব একটা করণীয় কিছু নেই। কারণ যারা যায় এবং যারা পাঠায়—কেউই মন্ত্রণালয়ের কাছে আসে না। সে ক্ষেত্রে টাকা খরচ করে যারা যাবে, তাদের সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লোনা জলে জীবিকার সন্ধান

এম জসীম উদ্দীন, বরগুনা

দুপুর গড়িয়ে গেছে। হন্তদন্ত হয়ে একঝাঁক শিশু নেমে পড়েছে নদীতে। ওদের হাতে একদণ্ড সময় নেই। কারণ, বিষখালী-পায়রা নদীতে জোয়ার এসে গেছে। জোয়ারের নোনা জলে ভেসে আসবে অসংখ্য বাগদা চিংড়ির রেণু। এতক্ষণ নদীর তীরে বাঁধের ওপর শিশুর দল ডাংগুলি আর মার্বেল খেলছিল জোয়ারের অপেক্ষায়। জোয়ারের জলে ভেসে আসবে সুতার মতো চিকন কালো ডোরাকাটা চিংড়ি পোনা। এ পোনা ধরে বিক্রি করে খাবারের সংস্থান করবে ওরা।
বরগুনার তালতলী থানার একেবারে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা গ্রাম জয়ালভাঙ্গা এলাকায় গিয়ে এ দৃশ্যই চোখে পড়ে। বঙ্গোপসাগর মোহনায় বিষখালী, পায়রা, বলেশ্বর—তিন নদীর মিলনস্থলের এ গ্রামে প্রায় দেড় হাজার পরিবারের বাস। প্রধান জীবিকা নদী ও সাগরে মাছ ধরা। বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা যে শিশুদের, কঠিন দারিদ্র্যের নিগড়ে বাঁধা উপকূলের সেই শিশুরা যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। তাদের হাতে বই-খাতার বদলে নীল রঙের মশারির কাপড়ে তৈরি চিংড়ি পোনা ধরার জাল। জীবনের শুরুতেই তাদের কাঁধে চেপেছে সংসারের বোঝা।
ছোট্ট রাজুর (১২) চোখে খুশির ঝিলিক। তার সঙ্গী রফিককে (১৩) নিয়ে মাথা নুইয়ে তীক্ষ দৃষ্টি আর গভীর মনোযোগে সুতার মতো সরু একেকটি বাগদা রেণু ঝিনুকের খোলে তুলে আনছে আর গুনছে।
—‘কী করো?’ মাথাটা ঘুরিয়ে ওপরের দিকে চেয়ে রাজু বলল, ‘মাছ গুনি। আইজ ভালোই পাইছি। গাঙ্গে নুন পানি বাড়ছে। চিংড়ির পোনারাও হেইতে কল কল কইর্যা গাঙ্গে আইতে শুরু করছে।’ ‘তোমরা স্কুলে যাও না?’ ‘মোগো আবার স্কুল, প্যাডে খাওন না থাকলে স্কুলে যাওন যায়?’ রফিকের সহজ-সরল জবাব।
স্থানীয় বড়বগী ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবে, জয়ালভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সাত হাজার। এর মধ্যে স্কুলে যাওয়ার মতো শিশু কমপক্ষে দুই হাজার। জানা গেল, এসব শিশুর বেশির ভাগই স্কুলে যায় না। তারা পোনা মাছ শিকার, জেলে নৌকার শ্রমিক অথবা অন্য কাজে নিয়োজিত। এলাকার জেলে আবদুর রহমান বলেন, ‘স্কুলে পাডামু না প্যাডের খাওন জোগামু। আর পড়াইয়া কী অইবে, গরিবের গুড়াগাড়া আর কতদূর মানুষ অইবে।’
এলাকার একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় জয়ালভাঙ্গা কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম জানালেন, বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪৫। অনেকেই নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। পোনা মাছ ধরার মৌসুমে (অক্টোবর-জানুয়ারি) উপস্থিতি অর্ধেকের বেশি কমে যায়। অভিভাবকেরাও চান না, আয়ের পথ ছেড়ে তাঁদের ছেলেমেয়েরা ওই সময় বিদ্যালয়ে যাক। এখানে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যাও অনেক। জয়ালভাঙ্গার জেলে কাদেরের তিন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে কারিমা এবার পঞ্চম, ছেলে মনির চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন ওদের বাবা। লেখাপড়া বন্ধ করার কথা জানতে চাইলে কাদের বলেন, ‘সামর্থ্য নাই, পড়ামু ক্যামনে?’
জয়ালভাঙ্গা থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে তেঁতুলবাড়িয়া গ্রাম। তেঁতুলবাড়িয়া থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা নলবুনিয়া চর। জয়ালভাঙ্গা থেকে নলবুনিয়া পর্যন্ত হাঁটা মেঠোপথই সম্বল। এ পথও তেমন মসৃণ নয়। ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা বেশ দুর্গম। সেই পথ ধরে নলবুনিয়া যেতে চোখে পড়ে চরের বাসিন্দাদের কুঁড়েঘর, দারিদ্র্যের মলিন চেহারা। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, ‘নলবুনিয়ার চরে বাস করে প্রায় ৭০০ পরিবার। লোকসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। শিশু আছে কমপক্ষে ৮০০—৯০০।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, তালতলী থানায় এমন কমপক্ষে আটটি চর আছে। এসব চরের কয়েক হাজার শিশুর মধ্যে বেশির ভাগই বিদ্যালয়ে যায় না।
বরগুনার স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন ২০০৬ সালে জেলার তিনটি উপজেলার ১৭টি চর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় শিশুদের ওপর এক সমীক্ষা চালায়। ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এলাকার লোকসংখ্যা ৩২ হাজার ৬২১। এর মধ্যে চার থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা আট হাজার ৫৮৫।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা গেছে, জেলায় বিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো শিশুর সংখ্যা এক লাখ ৩০ হাজার ১৯৬। এর মধ্যে বর্তমানে বিদ্যালয়ে যায় এক লাখ ২৫ হাজার ৪৬৫। বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অমল কৃষ্ণ মজুমদার বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নানা সমস্যা আছে। এর মধ্যে দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচেতনতা, যোগাযোগসংকট, শিক্ষকস্বল্পতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচালনা পরিষদ নিয়ে নানা ঝামেলা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা।’

মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে প্রকল্প ও পরিকল্পনাই হয় বেশি

সিদ্দিকুর রহমান খান

মাধ্যমিক শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০০৫ সালের মধ্যভাগে প্রচলিত বিভিন্ন ধারার মাধ্যমিক শিক্ষা বিলুপ্ত করে ২০০৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম শ্রেণীতে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়। তখন দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে যেসব সংকট ছিল, ২০০৯ সালের শেষ ভাগে এসেও সেসব সমস্যা রয়ে গেছে।
২০০৫ সালের শেষ দিকে দেশের শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী ও ছাত্র-অভিভাবকদের প্রবল আপত্তির মুখে ‘প্রস্তুতির অভাব’—এমন অজুহাত দেখিয়ে একমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। চার বছর ধরে সেই একমুখী শিক্ষা হিমাগারেই আছে।
একমুখী শিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এসএসসি পরীক্ষায় কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপত্র পদ্ধতি চালু করা। এটাও পেছাতে পেছাতে এখন ২০১০ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মাধ্যমে আংশিক চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমান রচনামূলক প্রশ্নপত্র বাতিল করে কাঠামোবদ্ধ (বর্তমান নাম সৃজনশীল প্রশ্নপত্র) নিয়মে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে ২০০৫ সালে যেসব সমস্যা বিদ্যমান ছিল, সেগুলোর সমাধান তো হয়ইনি, বরং নতুন নতুন সমস্যা যুক্ত হয়েছে।
এদিকে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের গুণগত মান উন্নয়নে ২০০৬ সাল থেকে প্রবর্তিত বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা এখনই বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিলে উল্লেখিত সমস্যাগুলো আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকেরই।
এখন পর্যন্ত ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সব বিদ্যালয়্রও মাদ্রাসায় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা এবং একেক রকম সুযোগ বিদ্যমান। ভিন্নতা আছে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাপদ্ধতি, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষকের যোগ্যতা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক অবস্থার ক্ষেত্রেও। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনার শৈথিল্য, উদাসীনতা ও নৈরাজ্য মিলেমিশে সংকট আরও গভীর করে তুলছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা প্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডার ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য রয়েছে। শিক্ষায় নিয়োগ, বদলি, নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত বিদেশে প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে সর্বত্রই দুই ক্যাডারের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার দাপট চলে। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রশাসনের বড় পদে চাকরি করা শিক্ষা ও প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমান প্রকল্পনির্ভর মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে মোটা বেতনে চাকরি করছেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, শিক্ষাব্যবস্থার অনেকটাই এখন দাতা সংস্থার ঋণ ও ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
বর্তমানে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা পরিচালনা, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থী ভর্তি, বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ছুটি, পদোন্নতি, শাস্তি ও পুরস্কার, অবসর সুবিধা হিসেবে এককালীন কিছু টাকা প্রদান—সব ক্ষেত্রে রয়েছে অনিয়ম। আর এসবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ওপর। এ ছাড়া রয়েছে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, চালু প্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন সহায়তা, বিভিন্ন উন্নয়নকাজের টাকা বরাদ্দ ও নির্মাণ কাজের গুণগত মান নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে খোলামেলা দুর্নীতি।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসাশিক্ষকদের মধ্যে রয়েছে সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত বৈষম্য। নিত্যনতুন নিয়মনীতি প্রবর্তনের ফলে মাধ্যমিক স্তরের এসব শিক্ষক তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ছাড়াও তাঁদের শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন অন্তত এক ডজন কাজ করতে হয়, যা কিনা পাঠদান ব্যাহত করে দারুণভাবে।
দুর্নীতি ও সমস্যাজর্জরিত মাধ্যমিক পর্যায়ের এসব শিক্ষক মনে করেন, তাঁদের জন্য আলাদা একটা অধিদপ্তর করা হলে এবং প্রশাসনিক পদগুলোতেও তাঁদের মধ্য থেকেই অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোকদের পদায়ন করা হলে বর্তমান সংকটের অবসান হবে। এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮ হাজারেরও কিছু বেশি। যত দিন পর্যন্ত আলাদা অধিদপ্তর না হবে এবং যোগ্য স্কুলশিক্ষকদের এসব পদে বসানো না হবে, তত দিন মাধ্যমিক শিক্ষার দৈন্য ঘুচবে না।
অবশ্য এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নোমান উর রশীদ। তিনি মনে করেন, এটাই একমাত্র সমাধান নয়। আসলে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে যত গুণ, সে তুলনায় শিক্ষা অধিদপ্তরের লোকবল বাড়েনি। এ দপ্তরের কাজ বিকেন্দ্রীকরণ হলে স্বচ্ছতা অনেকাংশে নিশ্চিত হবে এবং দুর্নীতি কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব মাসুমে রাব্বানী খান বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক পদগুলোতে আমাদের ক্যাডারের কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিল বহু বছর। একপর্যায়ে ওই দপ্তরের নিজস্ব কর্মচারীরা দাবি তুললেন, আমাদের লোকদের ওই সব পদ থেকে সরাতে হবে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সরিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ১০ বছর ধরে চালানোর পর প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি কতটা হয়েছে, সেটা তাদের কাছে জানতে ইচ্ছা হয়।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির একাধিক নেতা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আসলে আগেই ভালো ছিল, ভুল হয়ে গেছে। খাল কেটে কুমির এনেছি।’
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিকেন্দ্রীকরণসংক্রান্ত এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, দুর্নীতির এখন একটা বাক্স আছে। শিক্ষা অধিদপ্তর ছয় বিভাগে বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে দুর্নীতির বাক্স আরও ছয়টি বাড়বে কি না, এটা বড় প্রশ্ন। প্রায় পাঁচ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ওই মন্ত্রী মনে করতেন, কর্মকর্তাদের সততা, দেশপ্রেম, নৈতিকতাই দুর্নীতি কমানোর উপায়।
বর্তমান সরকার প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি ২০০৯-এ মাধ্যমিকের জন্য বেশ কিছু ভালো সুপারিশ রয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষা কমিশন বা কমিটি কাজ করেছে, সব কটির প্রতিবেদনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো ছিল প্রায় কাছাকাছি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ, আধুনিক সর্বোপরি দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পাঠ্যবই তৈরির অপচেষ্টা থেকে শিক্ষার এই স্তরটি রক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া জোড়াতালি দিয়ে প্রকল্প চালু এবং বিদেশিদের চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করে সর্বাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া মাধ্যমিক শিক্ষাকে বাঁচাতে হবে।

রাজশাহীতে থাকার কথা ৩৫ কলেজ, আছে ১৫৬

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী


২০০৪ সালের ২৪ জুন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক এ কে এম নজরুল ইসলাম জেলার বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের একটি নতুন কলেজ পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, উপজেলার মোট জনসংখ্যা এক লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৩ জন (২০০১ সালের হিসাবে)। মোট কলেজ ১০টি। জনসংখ্যা অনুযায়ী, এই উপজেলায় কলেজ থাকার কথা তিনটি। অতিরিক্ত কলেজ সাতটি। এর ওপর নতুন কলেজ স্থাপনে ন্যূনতম শর্ত মানা হয়নি।
এর পরও চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদে ২০০৫ সালের ১৮ অক্টোবর দূরত্ব ও জনসংখ্যার শর্ত শিথিল করে একটি প্রতিষ্ঠিত কলেজের মাত্র ২০০ মিটার দূরের (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে ৪০০ মিটার) এই কলেজটির পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর মূল কলেজ কর্তৃপক্ষ এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজ হয়নি। এই কলেজটির একই মাঠ, একই ঘরদোর ব্যবহার করেই চালানো হচ্ছে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ। এর ওপর অনুমতি দেওয়া হয়েছে সাধারণ শাখা খোলার। আলোচিত এই কলেজটির নাম পীরগাছা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৭ সেপ্টেম্বর কলেজটির একাডেমিক স্বীকৃতি দিয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। এমন কলেজ কীভাবে হলো জানতে চাইলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান দীপকেন্দ্র নাথ দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর সবকিছু আগে থেকে হয়ে আছে। এখন আমাদের কিছু করার নেই।’
শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দূরত্ব ও জনসংখ্যার শর্ত শিথিল করে এভাবেই রাজশাহী জেলার সর্বত্র ব্যাঙের ছাতার মতো কলেজ গড়ে উঠেছে। জনসংখ্যা অনুযায়ী রাজশাহীতে ৩৫টি কলেজ থাকার কথা। সেখানে বর্তমানে রাজশাহীতে কলেজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৬টি। এর মধ্যে একাডেমিক স্বীকৃতি পেয়েছে ১৩৮টি। বাকি ১৮টি শুধু পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে। রাজশাহী মহানগর এলাকায় চারটি সরকারি কলেজসহ মোট ৩২টি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি কলেজ এমপিওভুক্ত নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কলেজের বেশির ভাগই গড়ে উঠেছে চারদলীয় জোট সরকার ও এর আগের মেয়াদের বিএনপির সরকারের সময়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনা থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
সূত্রমতে, অনেক শিক্ষকের কাছ থেকে ডোনেশন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়েছে। চাকরির আশায় টাকা দিয়ে এসব শিক্ষিত বেকার এখন আর অন্য কোথাও যেতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাঘা উপজেলার এক যুবক জানান, তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষকে এক লাখ টাকা দিয়ে রেখেছেন। এখন টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না, অন্যত্র যেতেও পারছেন না।
এ ধরনের স্পর্শকাতর অভিযোগে জেলার চারঘাট উপজেলার ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে রায়পুর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। সেটি এখনো বিচারাধীন। এ অবস্থায় অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন।
জানা গেছে, এই ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে ১৯৯৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদের পাশে একটি কলেজ করা হয়। সেটি বর্তমানে ডাকরা ডিগ্রি কলেজ। এরপর ওই ইউনিয়নে আরও পাঁচটি কলেজ গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে তিনটি কারিগরি কলেজ। তবে রায়পুর মহিলা কলেজ ও একটি কারিগরি কলেজের কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট উপজেলায় জনসংখ্যার তুলনায় চেয়ে আটটি অতিরিক্ত সাধারণ কলেজ রয়েছে। এর সঙ্গে কারিগরি কলেজ রয়েছে আরও পাঁচটি।
চারঘাট উপজেলার সারদা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘শর্ত শিথিল বা নীতিমালা উপেক্ষা করে ইদানীং অনেক কলেজই হচ্ছে। সেগুলো শিক্ষা বিস্তারের চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়।’
অপরদিকে জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই রাজশাহীতে গড়ে উঠেছে ৬৩টি কারিগরি কলেজ। রাজশাহী মহানগরের মধ্যে ১৬টি কলেজে মাঠ নেই, আলাদা ঘর-দরজা নেই, শুধু সাইনবোর্ড দিয়ে বাসাবাড়িতে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরের কাদিরগঞ্জ এলাকায় একটি বাড়ির মেঝে ভাড়া নিয়ে করা হয়েছে গ্রিন গার্ডেন টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস কলেজ। গত ১৯ অক্টোবর সকাল পৌনে ১০টায় ওই কলেজে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের অফিসে কেউ নেই। ছোট্ট একটি শ্রেণীকক্ষে একজন শিক্ষার্থী বসে আছে। এই কক্ষে ১৭ শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা রয়েছে। অপর পাশে আরেকটি কক্ষে মাত্র চারটি বেঞ্চ রয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ ইসমত আরা নিচতলা থেকে উঠে এলেন। সেটিই তাঁর বাসা। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে যখন তাঁরা কলেজ শুরু করেন, তখন নিজস্ব ঘর ও জায়গা না থাকলেও এভাবে ভাড়া নিয়ে কলেজ তৈরির নিয়ম ছিল। তিনি বলেন, তাঁর কলেজটি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কিন্তু এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি।
একই অবস্থা দেখা যায় নগরের হেতেম খাঁ কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজের। এর শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, তাঁরা জমি কিনেছেন। সেখানে কলেজ স্থানান্তর করবেন।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান দীপকেন্দ্র নাথ দাস বলেন, শিক্ষার মানের দিকে চিন্তা না করে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগেরই ফলাফল সন্তোষজনক নয়।

প্রাথমিকের আদলে আড়াই হাজার বিদ্যালয়

শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা

গাইবান্ধার শিবরাম শ্রেষ্ঠ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুকরণে দেশে প্রায় আড়াই হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠছে। শিবরামের শিক্ষাদান পদ্ধতি, অভিভাবকদের কাছে শিক্ষকদের জবাবদিহি, পোশাক, প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয় অনুকরণ করে এসব বিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, শিবরামের সার্বিক কর্মকাণ্ড অনুকরণ করে এর চারদিকেই গড়ে উঠছে ১৩টি বিদ্যালয়। শিবরামের অদূরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রামজীবন ইউনিয়নের অন্তর্গত সুবর্ণদহ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ মহাসড়ক ঘেঁষে প্রকৃতিঘেরা পরিবেশে বিদ্যালয়টি অবস্থিত। চারদিকে সীমানাপ্রাচীর, প্রাচীরের ভেতরে সবুজ বৃক্ষ। সুসজ্জিত গেট পেরিয়ে মূল ভবন। প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে ফলমূল ও মনীষীদের ছবি আঁকা। শিবরামের মতোই এখানে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ব্যবস্থা।
এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত পোশাক রয়েছে। বিনোদনের জন্য রয়েছে চিত্রাঙ্কন শেখানো, দৈনিক অ্যাসেম্বলি, টিফিনের ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। খণ্ডকালীন সংগীত শিক্ষক দ্বারা ৫০ জন ছাত্রছাত্রীকে গান শেখানো হচ্ছে। শুধু লেখাপড়াই অনুকরণ নয়, দেশখ্যাত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে জানার জন্য তাঁদের নামে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষের নামকরণ করা হয়েছে। সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে এখানকার ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় অনেক অগ্রসর।
পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র আশরাফুল ইসলাম ও ছাত্রী সীমা আক্তার জানায়, ‘স্যাররা আমাদের খেলাধুলা ও বিনোদনের মাধ্যমে পাঠদান করে থাকেন। সারা দিন কীভাবে কেটে যায় বুঝতে পারি না।’ সুবর্ণদহ গ্রামের কৃষক শরিফুল আলম বলেন, ‘ভালো নেকাপড়া হবার কথা শুনি হামরা ছোলট্যাক এই স্কুলোত ভর্তি করি দিচি। হামার ছোল একন নেকাপড়াত ভালো পায়।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মালিহা খাতুন বলেন, ‘দেশ-বিদেশে শিবরাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খ্যাতি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। তাই শিবরামের শিক্ষাপদ্ধতি অনুকরণ করে এগিয়ে যাচ্ছি। দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে শিবরামের অনুকরণে করা উচিত।’
শিবরামকে অনুকরণ করা আরেক বিদ্যালয় সুন্দরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানেও চিত্রাঙ্কন শেখানো ও প্রতিদিন অ্যাসেম্বলি করা হয়। শিক্ষকেরাই ৭০ ছাত্রছাত্রীকে গানের তালিম দিয়ে থাকেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রওশন আলম বলেন, ‘শিবরাম বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আলম তাঁর বিস্ময় জাগানো কর্মকাণ্ড দিয়ে সুন্দরগঞ্জ তথা গাইবান্ধাকে দেশ-বিদেশে পরিচয় করে দিয়েছেন। তাই শিবরামের মতো বিদ্যালয় গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছি।’
প্রধান শিক্ষক বলেন, অভিভাবকের কাছে শিক্ষকদের জবাবদিহির ও পাঠদানে শিক্ষকদের মনোযোগী করে তোলা হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিদ্যালয় থেকে এবার ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে নয়জন। এমনকি জেলা পর্যায়ে আয়োজিত এবারের উপকরণ মেলায় সুন্দরগঞ্জ মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রথম স্থান লাভ করেছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়টি এবারের বৃত্তি পরীক্ষায় উপজেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে।
শিবরাম শ্রেষ্ঠ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিবরামকে অনুকরণ করে গাইবান্ধাসহ সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজার বিদ্যালয় গড়ে উঠছে, এটা আমার জন্য বড় কিছু পাওয়া। এখানেই আমার প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে। আমি ওই সব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তাঁদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি চাই, সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিবরামের অনুকরণে হোক। এতে দেশে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ঘটবে।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহিদুর রহমান বলেন, শিবরামের আদলে গড়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলোকে অনুপ্রেরণা ও সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম বলেন, জেলার অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়কে শিবরামের মতো অনুকরণের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নে ১৯১৬ সালে শিবরাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। ১৯৯০ সাল থেকে শিবরাম শ্রেষ্ঠ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮১ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নুরুল আলম। ১৯৮৪ সালে শুরু করেন বিদ্যালয়কে বদলে দেওয়ার প্রক্রিয়া। সুশৃঙ্খল পরিবেশ, দক্ষভাবে পরিচালনা, আকর্ষণীয় শিক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষা উপকরণ সমাবেশ, শিক্ষার মান, পাঠক্রমের অতিরিক্ত প্রতিভা বিকাশের অনুকূল সাংস্কৃতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯৮৫ সালে নুরুল আলম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। ১৯৯১ সালে ইউনিসেফ শিবরামকে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৬ সালে বিদ্যালয়টিও জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।
২০০০ সালে জাতীয় পদক লাভ করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। ২০০৬ সালে শতভাগ ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতির জন্য এটি দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। বিদ্যালয়ের সাফল্যগাথা ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যায়। ইতিমধ্যে চীন, ফ্রান্স, পাকিস্তান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। প্রতিমাসে প্রায় ২০ দিন দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন বিভাগের লোকজন বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে আসেন। বিদ্যালয়ে সরকার অনুমোদিত ১১ জন শিক্ষকের সঙ্গে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা বেসরকারিভাবে কর্মরত আছেন। মোট এক হাজার ৪১০ ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ছাত্রছাত্রী ২৮০ জন। এ নিয়ে ২০০৪ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রথম আলোতে বিশেষ প্রতিবেদন এবং ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সংখ্যায় প্রতিবেদনটি দুই দফায় প্রকাশিত হয়।

অন্ধকারে ওরা চায় আলোর দিশা

শতদল সরকার

জলই তাদের জমিন, জলেই তাদের বসত। বরিশাল সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে বানারীপাড়া বাজারের পেছনে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় তাদের বসবাস। স্থানীয় নাম বানারীপাড়া লঞ্চঘাট। প্রায় ৫০টির মতো জেলে-পরিবার ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় এভাবে ভাসমান জীবন যাপন করছে।
স্থানীয় লোকজন এদের বেদে হিসেবে চেনে। পেশা তাদের মাছ ধরা। বরিশালের সন্ধ্যা, সুগন্ধা, শৌলা, আড়িয়াল খাঁ, জাফরুল নদী এবং এই নদীসংলগ্ন খালে তারা সারা বছর মাছ ধরে।
নদীর উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে এখানে চলে তাদের প্রতিমুহূর্তের সংগ্রাম। কিন্তু এই সংগ্রামী জীবনের মূল্য কোথাও মেলে না। এদের চাওয়া-পাওয়ার কথাও কেউ ভাবে না। তাদের দাবির কথা কেউ কখনো উত্থাপন করে না। সমাজ, সভ্যতার আলো কিংবা সরকারি কোনো সুবিধাও তারা পায় না।
বেদে শিশুরা তাদের বাবা-মায়েদের সঙ্গেই মাছ ধরে দিন কাটায়। নৌকাই তাঁদের মাছ ধরার সহায়ক বাহন।
খালের পাড়ে আইলায় আধভাঙা একটা কাঠের ঘরের পাশে গোড়ালি-সমান পানিতে তখন দাঁড়িয়ে আছি। দেখি হন্তদন্ত হয়ে একজন নারী জনা সাতেক শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বেদে-বহরের খাল পাড় থেকে বের হচ্ছেন। অনেক পরে তাঁর পরিচয় জানা গেল। নাম তাঁর স্বর্ণা ঘোষ। পাশেই তাঁর বাড়ি। তিনি বেদে শিশুদের স্কুলে পড়ান। এখানে কোথায় সেই স্কুল? প্রশ্ন করতেই স্বর্ণা সুগন্ধা নদীর পাড়ঘেঁষা একটা কাঠের বেড়ার ঘর দেখিয়ে বললেন, ‘ওই তো ওইখানে।’
কেমন চলছে বেদে শিশুদের পড়াশোনা? জিজ্ঞেস করতেই শিক্ষিকা স্বর্ণা ঘোষ প্রথম আলোকে বললেন, ‘ওদের পড়াশোনার আগ্রহ প্রবল; কিন্তু নৌকায় ওদের পড়ার পরিবেশ নেই। সারা দিন মাছ ধরার কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করাই ওদের কাজ। বিকেলে ডাঙায় ফিরে যেটুকু সময় পায়, সেটুকুতেই চলে ওদের বর্ণচর্চা ও গণনা শেখানোর চেষ্টা। আজ যা শেখানো হয়, কালই তারা সেটা ভুলে যায়। এর মধ্যে ভালো একটা বিষয় হলো, এসব শিশুর অনেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এক-দুই গুনতে শিখে ফেলেছে। বর্ণমালাও মনে রাখতে পারে।’
শিক্ষিকার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন মাছ ধরার অভিযান শেষে খাল পাড়ে ফিরে এসেছেন বৃদ্ধ আলী সর্দার বললেন, হেই মাস্টার মোগো ছাওলপাওলের লায় শিক্ষা দিতাছে। হ্যাগো একখান ঘর দিয়েন।’
জানা গেছে, এই বৃদ্ধ বেদে সর্দার মোহাম্মদ আলী তাঁর একমাত্র জ্বালানি কাঠ রাখার ঘরেই শিশু শিক্ষার স্কুল চালাতে দিয়েছিলেন। সাইক্লোন আইলায় সে ঘরটিরও অর্ধেকটা ভেঙে গেছে। আর এই আধভাঙা ঘরেই চলছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এই স্কুল। অবশ্য এখানে সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার তেমন কোনো সহযোগিতাই নেই। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার যত্সামান্য সহযোগিতা পাওয়া গেছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।
বাবুগঞ্জেরই একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক তপন ঘরামি জানালেন, সভ্যতার প্রতি নিরাসক্ত এই ভাসমান বেদেদের মৌলিক অধিকার পূরণের জন্য রাষ্ট্রের উন্নয়ন খাত খেকে কোনো বরাদ্দ নেই। রাষ্ট্রের না থাকুক, বিবেকবান নাগরিকের দায় কিন্তু রয়েছে।

শিক্ষকতায় মেধাবীরা আসছেন না

মূল কারণ কম বেতন

আনু আনোয়ার

সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-গুলোর সুষ্ঠু অবকাঠামোগত ব্যবস্থার অভাব থাকলেও শিক্ষক, শিক্ষার্থী—কোনোটিরই অভাব নেই। একদল শিক্ষার্থী পাস করে বেরিয়ে গেলে আরেক দল নতুন করে ভর্তি হচ্ছে। শিক্ষকদের পদ শূন্য হলে আবার তা পূরণ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থমূল্য কম হওয়ায় এবং ভবিষ্যত্ সমৃদ্ধির সম্ভাবনা কম থাকায় যোগ্য ও প্রকৃত মেধাবীরা এই পদে আসছেন না।
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত শিক্ষাবার্তার দশম বর্ষের নবম সংখ্যায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘শুধু অর্থনৈতিক দিকটি বিবেচনা করলে শিক্ষকতা পেশার প্রতি যোগ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আকৃষ্ট হওয়ার কোনো যুক্তি পাওয়া মুশকিল।’ তিনি আরও বলেছেন, অতীতে একসময় শিক্ষকতাকে পেশা না ভেবে ব্রত হিসেবে গণ্য করা হতো এবং মেধাবী ও প্রতিভাবানেরাই এই ব্রত পালনে উদ্দীপ্ত ছিলেন। কিন্তু অর্থ উপার্জন দিয়ে যখন সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ করা শুরু হয়, তখন থেকেই এই ধারা ভেঙে পড়েছে।
এই প্রসঙ্গে বুদ্ধিজীবী যতীন সরকার ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে বলেছিলেন, “আমি যখন বিএ পাস করি, এলাকার মানুষ খুব খুশি। দেখা হলে জিজ্ঞাসা করে, ‘এখন করতাছো কী?’ উত্তরে মাস্টারি করছি বললে তারা মুখ বেজার করে বলে, ‘মাস্টারি করতাছো, কাজটাজ পাইলা না’?” মানে মাস্টারিটা কোনো কাজের মধ্যে পড়ে না। একজন বিএসসি শিক্ষককে দেখলাম, কেরানির চাকরির জন্য দরখাস্ত করছেন নিয়মিত। কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেন, ‘আসল কথা হলো, মাস্টারের সাথে কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না। কেরানির চাকরিতে বেতন বেশি না থাক, উপরি আছে। পাত্রীপক্ষ জামাইয়ের উপরি দেখে।’ অর্থাত্ কামাই দেখে সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয়; কিন্তু এটা ঠিক নয়। একজন নিজে যদি সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি না বোঝে, তাহলে কেউ তার সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে পারে না।
শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমানের মন্তব্য, ‘শিক্ষকতা পেশায় যাঁরা যুক্ত, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা এখানে আসবেন।’
জানা যায়, একজন সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকের মূল বেতন তিন থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে এই অঙ্ক প্রায় আট থেকে ১০ হাজার টাকা দাঁড়ায়। আর বেসরকারি শিক্ষকদের সব মিলিয়ে কারও বেতন তিন হাজার টাকা, আবার কারও বেতন ১৫ হাজার টাকারও বেশি। এই বৈষম্যের কারণ হলো, সরকার সব বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষককে দিচ্ছে শতভাগ মূল বেতন। ফলে কোনো বিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকে অথবা দরিদ্র হয়, তাহলে তাদের সরকারি শিক্ষকদের মতো শুধু মূল বেতনসহ মোট সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। বেসরকারি শিক্ষকেরা বাড়ি ভাড়া বাবদ পান মাত্র ১০০ টাকা।
এর পরও শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এর খসড়ায় দেওয়া নেই। এতে শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়ানোর বিষয়ে বলা হলেও বেতন নিয়ে কোনো কথা নেই। তবে দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিসংক্রান্ত অনুচ্ছেদে কেবল বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতির ভবিষ্যত্ গঠনে শিক্ষকদের গুরুত্ব ও মর্যাদা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা উচিত।
এদিকে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিশু জরিপ, আদামশুমারী, উপবৃত্তি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়া, স্কুলের বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক কাজে অংশ নেওয়া, বিভিন্ন নির্বাচন, নারী ও শিশু পাচারসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করা আরও অনেক কাজ করে থাকেন। এ ছাড়া তাঁদের সরকারের জনশিক্ষা ও জনস্বার্থবিষয়ক বিভিন্ন কাজেও অংশ নিতে হয়। কিন্তু পরিশ্রম অনুযায়ি তাঁরা পারিশ্রমিক পান না।
বেতন বৈষম্য বা জ্যেষ্ঠদের চেয়ে কনিষ্ঠদের বেশি বেতন-ভাতা পাওয়া, রাজনৈতিক বিবেচনা ও তদবিরের জোরে ভালো কলেজ ও পদে পোস্টিং পাওয়া, বছরের পর বছর ধরে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির রাজধানীসহ শহরাঞ্চলের কলেজ এবং শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পদে অবস্থান করা, যোগদানে জটিলতা, পুরস্কার-তিরস্কারের ব্যবস্থা না থাকা, পদোন্নতিতে জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে অসন্তোষ চলছে শিক্ষা ক্যাডারে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষককে যে বেতন দেওয়া হয়, তা মোটেও যথেষ্ঠ নয়। সাধারণত প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেয়ে থাকেন।
দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপেক্ষাকৃত মেধাবীদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়—এমন মত দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য। তিনি বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান যত ভালো হবে, সেখানে শিক্ষার্থীরাও বেশি হারে ভর্তি হতে চাইবে। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেধাবীদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

বিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান

মানসুরা হোসাইন

জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী, ২০০৫ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে ভর্তির পর শিক্ষাজীবন শেষ করা, লেখাপড়ার সাফল্যসহ শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক সমতা অর্জন এখনো অনিশ্চিত। এর কারণ, ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বাড়তে থাকে। উচ্চস্তরে গিয়ে এ অবস্থা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে অর্জন: দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা ছাড়া একমাত্র বাংলাদেশই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য বিলোপ করে সংখ্যাসাম্য অর্জন করেছে। সরকারের দেওয়া বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তির অনুপাত ছিল ৫৫: ৪৫। বর্তমানে তা প্রায় ৫০:৫০। প্রাথমিক শিক্ষায় পুরুষ ও নারী শিক্ষকের অনুপাতও ৫০: ৫০।
১৯৮০ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি ১০০ জনে ছাত্রী ভর্তি হতো ২৬ জন, ছাত্র ৭৪ জন। কিন্তু বর্তমানে ১০০ জনের মধ্যে মেয়ের সংখ্যা ৫২ জন এবং ছেলের সংখ্যা ৪৮।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) জাতীয় শিক্ষা জরিপ (পোস্ট প্রাইমারি) ২০০৮-এর দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মোট এক কোটি সাত লাখ ৭৩ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫৫ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৯ জন। অর্থাত্ মোট শিক্ষার্থীর ৫১ দশমিক ৩৪ শতাংশই ছিল ছাত্রী।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭-এর তথ্যমতে, কোনো ধরনের শিক্ষা গ্রহণ না করা নারীর হার ১৯৯৩-৯৪ সালে ছিল ৩৬ শতাংশ। ২০০৭ সালে তা কমে হয়েছে ১০ শতাংশ। বর্তমানে ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী কমপক্ষে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু মাত্র ১২ শতাংশ নারী মাধ্যমিক পাস বা ততোধিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করতে পেরেছেন।
উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য প্রকট: মঞ্জুরি কমিশনের ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ২৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ছিল মাত্র পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ১৭৭ জন। অর্থাত্ ৬২ শতাংশ ছিল ছাত্র এবং মাত্র ৩৮ শতাংশ ছিল ছাত্রী। অন্যদিকে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ছিল মাত্র ৪০ হাজার ৫৩ জন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ হাজার ৬১ জন ছাত্র আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পেলেও মাত্র ১৬ হাজার ২৭৮ জন ছাত্রী এই সুযোগ পান।
কারিগরি শিক্ষায় মেয়েরা পিছিয়ে: কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার খুবই নগণ্য। জাতীয় শিক্ষা জরিপ (পোস্ট প্রাইমারি) ২০০৮-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় মোট চার লাখ ৫১ হাজার ৮১৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র এক লাখ ১৬ হাজার ৯১৫ জন। অর্থাত্ মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ ছাত্রী।
নারী শিক্ষকের স্বল্পতা: জাতীয় শিক্ষা জরিপের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মোট শিক্ষকের সংখ্যা ছিল চার লাখ ২৬ হাজার ৭৯১ জন। এর মধ্যে শিক্ষিকার সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৯ হাজার ৮৩৫ জন, যা মোট শিক্ষকের মাত্র ১৮ দশমিক সাত শতাংশ। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ২১ হাজার ৬৬৪ জন শিক্ষকের মধ্যে নারী শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র চার হাজার ১৯৭ জন, অর্থাত্ এটা মোট শিক্ষকের মাত্র ১৯ দশমিক চার শতাংশ।
মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে দেশের ২৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় হাজার ৭১৩ জন পুরুষ শিক্ষক থাকলেও নারী শিক্ষকের সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার ৪৫৫ জন।
তবে নারী শিক্ষকের সংকট মোকাবিলায় দেশের মহানগর ও পৌর এলাকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতকরা ৪০ ভাগ এবং মফস্বলে ২০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপবৃত্তির উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না: গ্রামীণ এলাকার ছাত্রীদের মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির হওয়ার ব্যাপারে উত্সাহ জোগানোর পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ১৯৯৪ সাল থেকে সরকার ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রীদের উপবৃত্তির আওতায় আনে। পরে দেশব্যাপী উচ্চমাধ্যমিক (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী) পর্যায়ে বৃত্তি দেওয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৯-এর তথ্যমতে, উপবৃত্তি প্রকল্পগুলোর আওতায় বছরে প্রায় ২৫ লাখ ছাত্রীর পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে ২৫০ কোটি টাকা। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সমাজে নারীদের অবস্থান জোরালো করাসহ আরও যেসব উদ্দেশ্য নিয়ে উপবৃত্তি চালু করা হয়েছিল সেটি পুরোপুরি সফল হচ্ছে না।
এমডিজির অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা: ইউনিসেফের ২০০৪ সালের ‘মেয়ে, শিক্ষা ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা খাতে লিঙ্গভিত্তিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এমডিজির অন্য লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে না। কারণ, শিক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্যসহ আরও অনেক বিষয় জড়িত। শিক্ষিত নারীর সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে এবং শিশুমৃত্যুর হার কমায়। প্রতি এক হাজার মা এক বছর অতিরিক্ত শিক্ষা গ্রহণ করলে তা দুজন মায়ের মৃত্যু রোধ করে। এইচআইভি/এইডস সংক্রমণ, যৌন শোষণ ও শিশু পাচারের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও শিক্ষা জড়িত। কাজেই মেয়েরা শিক্ষিত না হলে এসব লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছেলে ও মেয়ের ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণীতে ১১ ভাগ মেয়ে বেশি ভর্তি হলেও এসএসসি পরীক্ষাতেই এই ১১ ভাগ ঝরে যাচ্ছে। পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক মেয়েরা ভালো করছে, কিন্তু গ্রামের মেয়েরা এ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, মেয়েদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রাবাস ও অবকাঠামোর অভাব বড় সমস্যা। তাই উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের জন্য আর্থিক বৃত্তির ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারকে নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, অভিভাবকেরা মেয়েদের শিক্ষায় উত্সাহী হয়ে উঠছেন। কিন্তু গণধর্ষণ, ধর্ষণ, অপহরণ, স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার পথে ইভটিজিং এবং এর ফলে আত্মহত্যা, এমনকি পারিবারিক নির্যাতনও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। নির্যাতনের এ ধরনের পরিবেশ মেয়েদের শিক্ষায় ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। তাই ২০১৫ সালের মধ্যে শিক্ষায় এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চাইলে রাষ্ট্রকে সহায়ক পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতেই হবে।

দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার শিশুদের জন্য এবার স্কুল খাদ্য কর্মসূচি

শরিফুল হাসান

নদীর তীরে স্কুল। সামনে উড়ছে লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা। চারদিকে সবুজ গাছগাছালি। বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি মেঠোপথ। একদম নদী অবধি। নদীর ওপারে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত গোটা গ্রাম। এর তীরে ভেড়ানো একটি পালতোলা নৌকা। নৌকা থেকে খাদ্যসামগ্রী শ্রমিকদের মাথায় বোঝাই হয়ে আসছে বিদ্যালয়ে।
ঠিক এ রকম একটি ছবি এঁকে আন্তর্জাতিক শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেছে বাংলাদেশের মুহিব্বা তানজুম। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ইতালিতে এ বছর এই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। তানজুম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শোলাগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্কুট বিতরণের কাজ চলছে।
সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফও) সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শুরু করে। এই কর্মসূচির সফলতা দেখে সরকার এবার ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার জন্য ‘স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’ নামে আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। উদ্দেশ্য, সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
আগের কর্মসূচির সাফল্য: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ ও তিন পাবর্ত্য জেলার চার হাজার ২৯৪টি স্কুলের ছয় লাখ শিক্ষার্থী স্কুল খাদ্য কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে। এ ছাড়া সিডরবিধ্বস্ত এলাকার পাঁচটি জেলা—পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, বাগেরহাট ও বরিশালে এই কর্মসূচি চলছে। সব মিলিয়ে সাত হাজার স্কুলের ১০ লাখ শিশু স্কুল খাদ্য কর্মসূচির আওতাভুক্ত। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
ডব্লিউএফপির বাংলাদেশের কর্মকর্তা এম. ইমামুল হক জানান, স্কুল খাদ্য কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন জনপ্রতি আটটি বা ৭৫ গ্রাম বিস্কুট বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই বিস্কুট একটি শিশুকে দৈনন্দিন ৩৩৮ কিলোক্যালরি শক্তি এবং প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ৬৭ ভাগ জোগান দিয়ে থাকে। তিনি জানান, এই কর্মসূচির ফলে শিশুদের স্কুলে আসার হার বেড়েছে। বাংলাদেশে এই কর্মসূচি পুরোপুরি সফল বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশে ডব্লিউএফপির প্রতিনিধি জন আইলিয়েফ জানান, এই বিস্কুট শিশুদের কতটা কাজে আসছে, সেটা জানার জন্য ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরই) ও টাফট ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে একটি জরিপ চালায়। জরিপে দেখা গেছে, যেসব স্কুলে এই কর্মসূচি চলছে, সেসবে মোট ভর্তির হার বেড়েছে শতকরা ১৬ ভাগ, হাজিরা বেড়েছে ১৪ ভাগ, ঝরে পড়া কমেছে ১০ ভাগ, ফল ভালো হয়েছে ১৬ ভাগ, রক্তশূন্যতা কমেছে পাঁচ গুণ। কাজেই একটি বিষয় পরিষ্কার যে এই কর্মসূচি আসলেই সফল।
জন আইলিয়েফ বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় একটি দেশে দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না কিংবা গেলেও ঝরে পড়ে। বিষয়টি দুঃখজনক। এ কারণে ডব্লিউএফপি স্কুল খাদ্য কর্মসূচি শুরু করে। বিশ্বের ৭১টি দেশে স্কুল খাদ্য কর্মসূচি চলছে। বাংলাদেশে এর সাফল্য দেখে আমরা অনুপ্রাণিত।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) বাবলু কুমার সাহা জানান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় যে বিস্কুট বিতরণ কর্মসূচি চলেছে, সত্যিকার অর্থেই তা শিশুদের স্কুলমুখী করেছে। এখন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদেরও সংখ্যা কমেছে। দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার এখন অনেক বেশি। এই বিস্কুট তাদের পুষ্টিও বাড়াচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র: যেসব স্কুলে খাদ্য কর্মসূচি চলছে, সেগুলোর প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচি চালু হওয়ার ফলে ঝরে পড়া শিশুদের হার অনেক কমেছে। না খেতে পেয়ে অপুষ্টির শিকার হয়ে আগে দরিদ্র শিশুরা প্রায়ই নানা ধরনের অসুখে ভুগত। এখন আর তা হচ্ছে না।
গাইবান্ধার শোলাগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহানা আক্তার বলেন, তাঁর স্কুলে ২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বিস্কুট বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। এই কর্মসূচি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও উপস্থিতির হার বেড়েছে। ২০০৬ সালের আগে ছাত্রছাত্রী ছিল ৯০ জন, কিন্তু বর্তমানে তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ জন।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোকসেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিস্কুট দেওয়ার কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। ঝরে পড়ার হারও কমে গেছে। আগে এই হার ছিল ২০ ভাগ। এখন সেটা বড়জোর এক থেকে দুই ভাগ। কুড়িগ্রামের মতো দরিদ্র এলাকার জন্য এই কর্মসূচি খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা আখতার বলেন, এ বিস্কুট অপুষ্টি দূর করে। একটি শিশুর এক দিনে যে পরিমাণ ক্যালরি প্রয়োজন, বিতরণ করা বিস্কুটে তা আছে। এ ছাড়া বিস্কুটে ভিটামিন থাকায় শিশুদের মুখের ঘা কমে গেছে, আয়োডিনের অভাব দূর হয়েছে। তাদের বুদ্ধিমত্তাও বেড়েছে।
কুড়িগ্রামের রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান জানান, বিস্কুট দেওয়ার ফলে শিশুরা বিদ্যালয়মুখী হয়েছে। আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের স্কুলে আনতে হতো। এখন তেমনটা করতে হয় না।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণত অপুষ্টিতে ভোগে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূিচর আওতায় অপুষ্টি দূর করতে জেলার সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৬০৮টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচি চালু হওয়ায় ওই সব বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার যেমন বাড়বে, তেমনি তাদের মানসিক বিকাশেও তা সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা মহানগরের ৩৬৪টি বিদ্যালয়ে স্কুল খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে বেসরকারি সংগঠন ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। এই কর্মসূচির মাঠ পরিদর্শক কামাল হোসেন বলেন, এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে ৭৫ হাজার ৩৫৮ জন শিক্ষার্থী। তাদের ঝরে পড়ার হার কমেছে, বেড়েছে উপস্থিতির হার।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী (এমডিজি) ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বর্তমান সরকার ২০১১ সালের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) বাবলু কুমার সাহা প্রথম আলোকে জানান, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করতে হলে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু শহরভুক্ত এলাকার প্রায় সব শিশু স্কুলে গেলেও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার শিশুরা নানা কারণে স্কুলে যেতে পারে না। তাদের স্কুলে না আনতে পারলে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণেই দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার সব শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আর ডব্লিউএফপির উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় যে বিস্কুট বিতরণ কর্মসূচি চলছে, তার সফলতা সরকারকে অনুপ্রাণিত করেছে।
সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনই লক্ষ্য: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির নামে যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই দরিদ্র শিশুদের স্কুলে আনা। এ কারণেই দেশের ছয়টি বিভাগের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাকবলিত এলাকা রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, বাগেরহাট ও বরিশালের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশের সব কটি বিভাগের দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামগুলোর স্কুল এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
ডব্লিউএফপির বাংলাদেশের কর্মকর্তা এম. ইমামুল হক জানান, ‘স্কুল খাদ্য কর্মসূচির সফলতা দেখেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। আমরাও মনে করি, এর মাধ্যমে সত্যিকারভাবে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকল্পে মোট খরচ হবে ৯৬৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে এই কাজ পরিচালিত হবে। নীতিগতভাবে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন হবে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এ কর্মসূচির সূচনা হবে বলে আশা করছেন তাঁরা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। এর আওতায় ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৯ জন প্রাথমিক শিশুর শারীরিক পুষ্টির মান বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা অফিস।

বৃত্তে বন্দী শৈশব

উদিসা ইসলাম

‘শৈশব স্বপ্ন দেখার আর জীবনকে উন্মোচিত করার সময়। যদি শিশুকে চার দেয়ালে বন্দী করা হয়, তাহলে আমরা কেবল চাকরিজীবী পাব, মানুষ পাব না। এখনকার শিশু বিশেষত ঢাকা শহরের শিশুরা জীবন-বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ে উঠছে। এদের ভেতরে স্বতঃস্ফূর্ততা নেই। বেশির ভাগ বাচ্চার মধ্যে পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে কোনো আগ্রহই নজরে পড়ে না। কারণ সেই জগত্ তার অচেনা। তাদের সামনে শুধু ইটের সারি সারি দেয়াল।’ শিশুদের রুটিন-বাঁধা জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ কথাগুলো বলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই,/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই।’ এই ছড়া মুখস্থ করলেও এর বাস্তব অভিজ্ঞতা এ যুগের শহুরে শিশুদের নেই। শৈশবে শীতের সময়, পরীক্ষা শেষ হলে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার যে রীতি, সেটাও তাদের অজানা। মাত্র তিন বছর বয়সে বিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াইয়ে নেমে সে প্রথমেই শিখে নেয়, প্রতিযোগিতা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এরপর থেকে শুরু বইয়ের ভারী ব্যাগ কাঁধে স্কুল যাওয়া। ফেরার পথে গাড়িতে কিছু ফাস্টফুড খেয়ে টিউশনে কিংবা কোচিংয়ে যাওয়া এবং বাসায় ফিরে আবারও গৃহশিক্ষকের সামনে বসা। এর মধ্যে যদি একটু সময় মেলে তখন টেলিভিশন দেখা বা কম্পিউটারে খেলতে বসা। এই রুটিনের বৃত্তেই বন্দী তাদের শৈশব।
এই ঘণ্টা-মিনিট হিসাব করা রুটিন সম্পর্কে একজন অভিভাবকের উত্তর, ‘স্কুলের এই চাপের ভেতর যদি গল্পের বই তুলে দিই, তাহলে প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাচ্চা পিছিয়ে পড়বে। তা ছাড়া বাইরে মাঠ নেই, নিরাপত্তা নেই। সে জন্য ঘরেই যতটা সম্ভব খেলার বা বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হয়। এই কঠিন প্রতিযোগিতার যুগে অভিভাবকেরা যা করেন, তা তো শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই করেন।’
শিশু কোন স্কুলে পড়বে, নার্সারি বিভাগ থেকেই তাকে সব পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে, গান-নাচ-খেলা—সব ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণ করবে এবং বিজয়ী হবে—অভিভাবকদের এ মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া দরকার বলে মত দেন জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, ‘আগে যৌথ পরিবারে শিশু কীভাবে বেড়ে উঠত, কোথায় খেলত এসব বিষয়ে বিশেষ এমন কড়া নজরদারি ছিল না। ফলে আমরা শৈশবে একটা বিশাল জগত্ দেখতে পেয়েছি। এখন বই মুখস্থ করার প্রবণতা, সবারই প্রথম হওয়ার অদম্য ইচ্ছা এবং বাবা-মায়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে শিশুদের নাভিশ্বাস অবস্থা। আমরা যে একটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে ফেলছি, সেটা ভেবেও দেখছি না।’
এ যুগের শিশুদের পাঠ্য ছাড়া অন্য বই পড়ার অভ্যাস নেই বললেই চলে। শিক্ষকেরাও এ বিষয়ে তাদের উত্সাহিত করেন না। ফলে আমাদের লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম তেমন কিছু না জেনেই বেড়ে উঠছে—এমন অভিমত দিয়েছেন লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে সারা দেশের চিত্র প্রায় একই রকম। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বললেন, ‘আমাদের সময় উপহার মানেই ছিল বই। এখনকার অভিভাবকেরা স্কুলের বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের হাতে রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা, সুকুমার রায়ের পাগলা দাশুর মতো বই তুলে দেন বলে মনে হয় না। বই উপহার দেওয়ার রীতি প্রায় উঠেই গেছে। এখন শিশুদের উপযোগী বই তেমন লেখাও হয় না।’
শিশুদের মানসিক বিকাশ, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমীরও ইদানীং বেহাল দশা। এখান থেকে শিশুদের জন্য নিয়মিত মানসম্পন্ন বই প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে গড়ে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০টি বই প্রকাশ করত একাডেমী। এসব বই নামমাত্র মূল্যে দেশের সব কটি জেলা শিশু একাডেমীতে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু এখন তা থমকে গেছে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাডেমীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত কয়েক বছর সরকারের বরাদ্দ ছিল ন্যূনতম। সেই বরাদ্দ দিয়ে টেনেটুনে দু-তিনটি বই-ই প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে।’
এ বিষয়ে ব্যঙ্গ পত্রিকা উন্মাদ-এর সম্পাদক আহসান হাবিব বলেন, ‘ভোগবাদী সমাজ শিশুকে সাজগোজ, হাল ফ্যাশন আর ফাস্টফুডের সংস্কৃতি শেখাচ্ছে। অভিভাবকের সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা শিশুকে গ্রাস করছে। অভিভাবক তাকে শিক্ষামূলক বিনোদনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে না।’
প্রতিযোগিতা বা নিরাপত্তাহীনতা সম্পর্কে অভিভাবকদের মন্তব্যের ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানী মেহতাব খানম বলেন, ‘শিশু নির্দিষ্ট রুটিনেই চলুক। কিন্তু বিকেলটাতে যদি ছাদে নিয়ে অন্য শিশুদের সঙ্গে তাকে খেলার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে অন্তত আকাশ দেখাটা শিখবে। এতে মনের ভাবনা বিস্তৃত হবে। যেহেতু এখন যৌথ পরিবার নেই। যতটা পারা যায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগটা বাড়ানো প্রয়োজন। যদি তারা একই এলাকায় থাকে, তাহলে বাচ্চাদের সেখানে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এতে সে অন্য পরিবারের বাচ্চার সঙ্গে খেলার সুবিধাগুলো পেতে পারে।’
চলচ্চিত্রাঙ্গনেও সেই একই হতাশার চিত্র। শিশু চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে মুহম্মদ জাফর ইকবাল আবারও বলছিলেন, ‘গত এক যুগে দেশে শিশুদের জন্য কোনো চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়নি। সেই বহু বছর আগে বাদল রহমানের এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী আর মোরশেদুল ইসলামের দীপু নাম্বার টু বাদ দিলে শিশুদের জন্য উপযোগী কোনো চলচ্চিত্র আমার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। একটি ভালো চলচ্চিত্র শিশুর মনে দাগ কাটতে পারে। রোজ টেলিভিশনে বাজে অনুষ্ঠান দেখা বাদ দিয়ে শিশুকে তার উপযোগী কিছু চলচ্চিত্র মাঝেমধ্যে দেখানো প্রয়োজন।’
শিশুদের এই পরিস্থিতিতে শঙ্কা প্রকাশ করে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকও জানালেন, ‘গ্রামের শিশুরা এখনো দিগন্তবিস্তৃত আকাশে ওঠা চাঁদ দেখে বড় হয়, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বৃষ্টিতে ভেজা কাদামাটি মাখা বাংলার প্রাণশক্তি এই গ্রামেই। তাই অন্তত ছুটিতে বছরে একবার হলেও সন্তানকে নিয়ে গ্রামে যাওয়া উচিত। এতে করে তাদের শেকড়ের কাছাকাছি থাকার বোধ তৈরি হবে।’

নকলের মহোত্সব যেন ফিরে না আসে

রেজানুর রহমান

মন্ত্রী আসবেন পরীক্ষা দেখতে, তাই বেশ উত্তেজনা চারদিকে। কেন্দ্রের চারপাশ ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার। স্থানীয় প্রশাসন মোটামুটি তটস্থ। পুলিশের উপস্থিতি অন্য দিনের চেয়ে বেশি। হঠাত্ শোনা গেল হেলিকপ্টারের গর্জন। হইচই আর শোরগোল পড়ে গেল এলাকায়। কাছ থেকে হেলিকপ্টার দেখার আকাঙ্ক্ষায় মানুষ যে যেদিকে পারে, দৌড়ে আসছে পরীক্ষাকেন্দ্রের দিকে। ভেতরে পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাণান্তকর ছোটাছুটি। তাঁরা পরীক্ষার্থীদের পরামর্শ দিচ্ছেন—‘শোনো, মন্ত্রী আসতেছেন। অতএব সাবধান। কেউ নকল করবে না।’ বলছিলাম হাতিয়ার একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের কথা।
সবাইকে অবাক করে হেলিকপ্টার আবার উড়ে চলে গেল পরীক্ষাকেন্দ্রের ওপর দিয়ে। হইচই, শোরগোল, দৌড়াদৌড়ি, অহেতুক ব্যস্ততা মুহূর্তে সবকিছুতে যেন ভাটা পড়ল কেন্দ্রের বাইরে। কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্যদের মধ্যে আবার সেই ঢিলেঢালা ভাব। পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে যেন উত্সবের বন্যা। খুশির খবর, মন্ত্রী আসছেন না। তোমরা ‘রিলাক্স মুডে’ পরীক্ষা দাও। পরীক্ষার্থীরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
১৫-২০ মিনিট পরের ঘটনা। পরীক্ষাকেন্দ্রের চারপাশে আবার হইচই, ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। কেউ একজন খবর দিয়েছে, মন্ত্রী উড়ে যাননি। তিনি দূরে হেলিকপ্টার থেকে নেমেছেন। তারপর দলবলসহ কারও বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে, বাড়ির পেছন দিয়ে, সামনে যেখানেই সরু, চওড়া রাস্তা পেয়েছেন; সেটা ধরেই রীতিমতো দৌড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রের দিকে ছুটে আসছেন।
একসময় মন্ত্রী তাঁর দলবলসহ পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে হাজির হলেন। প্রশাসনের স্থানীয় কর্মকর্তারা অবাক। মন্ত্রী কয়েক কিলোমিটার দৌড়ে পরীক্ষাকেন্দ্র এসেছেন। কী এক জটিল অবস্থা। সবাই মন্ত্রীকে খুশি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মন্ত্রী তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন—‘পরিস্থিতি কেমন?’
একজন কর্মকর্তা বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, ‘খুব ভালো স্যার। আমরা গেটে ঢোকার মুখে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর শরীর তল্লাশি করেছি। প্রবেশপত্র ছাড়া এক টুকরো কাগজ নিয়েও কেউ কেন্দ্রে ঢুকতে পারেনি।’
মন্ত্রী নিশ্চিত হতে চাইলেন, ‘আপনি কি সত্য বলছেন? সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ছোট বড় সব কর্মকর্তা সমস্বরে বলে উঠল—‘স্যার, এবার পরিস্থিতি খুবই কড়া। পরীক্ষার্থীরা ঘাড় ঘোরানোর সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছে না।’
মন্ত্রী ঢুকলেন পরীক্ষাকেন্দ্রে। প্রথমে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন। এরপর একটি কক্ষে গিয়ে দাঁড়ালেন। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমার ধারণা, তোমাদের অনেকেই নকল নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকেছ। আমি এক থেকে তিন গুনব। এর মধ্যে নকল বের করে দেবে। না হলে যার কাছে নকল পাওয়া যাবে তাকে সরাসরি বহিষ্কার করা হবে। এক...দুই...তিন...।’ মন্ত্রীর সতর্কসংকেত শেষ হতে না-হতেই অধিকাংশ পরীক্ষার্থী লেখা থামিয়ে জামা-প্যান্টের পকেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে নকল বের করে বেঞ্চের ওপর রাখতে থাকল। এই পদ্ধতিতে সতর্কবাণী উচ্চারণের পর পরীক্ষাকেন্দ্রটি থেকে তিন বস্তা নকল উদ্ধার হলো!
এবার ঢাকায় একটি নামকরা মাদ্রাসার কথা উল্লেখ করতে চাই। সেখানেও পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে গেছেন মন্ত্রী! মাদ্রাসার ছেলেমেয়েরা নকল করবে—একথা তো ভাবাই যায় না। গেটে ঢোকার মুখে মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করা হলো, ‘পরিস্থিতি খুবই ভালো। কেউ এক টুকরো কাগজ নিয়েও ঢুকতে পারেনি।’ খুবই ভালো খবর। মন্ত্রীর মুখে প্রশান্তির হাসি। তিনি এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে হেঁটে যাচ্ছেন। হঠাত্ তাঁর মনে হলো, পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। একটি কক্ষে দাঁড়ালেন। সেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন—‘শোনো, আমার ধারণা, তোমাদের কারও কারও কাছে নকল আছে। আমি এক থেকে তিন গুনব। এর মধ্যে নকল বের করে না দিলে কঠিন শাস্তি পাবে। এক... দুই... তিন...।’ সতর্কবাণীতে কাজ হলো। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে বেরিয়েএল নকল। ওপরের দুটি ঘটনাই বাস্তব বা এর কাছাকাছি। আশার কথা, পাবলিক পরীক্ষায় নকলের এই মহোত্সবের চিত্র এখন আর তেমন দেখা যায় না। অথচ এমন একটা সময় ছিল, পাবলিক পরীক্ষা এলেই পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল তত্পর হয়ে উঠত। নকলের মহোত্সবের চিত্র প্রকাশ হতো পত্রিকায়, প্রচার হতো বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। ঈদে বাসের ছাদে এবং ঝুলে মানুষ যায় গ্রামে, এটা যেমন স্বাভাবিক দৃশ্য তেমনি পাবলিক পরীক্ষার সময়ও নকলের মহোত্সব হবে—এটাই যেন স্বাভাবিক! কেন ঘটত এই ঘটনা? আমার চোখে অনেক কারণ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
এক. ছাত্রছাত্রীদের সঠিক সময়ে নিয়মিত পাঠদান না করানো, অর্থাত্ পাঠ্যসূচি শেষ করতে না পারা।
দুই. বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব; বিশেষ করে ইংরেজি ও অঙ্কের দক্ষ শিক্ষকের অভাব।
তিন. রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ছাত্রনেতাদের মধ্যে ক্লাস না করার প্রবণতা এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় পেশিশক্তি খাটিয়ে নকলের আশ্রয় নেওয়া।
চার. এমপিওভুক্তি যাতে অব্যাহত থাকে, তাই ছাত্রছাত্রীদের নকলের সুযোগ দেওয়া।
পাঁচ. সামাজিক ক্ষেত্রে উদাসীনতা। নকল করে পরীক্ষায় পাস করা যে অন্যায়, এই বোধ সম্প্রসারিত না করা। বরং নকল করে পাস করাকে বাহাদুরি মনে করা।
বিগত কয়েক বছরে পরীক্ষায় নকলের চিত্র আর সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। এটা আশাব্যঞ্জক চিত্র। কিন্তু ওপরের যে কারণগুলো উল্লেখ করলাম, তা থেকে আমরা কি পরিত্রাণ পেয়েছি? স্কুল-কলেজগুলোতে প্রতিবছর সঠিক সময়ে শেষ করা যাচ্ছে কি নির্ধারিত পাঠ্যসূচি? বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব মিটেছে কি? দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা গ্রামের স্কুলে সাধারণত থাকতে চান না। এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি? আর রাজনৈতিক প্রভাব, সেটা কমেছে কি?
আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। নকলমুক্ত পরিবেশে পাবলিক পরীক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে কখনোই এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে না। কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তিতে মেধার কোনো বিকল্প নেই। নকলবাজ ছাত্রছাত্রী কখনোই ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবে না। কাজেই নিজেকে ধ্বংস করতে না চাইলে নকল নয়, পড়াশোনা করেই পরীক্ষায় পাস করার যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি।
আরেকটি বাস্তব গল্প উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করতে চাই। এটাও একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের দৃশ্য। পরীক্ষাকেন্দ্রে নকলের উত্সব চলছে। জানালার ধারে গিয়ে ছাদে উঠে যে যেভাবে পারছে পরীক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ করছে। একটি কাগজ হাতে, খালি গায়ে এক কৃষকের রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ানো দেখে তাঁকে থামানো হলো। ঘটনা কী? আপনি এভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন?
কৃষকের সহজ-সরল উত্তর—‘বাবা, ছেলেকে নকল দিতে যাইতেছি?’
বলেন কী? আপনি বাবা হয়ে ছেলেকে পরীক্ষায় নকল দিতে যাচ্ছেন?
কৃষকের সহজ-সরল উত্তর—‘বাবা, আমার যে আর কেউ নাই!’
একটি কথা ভাবা জরুরি, সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মিলিত স্রোতই ইতিহাসের জন্ম দেয়। পরীক্ষায় নকলের মহোত্সব শুরু হয়েছিল সে কারণেই। একজনের দেখাদেখি অন্যজন ছুটেছে এই কর্মকাণ্ডে। বর্তমানে পরীক্ষায় নকলের মহোত্সব আর নেই। এটি শুভ লক্ষণ। কিন্তু এই পরিবেশ ধরে রাখার মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ কি আমরা নিয়েছি? বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক কি আছেন সব স্কুল-কলেজে? নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচি কী? শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কি দূর করা গেছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলাদলি কি কমেছে? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান না হলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে আবার যে নকলের মহোত্সব হবে না, এর নিশ্চয়তা কোথায়?